প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

বিমল কুণ্ডু

হিন্দু ধর্ম নাকি সনাতন ধর্ম?

২০১৫ সেপ্টেম্বর ০৪ ১৫:৩৫:১০
হিন্দু ধর্ম নাকি সনাতন ধর্ম?

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টামী আগত প্রায়। বিগত বছরে জন্মাষ্টামী উৎসব উদযাপন উপলক্ষে ঘটা করে দেশের প্রায় সবকটি টেলিভিশন চ্যানেল ও দৈনিক খবরের কাগজে সংবাদ পরিবেশিত হয়। সংবাদের বয়ানটি ছিল এ রকম- ‘বাংলাদেশের সনাতন ধর্মালম্বীরা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টামী উৎসব পালন করছেন’।

মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারে কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। আমার আপত্তি শুধু একটি শব্দ ব্যবহার সম্পর্কে— তা হচ্ছে ‘সনাতন ধর্মালম্বী’। সনাতন ধর্ম নামে পৃথক কোনো ধর্ম আছে বলে আমার জানা নেই। আমি যেটা জানি তা হল বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের অবতার পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথী পালন করে থাকেন। হঠাৎ করে হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা কিভাবে সনাতন ধর্মের অনুসারী নামে অভিহিত হয়ে গেল তা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। আজ এই উপমহাদেশে কিংবা ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে কেউ যদি তার পরিচয় দিয়ে বলেন, আমি সনাতনধর্মী। তাহলে কেউ কি সেই পরিচয় বুঝতে বা সেই ধর্মের লোককে চিনবে? এক কথায় উত্তর না। কিন্তু পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে গিয়ে কেউ যদি তার পরিচয় দেন আমি হিন্দু- তাহলে? আমার মনে হয় বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে বলবে, Yes, You are from India or Bangladesh. তাহলে সনাতন ধর্মালম্বীরা জন্মাষ্টমী উদযাপন করছে এ কথা প্রচারের উদ্দেশ্য কি? আমার বিশ্বাস, প্রথমত অজ্ঞতা, দ্বিতীয়ত মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা।

এখন হিন্দু ধর্ম ও সনাতন ধর্ম শব্দ দুটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। তার আগে অবশ্যই ধর্ম শব্দটির অর্থ বুঝতে হবে। সংস্কৃত ‘ধৃ’ ধাতু থেকে ধর্ম শব্দের উৎপত্তি যার বাংলা অর্থ- ‘যা ধারণ করে’। এই ধর্ম শব্দটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং নিরপেক্ষ শব্দ। পৃথিবীর সকল জীবন্ত প্রাণীসহ সকল বস্তুরই রয়েছে নিজস্ব ধর্ম। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ধর্ম ছাড়াও রয়েছে সমষ্টিগত ও সর্বজনীন ধর্ম। যেমন— জলের ধর্ম তৃষ্ণা নিবারণ, আগুনের ধর্ম পুড়ানো, সূর্য প্রতিদিন পূর্ব দিকে উদিত হয়, চাঁদ স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না দান করে। এগুলো অনাদিকাল ধরে একই রূপে চলে আসছে। এর কোনো অন্যথা হয় না। জল, আগুন, সূর্যের উদয়-অস্ত প্রকৃতিকে সনাতন বলা হয়। বনের বাঘ, সিংহ, গণ্ডার, বানর প্রভৃতি জন্তুর মধ্যে সমষ্টিগত ধর্ম দেখা দেয়। তখন বলা হয় বাঘের ধর্ম, বানরের ধর্ম ইত্যাদি। এভাবেই পশুদের আলাদা সম্প্রদায়ে ভাগ করা হয়। পাখিদের ক্ষেত্রেও তাই। তাহলে দেখা যায়, প্রকৃতিগতভাবে সকল প্রাণী ও বস্তুর ধর্ম সনাতন। কিন্তু মানুষ তার বুদ্ধিমত্তার জন্য সমস্ত জীব জগৎ থেকে আলাদা। সভ্যতার আদিতে মানুষের একটিই জাতীয় পরিচয় ছিল—তা হচ্ছে মানব জাতি। তাদের ধর্ম ছিল একটি- তাহল প্রাকৃতিক ক্রমান্বয়ে মানব সভ্যতার উত্তরণের পথ বেয়ে ধর্ম নিরপেক্ষ ‘ধর্ম’ শব্দটি বিভিন্ন ধর্ম (Natural Growth)) সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যেমন— হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রীষ্ট ধর্ম প্রভৃতি। তা ছাড়াও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায় পৃথিবীতে রয়েছে। কাজেই যে কোনো জাতি বা সম্প্রদায় হোক না কেন যার সঙ্গে ধর্ম শব্দটি যুক্ত হয়েছে সে সকল ধর্মই সনাতন। তাহলে শুধু হিন্দু ধর্মকে আমরা সনাতন ধর্ম বলব কেন?

