প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

হজ ও বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান -৩

২০১৫ আগস্ট ২৯ ১৩:১৮:৫৪
হজ ও বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান -৩

ড. এম এ মতিন

(পূর্ব প্রকাশের পর) হজের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে মুসলমানেরা এ কথাই প্রমাণ করে যে, হযরত ইবরাহীমের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আল্লাহ তা’য়ালার কাছে তাঁর (ইবরাহীমের) পূর্ণ আত্মসমর্পণের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে বিশ্ব-শান্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সকল পরিচয় ভুলে গিয়ে শুধু একজন মানুষ হিসেবে সকল জৌলুস ত্যাগ করে সকলে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে হজের কষ্টসাধ্য কাজগুলো সম্পাদনের মাধ্যমে বিশ্বভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয়। হজের মতো মহাসম্মেলনে নানা জাতির মানুষের একত্রিত হওয়ার মধ্য দিয়ে হাশরের ময়দানে একত্রিত হওয়ার অনুভূতি জাগ্রহ হয়। হাজীগণের মনে আখিরাতের শান্তি ও সৌন্দর্য অর্জনের অনন্ত বাসনা জাগ্রত হয়। সে বাসনা পূরণের যে একমাত্র পথ তাওহিদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী আইনকানুন মেনে চলা, তা তারা সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে দেখিয়ে দিতে চান। এরূপ একটি সফরের সকল প্রকার নিয়মকানুন মেনে চলে এ পবিত্র বিশ্ব সম্মেলনে যোগদান করে হজযাত্রীরা এটাই প্রমাণ করেন যে, তারা মহান আল্লাহর হুকুম মেনে নিতে গিয়ে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে সদা প্রস্তুত থাকেন।

ইয়াহুদী ধর্মে তীর্থস্থান ভ্রমণের একাধিক নাম ও সময় নির্ধারিত রয়েছে। যেমন পাসোভার সাবুত ও সাক্কুট। উক্ত প্রত্যেকটি তীর্থযাত্রার পেছনে বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ইহুদীদের প্রধান তীর্থস্থান মাসজিদুল আকসা ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নগরীতে অবস্থিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উদ্বাস্তু ইয়াহুদীরা ফিলিস্তিনে আশ্রয় নেয়, অতঃপর মুসলমানদের তাড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল নামে ইয়াহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা ও নাস্তিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে। মসজিদে আকসা বা বাইতুল মুকাদ্দাস ইয়াহুদীদের কিবলা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্তমান ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নগরীতে ইয়াহুদীদের এই তীর্থস্থান অবস্থিত। মসজিদে আকসা ইয়াহুদীদের তীর্থস্থানের কেন্দ্রবিন্দু হলেও মূলত তারা পুরো ফিলিস্তিনের ভূমিকেই তীর্থভূমি হিসেবে নির্ধারণ করে থাকে। ইয়াহুদীরা এই পবিত্র ভূমিকে তাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতিশ্রুত ভূমি হিসেবে গণ্য করে। মাইকেল পাই সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রকে বরের জন্য অপেক্ষমাণ সুসজ্জিত নববধূর সঙ্গে তুলনা করেন। ইয়াহুদী জাতি বনী ইসরাইল নামেই অধিক পরিচিত। তাদের জাতীয় ও ধর্মীয় পরিচয়ের সাথে তীর্থস্থানের সম্পর্ক রক্ষা করার জন্যই ফিলিস্তিনের ভূমি বেদখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নিয়েছে। তীর্থস্থান উদ্ধারের নামে ‘আরব ভূমিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নবিভোর ইয়াহুদী জাতি বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকেই মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য ও পরোক্ষ পরিকল্পনা যাই হোক, প্রত্যক্ষ যু্ক্তি ওই তীর্থস্থান উদ্ধারই।

