প্রচ্ছদ » ছেলেবেলাপুর » বিস্তারিত

মালেক মাহমুদ

ছোট মামার ভূতবাড়ি

২০১৫ আগস্ট ১৪ ১৮:৫৭:০৬
ছোট মামার ভূতবাড়ি

জোছনা রাতে, সাদা পোশাকে বসে আছেন দাদা। চারপাশে গোল করে বসে আছে, দুই নাতি, তিন নাতিন, এক কাজের মেয়ে। সবাই আব্দার করল দাদার কাছে— ভূতের গল্প বলতে হবে। দাদাও রাজী হয়ে গেলেন ভূতের গল্প বলতে। মজা করে বলতে লাগলেন গল্প—।

—তোমরা কি কেউ জানো, মামার ভূতবাড়ি কোথায়?
সবাই এক সাথে বলে উঠল, না, জানি না।
—তা হলে ভূতের গল্প বলি, তোমরা শোনো। আমার গল্প বলার সময় তোমরা কেউ কথা বলতে পারবে না কিন্তু। জোছনা রাতে গল্প বলার মজাই আলাদা। আজকের গল্পের নাম— ‘ছোট মামার ভূতবাড়ি’, তা হলে আমি বলি, তোমরা শোনো।

নিমপুর। নিম একটি গাছের নাম। তাই তোমরা ভাবতে পারো নিমপুরে অনেক নিমগাছ আছে। নিমগাছ না থাকলে নিমপুর হবে কেন? নিমগাছ আমাদের ঔষধি বন্ধু। যে গ্রামে ঔষধি গাছ থাকে না, সে গ্রামে যেন অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকে। গ্রামের সামনে বিশাল মাঠ, মাঝখানে বিশাল বটগাছ। ঝাঁকড়া চুল ছড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আছে কাজী নজরুলের মতো। বটের ঝুরি দেখে মনে হয় রবি ঠাকুরের দাড়ি। এক বৃক্ষের দু’টি রূপ, বাহ্‌! কী চমৎকার না লাগছিল দুপুরের রোদে!

ছোট নাতি বলে ওঠল, দাদু আমরা ভূতের গল্প শুনব।

—বলছি তো, তোমরা শোনো।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পশ্চিম আকাশে লাল লালিমার রেখা ফুটে ওঠেছে। মাঠে কাজ করে কৃষকরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। রাতের আঁধারে একটি পাখিও বাস করে না বটগাছে। সামনের পথ দিয়ে মানুষ চলাচল করে না মোটেও। রাতে বিরাজ করে ভূত-ভূতুড়ে পরিবেশ। গা ছমছম করা যত সব কাণ্ড ঘটে গাছতলে। পাশেই শিবনাথ চিতা। সেই চিতায়, পোড়ানো হয়েছে সেই গ্রামের দুষ্টু জমিদার ভবোচন্দ্র ভোলাকে। আরও ভাল মন্দ কত মানুষ। মানুষ মরে গেলে, তার আত্মা ঘোরাফেরা করে, আশেপাশে আকাশে বাতাসে।

সিপন ইন্টার ফাস্ট ইয়ারের ছাত্র, বাস করে নিমপুর। জরুরী কাজে ঢাকায় চলে আসে শনিবার ভোরে। সেই দিনই ফিরতে হবে নিমপুর। দিনের মধ্যেই করতে হবে যত সব কাজ। সিপনের তারুণ্য কাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় অনেক দূর। তাড়াতাড়ি কাজ শেষে বাড়ি ফিরছে সিপন। রাত ১২টায় শহরতলী বাস ইস্টিশনে নামে। শহরতলী থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে নিমপুর গ্রাম। গাড়ির অপেক্ষায় দাঁড়ায়। আশেপাশে কোনো লোকজন নেই। একটু দূরে চায়ের দোকান। দু’জন লোক দাঁড়িয়ে চা পান করছে। সিপন কী করে একা একা দাঁড়িয়ে থাকবে! মনে ভয় ভয় অনুভব করছে। তাই গুটি পায়ে চলে যায় চা দোকানের সামনে। দোকানের সামনে যে দু’টি লোক চা পান করছিল। তাদের মধ্যে একজনের পরনে ছিল, বেগুনী রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে সানগ্লাস। অন্যজনের পরনে সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। সিপন দোকানের সামনে গিয়ে এক কাপ চা বানাতে অর্ডার দিল। সানগ্লাস পরা লোকটি সিপনকে বললেন, আপনি কোথায় যাবেন? আপনি কি নিমপুর গ্রামে যাবেন?