অন্যদিকে সনাতন শব্দের অর্থ প্রাচীন। হিন্দু ধর্ম অন্যান্য ধর্মের থেকে প্রাচীন বিধায় তাকে সনাতন ধর্ম বলা যাবে কি? ইতিহাসে আমরা দেখি ইহুদী, বৌদ্ধ, জরথুষ্ট্রীয় ধর্মও অনেক প্রাচীন ধর্ম। পৃথিবীতে যেসব আদিবাসী আছে তারা যে ধর্ম পালন করেন তাও অনেক প্রাচীন। তাহলে এই ধর্ম মতগুলোও সনাতন ধর্ম।

এই আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, কিছু কিছু ব্যক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হিন্দু ধর্মের নাম পরিবর্তন করে তা সনাতন ধর্ম বলে প্রচার করে প্রাচীনত্বের দিকে ফিরে যেতে চান। উল্লেখ্য, যারা প্রাচীন আচার, প্রথা ও সংস্কার আঁকড়ে ধরে থাকতে চান তাদের আজকের দুনিয়ায় প্রাচীনপন্থী, ধর্মান্ধ বা ইংরেজিতে Fundamentalist বলা হয়ে থাকে। মধ্যযুগে সুবিধাবাদী ব্রাহ্মণগোষ্ঠী ও পুরোহিততন্ত্র ধর্মের নামে জাতিভেদ প্রথা, কুলিন প্রথা, সতীদাহ প্রভৃতি অপপ্রথার মাধ্যমে বিশাল হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর যে নির্মম অত্যাচার নিপীড়ন করেছিল তার ফলে ব্যাপক সংখ্যক হিন্দু অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায় এবং এর ফলে হিন্দু জাতি ও ধর্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে। আধুনিক যুগে এসে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং সর্বোপরি স্বামী বিবেকানন্দ সঠিক বৈদিক ধর্মকে সর্বসাধারণের সামনে উপস্থাপন করে বহু কুসংস্কার ও প্রাচীন প্রথাকে উচ্ছেদপূর্বক হিন্দু ধর্মের পুনঃস্থাপন করেন। এই মনীষীদের দ্বারাই হিন্দু ধর্মের বিশ্বায়ন হয়। এই বিশ্বায়নে বহিরাগত ইংরেজ ও গ্রিকদের অবদানও কম নয়। এভাবেই পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ হিন্দু ধর্মকে হিন্দু ধর্ম নামেই চেনেন। বিশ্ব বিখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত ও দার্শনিক ম্যাক্স মুলার, রঁমারোঁলা, শোপেনহাওয়ার তাদের সুচিন্তিত লেখনীর মাধ্যমে যে হিন্দু ধর্মের মহাসাগর স্বরূপ পবিত্র বেদ ও বেদান্তদর্শন বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দিয়েছেন তা যেন কেউ কালিমা লিপ্ত না করেন। নিশ্চয়ই সনাতনপন্থীরা উল্লিখিত মহান ব্যক্তিদের চেয়ে বড় পণ্ডিত নন। বর্তমান প্রজন্মকে লক্ষ্য রাখতে হবে, অতীতে পুরোহিত তন্ত্র বহু ফতোয়া জারি করে হিন্দু ধর্মের যে সর্বনাশ সাধন করেছিল নব্য সনাতনপন্থীরা যেন জাতিভেদের মতো আরেকটি সনাতনপন্থী ভেদ করে হিন্দু জাতিকে দুর্বল করতে না পারে।

পরিশেষে, সনাতন ধর্মের প্রকৃত সংজ্ঞা উল্লেখ করে এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধের ইতি টানছি। মহাভারতে ভীষ্মের শরশয্যায় অন্তিম মুহূর্তে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির তাকে প্রশ্ন করলেন, পিতামহ, সনাতন ধর্ম কি?

ভীষ্ম উত্তর দিলেন, ‘অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দান— এ চারটিই সনাতন ধর্ম। তুমি এই ধর্মের অনুষ্ঠান করিবে। ’

সনাতন শব্দটি প্রসঙ্গে পবিত্র গীতায় বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘তুমি সনাতন পুরুষ, তোমার মধ্যে শাশ্বত ধর্ম- শুধু ধর্ম নয়, শাশ্বত ধর্ম। অর্থাৎ ধর্মীয় দৃষ্টিতে কেউ ব্যক্তিগতভাবে শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব হতেই পারেন। কিন্তু সেটা শাশ্বত ধর্ম নয়। দেশভেদে, কালভেদে, মানুষভেদে যে ধর্ম বিভিন্ন সেই ধর্মের কোনো শাশ্বতিকতা নেই। কিন্তু দেশ, কাল, মানুষের ভেদ অতিক্রম করে যে ধর্ম সমাজের উপকার সাধন করে সেই ধর্মই শাশ্বত ধর্ম’। কাজেই পবিত্র গীতার ভাষ্যানুসারে সনাতন পুরুষ একজনই। তিনি বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা ও সমস্ত জীব জগতের প্রভু। এমতাবস্থায় সনাতন শব্দটি ধর্ম বিশেষের সঙ্গে যুক্ত করা সঙ্গত বলে মনে হয় না।

লেখক : সাবেক যুগ্ম-সচিব, কবি ও গবেষক, সহ-সভাপতি ঢাকা রাইটার্স ক্লাব।

• মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখা— লেখকের নিজস্ব চিন্তা ও মতের প্রতিফলন। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের লেখার বিষয়বস্তু, মত অথবা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।