হযরত ইউসূফ (আ.) মিসরে মন্ত্রিত্ব লাভ করলে তাঁর পিতা হযরত ইয়াকুব (আ.) কেনান (ফিলিস্তিন) থেকে মিসরে হিজরত করেন। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর উপাধি ছিল ‘ইসরাইল’ (আল্লাহর প্রিয় গোলাম)। তাঁর বংশধরদের বনী ইসরাইল (ইসরাইলের পুত্রগণ/বংশধর) বলে সম্বোধন করা হয়। বনী ইসরাইলীগণ ইউসূফ (আ.)-এর জীবদ্দশায় ও বেশ কিছুকাল সুখে-শান্তিতেই মিসরে অবস্থান করেন। অতঃপর ক্ষমতার রদবদল হলে মিসরীয় শাসকেরা তাদের ওপর দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেয়। বনী ইসরাইলীরা দাস হিসেবে যুগের পর যুগ মিসরে বসবাস করতে থাকে। তাদের পিরামিড নির্মাণের কাজে অমানুষিক পরিশ্রম করতে বাধ্য করা হয়। ফেরাউনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ইসরাইলীদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা হযরত মূসা ও হারুন (আ.) কে প্রেরণ করেন। তিনি সকল ইসরাইলীকে সঙ্গে নিয়ে মিসর ত্যাগ করেন। অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে ইসরাইলীরা ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা পায় ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল কেনানে (ইসরাইল) প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণীয় করে রাখার জন্য ইয়াহুদীরা প্রতিবছর পাসোভার উদযাপন করে থাকে। পাসোভার মূলত ইয়াহুদীদের বিশেষ ভ্রমণ উৎসবের নাম। পাসোভার উদযাপিত হয় মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে। পাসোভারের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, প্রথমত ইয়াহুদীরা তিন দিনব্যাপী যাযাবরদের মতো মরুভূমিতে ভ্রমণের মাধ্যমে পাসোভার উদযাপন করত। পরবর্তীতে সাতদিন যাবৎ পাসোভার পালন করার প্রচলন করা হয়। পাসোভার উদযাপনের সময় তীর্থ যাত্রীরা একত্রে বিশেষ রুটি ও ভেড়ার মাংস ভক্ষণ করে। রাতে যাযাবরদের মতো মরুভূমিতে বিচরণ করে; যা প্রাচীন ইসলাইলীদের স্বাপ্নিক জীবনের ঐতিহাসিক স্মৃতি জাগ্রত করে। একত্রে খাদ্য গ্রহণ মরুভূমিতে ভ্রমণ যেরুজালেমে অবস্থান ইয়াহুদীদের জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।

পাসোভার শুরু হওয়ার পঞ্চাশ দিন পর সাবুত শুরু হয়। সাবুতের আরেক নাম পেন্টিকষ্ট। এটি সিনাই পর্বতে হযরত মূসা (আ.)-এর তাওরাত লাভ উপলক্ষে উদযপিত হয়। সাক্কুট উদযাপিত হয় ফসল কাটার মওসুমে। এটি মূলত বাৎসরিক উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এই উৎসবে ইয়াহুদীরা তাদের প্রতি প্রষ্ঠার বিভিন্ন নে’য়ামত (উপঢৌকন) দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ইসরাইলীরা মিসরে অবস্থানকালে তাদের ওপর দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাদেরকে কঠোর পরিশ্রম করে ইট তৈরি করতে বাধ্য করা হয়। পুরাতন সে স্মৃতিচারণ করা হয়। জেরুজালেমের বাইরেত্ত বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সীনাগগে সাবুত ও সাক্কুট পালন করা হয়। যেমন ইউওরোপের পলিসীয়া, ভলেনিয়া এবং পোটস অব পোল্যান্ড তাদের তীর্থস্থান। বিভিন্ন রকম প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তারা গমন করে ও রাব্বিদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