সিপন বলল, হ্যাঁ, আপনি কোথায় যাবেন?
অদ্ভুত ভঙ্গিতে লোকটি বললেন, হু... আমিও যাব।
সিপন ভাবতে থাকে রাতের বেলা কেউ কী কালো সানগ্লাস পরে!

দোকানী চা বানিয়ে বলল, চা। চা হাতে নিয়ে এক চুমুক দিতেই, পিপ করে তিন চাকার গাড়ি চলে এল। চালক বললেন, কোথায় যাবেন?

সাথে সাথে অদ্ভুত লোকটি বললেন, নিমপুর। চালক বললেন, নিমপুর তো যাওয়া যাবে না, যাওয়া যাবে রঘুনাথপুর।

সিপন বলল, রঘুনাথপুর যাব। মনে মনে বলল বাকী পথ হেঁটে হেঁটে যাব। দাম মিটাতে লাগল। চালক নিয়মিত ভাড়ার তিনগুণ বেশী চাইল।

—এত বেশী ভাড়া চাইলে কী করে যাব।
—না, কম হবে না রাতের ভাড়া একটু বেশীই হয়, আসতে হবে খালি। এই বলে চালক গাড়ি চালাতে চাইল।
—দাঁড়াও, দাঁড়াও যাব। অদ্ভুত লোকটি ফের বললেন, আমিও যাব তোমার সাথে।

সিপন বলল, ঠিক আছে।

তারপর সিপন দোকান থেকে একটি ম্যাচ ও সিগারেট কিনল।

অদ্ভুত লোকটি বললেন, আপনি তো সিগারেট খান না, তবে কেন কিনলেন? সিপন মনে মনে বললেন, আমি যে সিগারেট খাই না, তা লোকটি কীভাবে জানল! সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। তবুও যেতে হবে নিমপুর, সন্দেহ করে কী লাভ। দু’জন উঠল, গাড়ি চলতে লাগল রঘুনাথপুর।...

দাদার কথার মধ্যে ছেদ টেনে ছোট নাতি বলল, দাদা দাদা সিপনকে চেনো?

—গল্প বলছি, গল্প শোনো। কথা বললে গল্প বলব না।
—ঠিক আছে আর কথা বলব না।
—তা হলে বলছি, শোন।

ভবোচন্দ্র ভোলা মারা গেছে তিন মাস হল। জীবিত অবস্থায় তাকে বহু বার দেখেছে সিপন। ভাল মন্দ কথাও বলেছে। তার যত কুর্কম সম্পর্কে সব জানে সিপন। যেমন— কটু কথা বলে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়া। বিচারের মধ্যমণি সেজে ওলটপালট বিচার করা। হামবড়া ভাব নিয়ে গরীবদের শাসাতে থাকা, দখল করে নেওয়া গরীবের সম্পদ। গরীবকে ঠকানো... এমন কোনো কাজ নেই যা সে করেনি।

সিপনের মন ওলটপালট করতে লাগল। উল্টো সময় উল্টো কথা মনে পড়তে লাগল। ভবোচন্দ্র ভোলার কথা ভাবতে ভাবতেই, পাশের লোকটির দিকে তাকাল। দেখতে পেল তার চোখে কোনো সানগ্লাস নেই। লোকটির চেহারা ঠিক ভবোচন্দ্র ভোলার মতো। চমকে উঠল সিপন।

গাড়ি চলছে— কোনো সাড়া শব্দ নেই।
ভয় ভয় অনুভব করছে সিপন তবুও মনে সাহস রাখে।
দেখতে দেখতে গাড়ি চলে এলো রঘুনাথপুর। দু’জন গাড়ি থেকে নামল। টাকা মিটিয়ে দিতেই গাড়ি চলে গেল।

ভীরু-মনে সিপন লোকটির দিকে তাকাল। তাকে স্বাভাবিক রূপে দেখতে পেল।
রাত থম থম করছে। সিপনের মনও থমথম করছে। চারদিকে কোনো লোকজন নেই। থম থম রাতে ভয় ভয় খেলা।
এ সময় ভয় পেলে চলবে না। যা করতে হবে, তা হল, মনে সাহস আর বুদ্ধি নিয়ে।

লোকটি বলল, চল আমরা হাঁটতে থাকি।

—আপনি কতদূর যাবেন?
—না, নিমপুর যাব না। রঘুনাথপুর থেকে যাব। ছোট মামার (একটু থেমে) বাড়ি।
—কেন যাবেন না?
—না, যেতে ইচ্ছে করছে না তাই।
—ঠিক আছে, যে পর্যন্ত যাবেন এক সাথেই যাই।
—হ্যাঁ, হাঁটো।

সিপন জানে, ছোট মামার বাড়ি মানে ভূতবাড়ি। মনের ভেতর মন আরও ভয়ে গুটগুট খেলতে লাগল।