খ্রীষ্টধর্মে তীর্থস্থানের ভূমিকা অপরিসীম। তীর্থস্থানসমূহের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আধ্যাত্মিক প্রভার রয়েছে। খ্রীষ্টানরা তীর্থস্থান কেন্দ্র করে সহস্রবছর ধরে যুদ্ধ করেছে, যা ইতিহাসের ক্রুসেড নামে পরিচিত। বর্তমান বিশেষ খ্রীষ্টানদের একচ্ছত্র আধিপত্যের পিছনে সেই ঐক্যের প্রভাব রয়েছে। বর্তমানের মুসলিমদের মতো মধ্যযুগে নানা-মত নানা-পথে বিভক্ত হয়ে পরেছিল সমাজ। রোম কেন্দ্রিক তীর্থস্থান (Threshold of Apostles) তাদের ঐক্যবদ্ধ করে। ফিলিস্তিনের জেরুজালেম নগরীর বেথেলহেম নামক স্থানে অবস্থিত ‘নেটিভিটি চাচ’ খ্রীষ্টানদের প্র্রধান তীর্থস্থান। এ স্থানে যীশুখ্রীষ্ট (হযরত ঈসা আ.) মেরী (মরিয়ম আ.)-এর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। যীশুখ্রীষ্টের জন্ম, ধর্ম প্রচার ও ক্রুশীয় মৃত্যু (খ্রীষ্টানদের মতে) সবকিছুর সাথেই মিশে আছে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি। যীশুকে স্মরণ করে ব্রত পালন করাই এই তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্য। জেরুজালেম নগরী সু-উচ্চ প্রাচীরে ঘেরা। এর বারোটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। ধারণা করা হয় প্রতিটি দ্বারে একজন করে ফিরিস্তা রয়েছে। ইসরাইলের বারোটি গোত্রের নামে বারোটি দ্বারের নামকরণ করা হয়েছে। এর চতুর্দিকে তিনটি করে প্রবেশদ্বার রয়েছে। শহরের প্রাচীরে বারোটি স্মৃতি ফলকে যীশুর বারোজন শীষ্যের নাম লেখা রয়েছে। খ্রীষ্টানদের দ্বিতীয় তীর্থস্থান রোমে অবস্থিত কাটাকম্বস-এর কেন্দ্রবিন্দু। যীশুখ্রীষ্টের অন্যতম বারোজন শীষ্যের মধ্যে পাউল ও পিটারের সমাধিস্থল কেন্দ্র করে এই তীর্থস্থান গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীরাই এই তীর্থস্থান ভ্রমণ করে। এ ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মগুরু ও বীর শহীদদের সমাধি ক্ষেত্রও খ্রীষ্টানদের তীর্থস্থান রূপে পরিগণিত হয়। ‘গাস্টোনবারী’রোমে অবস্থিত এমনই একটি তীর্থস্থান।

হিন্দু ধর্মে অসংখ্য তীর্থস্থান রয়েছে। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে হিন্দু ধর্ম মূলত প্রকৃতি পূজায় বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে প্রকৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট এ ধর্মের তীর্থস্থানের সংখ্যাও অনেক হয়েছে। জরথ্রুষ্ট ধর্মের পবিত্রতার প্রতীক অগ্রীর মতো হিন্দুধর্মে জলকে পবিত্রতার প্রতীক মনে করা হয়। এ দ্বারা সৃষ্টির উৎস হিসেবে শিবলিঙ্গেও জল ঢালা হয়। মানবজীবনকে সকল পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত করতে জলই একমাত্র উপায়। তাই জলকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছে হিন্দু ধর্মের তীর্থস্থান। বিভিন্ন নদীর তীর, জলপ্রপাত এমন কি দীঘির জলও তীর্থস্থানে রূপান্তরিত হয়েছে। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা তীর্থস্থানের একটি তালিকা উপস্থাপন করা হল।

বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত হিন্দুধর্মের তীর্থস্থান

ক্রমিক নং

অঞ্চলের নাম

তীর্থস্থানের নাম

বঙ্গভূমি

গয়া, দেওগড়, কালিঘাট, কামাখ্যা, তেরবেশর

বিহার ও উড়িষ্যা

পুরানাথ, পুরী-জগন্নাথ

পাঞ্জাব

জোয়ালামুকী, কুরুক্ষেত্র, কাটাস

আগ্রা

বাটেশ্বর, বেনারশ, বৃন্দ্বাচল, বৃন্দাবন, চিত্রকুট, দেবীপতন, গংগোত্রী ইত্যাদি।

বোম্বে

এলান্দী, জিজুরী, দেওয়ারকা, পালিতানা, জিজুরী, পান্তরপুর, বিচরাজী।

মাদ্রাজ

ভবানী, চিদাম্বরাম, গোকর্ণ, কঞ্জিবরাম, রামেশওয়ারাম, সারেংগাতাম, তেরপতি

মধ্য প্রদেশ

নাথপুয়ারা, অমরকান্তিক, বারোয়ানী, পুসখার, রাখবদেব

উল্লিখিত তীর্থস্থানগুলোতে বিভিন্ন দেবতার আরাধনা হয়। অঞ্চল ও তীর্থস্থান ভেদে দেবতারও পার্থক্য রয়েছে।

(চলবে)

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/এইচএসএম/শাহ/আগস্ট ২৯, ২০০১৫)