গা ছম-ছম পরিবেশ বা ভূতভূতে আবহ যাকে বলে— ভাবতে গেলেই মনে পড়ে গেল ভবোচন্দ্র ভোলার মামার বাড়ি রঘুনাথপুর। সিপন তার বাবার কাছ থেকে জেনে ছিল। ভূত বা খারাপ আত্মা আগুন দেখে ভয়ে পালায়। তাই সিপন ম্যাচ বের করে আগুন জ্বালাতেই, লোকটি তাড়াতাড়ি হাঁটতে লাগল। সিপনের বুঝতে বাকী থাকে না লোকটি আসলে কী। কি আর করা বাড়ি তো যেতেই হবে। সামনে একটা লাঠি দেখতে পায়। উপস্থিত বুদ্ধি মাথায় আসে।

লাঠির মাথায় কাপুড় পেঁচিয়ে মশাল বানাল। আগুন জ্বলতে লাগল, সিপন মশাল হাতে হাঁটতে লাগে। এদিকে পেছন থেকে কে যেন ধুপধাপ শব্দ করতে লাগে। পেছনে তাকিয়ে দেখে কেউ না। ধবধব জোছনা ছড়িয়ে আছে। সিপন ফের হাঁটতে লাগল। ডানে ফটফট আওয়াজ। বামে ঘটঘট আওয়াজ। মশাল হাতে সিপন বাড়ির দিকে এগিয়েই যেতে লাগল। শরীর থেকে ঝরতে লাগল ঘাম আর ঘাম। সামনে নিমপুরের বটগাছ। এই পথ ছাড়া বাড়ি যাওয়ার বিকল্প কোনো পথ নেই। মনে সাহস সঞ্চয় করতে লাগল।

বটগাছের কাছাকাছি যেতেই নিভে গেল মশালের আগুন।

কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছে সিপন।

সঙ্গে সঙ্গে হাউমাউ করে উঠল মামাভূত— অঁনেক দিঁন পঁরে তোঁকে পাঁইছি। আঁজ তোঁকে ছাঁড়–ম নাঁ, খাঁমু খাঁমু খাঁমু।

মামাভূত কখনো ভাল মানুষকে খায়নি। উপকার ছাড়া অনিষ্টও করেনি। গা ছমছম করে উঠল, কিছু বলার সাহস হারিয়ে ফেলেছে সিপন।

তবুও ভয়ে ভয়ে বলল, বাবার অসুখ তার জন্য ঔষধ আনতে গিয়েছিলাম ঢাকা। তাই বাড়ি ফিরতে দেরী হয়েছে। বাকী পথটা ঠিকমতো পার করে বাড়ি গিয়ে বাবাকে ঔষধ দিলেই তো বাবা ভাল হবে।

—আঁমি নাঁ হঁয় ছেঁড়ে দিঁলাম। সাঁমনে ভঁবোচঁন্দ্র ভোঁলা আঁছে নাঁ, তঁখন কীঁ কঁরবি?
—তা তো আমার জানা নেই। শুধু জানি, বাবাকে বাঁচাতে হবে।
—আঁমার মঁনে হঁচ্ছে তুঁইও বাঁচবি নাঁ, তোঁর বাঁবাও বাঁচবে নাঁ। বুঁঝলি!
—আমি মরি মরি, তবু বাবাকে বাঁচাতে হবে।
—তোঁর বাঁবাকে বাঁচাতে হঁবে?
—হ্যাঁ, আমার বাবাকে বাঁচাতে হবে।

নিজের জীবন বিলিয়ে বাবাকে বাঁচানোর কথা বলতেই মামাভূতের মন অনেক নরম হয়ে গেল।

বলল— ঠিঁক আঁছে যাঁ তোঁর বাঁবাকে বাঁচা। তঁবে শোঁন, তোঁর মঁশাল জ্বাঁলিয়ে নেঁ। আঁর নবীর কলেমা পঁড়তে ভুঁলবি নাঁ যেঁন।

সিপন সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূল উল্লাহ। বলতে বলতে হাঁটতে লাগে। ভবোচন্দ্র ভোলা আর সামনে আসে না। কিছু দূর যেতে না যেতেই কানের কাছে বাঁচতে লাগল, হাঁউ মাঁউ খাঁউ। হাঁউ মাঁউ খাঁউ... বলতেই বলতেই। অগ্নিমশাল নিভিয়ে দিল, বের করল রক্ত মাখানো দাঁত। ভয়ে সিপন কখন যেন উচ্চ স্বরে বলে ওঠে— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূল উল্লাহ।

বলেই উঠে বসে পড়ল। বুঝতে পারল এতক্ষণ নিজের বিছানায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল।

লেখক : ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক