প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

হজ ও বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান (শেষ পর্ব)

২০১৫ সেপ্টেম্বর ০৪ ১৬:১৫:১৭
হজ ও বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান (শেষ পর্ব)

ড. এম এ মতিন
(পূর্ব প্রকাশের পর)

বিষ্ণু, শিব, কৃষ্ণ, মাতৃদেবতা যেমন: কালী, দূর্গা, ভিন্ন ভিন্ন তীর্থ মন্দিরে পুজিত হন। নিম্নে ছকের মাধ্যমে একটি তালিকা উপস্থাপন করা হল।

দেবতার ভিত্তিতে হিন্দুধর্মের তীর্থস্থান সমূহের তালিকা :

ক্রমিক নং

দেবতার নাম

তীর্থস্থানের নাম

বিষ্ণু

পুরী জগন্নাথ, তেরপতী, নাথদুয়ারী, বাদা রিনাথ, গয়া, হরপুয়ারা, পান্তরপুর।

কৃষ্ণ

মথুরা [কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান], গোকুল [এখানে তীর্থ যাত্রীরা চাক্ষুশ করবেন ৮৪ স্তম্ভ বিশিষ্ট শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা মন্দির, যমলার্জ্জুন ভঞ্জন স্থান, শ্রীকৃষ্ণের মৃত্তিকা ভক্ষণ, রেবতি রমণ দর্শন।], শ্রীবৃন্দাবন [পঞ্চক্রোশ শ্রীবৃন্দাবন পরিক্রমা, কৃষ্ণ বলরাম বৃক্ষ,কালীয় দমন, কেশী ঘাটে স্নান, বস্ত্রহরণ-কেলী কদম্ব, ইসকন শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম মন্দির।], মহাবান, দোড়কা,কুরুক্ষেত্র [সূর্যকুণ্ড ও ব্রহ্মকুণ্ড],জ্যোতিশ্বর [যেখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দান করেছেন]।

শিব

চিদাম্বরাম, দেক্তাড়, গোকর্ণ, তারাকেশর, হরিদুয়ারা, কেদারনাথ, বকরিসোয়ার। এ ছাড়াও রয়েছে বৃহৎ বার শিবলিংগ যথা-সোমনাথ মহাকালা, বৈদ্যনাথ, নাগানাথ, বিম্বনাথ মালিকার্জন, রামসোয়ার, ওমকারা ত্রিম্বাক ইত্যাদি।

কালী ও দূর্গা

বৃন্দাচল, হিংলাজ, দেবীপতন, কালীঘাট, কামাখ্যা, জোয়ালমূখী, আমভভানী, কমরিন ইত্যাদি।

পবিত্র নদী

গংগোত্রী, যমোত্রী, গড়মুক্তাস্বর, নাসীক, বাতেশ্বর, বাঘাসোয়ার, ভবানী, দেওয়া, প্রয়াগ(এলাহাবাদ): গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী [ত্রিবেনী] সঙ্গম স্থল, চান্দদ, অমর কান্তক ইত্যাদি।

হিন্দু ধর্মের তীর্থস্থানের ধারণা শুধু উপর্যুক্ত স্থানসমূহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। অসংখ্য দেবালয়, টিলা, পাহাড়, জলপ্রাপাত, নদী, বৃক্ষ ইত্যাদি তীর্থস্থানের মর্যাদা লাভ করেছে। এমনকি আজমিরে অবস্থিত খাজা মঈন উদ্দিন চিশতীর (র.) মাজারেও অসংখ্য হিন্দুধর্মাবলম্বীকে ভ্রমণ করতে ও দান-খয়রাত করতে দেখা যায়। চট্রগ্রামের হযরত বায়জিদ বোস্তামীর (র.) মাজার সংলগ্ন পুকুরে কচ্ছপগুলিকে খাদ্য পরিবেশন করা ও কচ্ছপের আশির্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে নানারূপ কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রতিযোগিতা করতে দেখা যায়। হিন্দুধর্মাবলম্বীদের এ সমস্ত কর্মকাণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে মাজার কেন্দ্রিক শিরকি কার্যক্রম বিস্তারে হিন্দুধর্মের প্রভাব থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে। কারণ পৃথিবীর অন্য কোন অঞ্চলের মুসলিমদের মধ্যে মাজার কেন্দ্রিক শিরকি কার্মকাণ্ড পাওয়া যায় না।

বৌদ্ধ ধর্মে একাধিক তীর্থস্থান রয়েছে। যেমন বুদ্ধগয়া, কপিলাবাস্তু, কুশিনগর ও বেনারসের হরিণাপর্ক ইত্যাদী। গৌতম বুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত স্থান হিসেবে এ গুলো তীর্থস্থানের মর্যাদা লাভ করেছে। মায়ানমারে (বার্মা) অবস্থিত বৌদ্ধদের বৃহত্তম মন্দির তীর্থস্থান হিসেবে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। ভারতের গয়ানগরী থেকে ৬/৭ মাইল দক্ষিণে বুদ্ধগয়া অবস্থিত। এখানে রাজা অশোক নির্মিত একটি বৌদ্ধমন্দির রয়েছে। বুদ্ধের মৃত্যুর পরপরই মন্দির নির্মাণ করা হয়। এখানে স্বর্ণের তৈরী বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। গৌতম বুদ্ধ এই স্থানে বসে বহুদিন যাবৎ ধ্যান করেন। তাঁর সেই স্মৃতি কে ধারণ করার জন্যই এই মন্দির নির্মিত হয়। এখানে সু-উচ্চ স্মৃতি সম্ভ রয়েছে। নতুন ও পুরাতন বহু স্তুপ দ্বারা পরিবেষ্টিত দৃষ্টি নন্দন এই বৌদ্ধ মন্দির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছেও সমাদৃতা এই স্তম্ভের চারপাশে অসংখ্য পিপল গাছ শোভা বর্ধন করে। গৌতম বুদ্ধ একটি পিপল গাছের নিচে বসেই ধ্যান করতেন এবং তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেছিলেন। তীর্থযাত্রীরা এই মন্দিরে অবস্থিত বুদ্ধের মূর্তিতে তেল ঢালে (তর্পন করে) ও সুগন্ধি ছিটিয়ে দেয়। এখানে তারা বিভিন্ন প্রকার উৎসর্গ করে। পিপল গাছের পাতাগুলো বৌদ্ধদের কাছে স্বর্ণপত্র তুল্য। গাছের নিচে পাথরের সিঁড়ি নিচে জল পর্যন্ত গিয়েছে। বৌদ্ধরা মনে করে এই স্থানে জলের উপর গৌতম বুদ্ধ হেঁটেছেন তাই স্থানটি ঐতিহ্য বহন করে। কপিলা বাস্তুর লুম্মী নামক স্থানে গৌতম বুদ্ধ জন্ম গ্রহণ করেন। যায়গাটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত হয়। এখানে রাজা অশোক একটি শীলাস্তম্ভ নির্মাণ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধরা স্তম্ভটিকে শ্রদ্ধাভরে প্রণাম করে ও গৌতম বুদ্ধের স্মৃতি উপলদ্ধি করে। কুশিনগর বৌদ্ধদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি। কপিলাবাস্তুর পূর্বদিকে অদূরে অবস্থিত এ স্থানে গৌতম বুদ্ধ মৃত্যুবরণ করেন। কুশিনগরের যে স্থানে বুদ্ধ মৃত্যুবরণ করেন সে স্থানটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে কুশীনগর এলাকাটি পুরোই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে তীর্থস্থান হিসেবে পরিগণিত ও সম্মানিত হয়। বেনারস থেকে তিন বা চার মাইল উত্তরে স্মরনাথ মন্দির অবস্থিত। এখানে গৌতম বুদ্ধ তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার পর তার পাঁচ শীষ্যের সাক্ষাৎ লাভ করেন। ঠিক যে স্থানটিতে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয় তার নাম হরিনা পার্ক। অতঃপর সর্বপ্রথম তিনি ভক্তদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন সেই স্থানটিকে খষীপতন বলা হয়। স্মরনাথ মন্দিরের আশে পাশে বহু স্তুপ রয়েছে। এখানে গৌতম বুদ্ধের স্মরণে দুটি শীলাস্তম্ভ ও রয়েছে। স্মরনাথ মন্দিরে অসংখ্য বৌদ্ধ মূর্তি শোভাপায়। অসংখ্য ভক্ত এখানে আগমন করে পুণ্যপাবার আশায়। বার্মা (মায়ানমার) -এ বৌদ্ধদের সর্ববৃহৎ মন্দির অবস্থিত। বৌদ্ধদের ধারণা এখনে গৌতম বুদ্ধের পূর্বতর্তী চব্বিশ জন বুদ্ধের সমাধি রয়েছে। সুবিশিাল এই মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের দুই পার্শে দুটি সিংহমূর্তি স্থাপিত। ভক্তরা ফুল, আগরবাতি, ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী ও সুগন্ধি নিয়ে এই মন্দিরে প্রবেশ করে। নগ্নপায়ে বুদ্ধের সমুখে উপহার গুলো রেখে প্রার্থনা করতে হয়।

এটা ঠিক যে, উপর্যুক্ত তথ্য-উপাত্তের আলোকে আমরা বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি মাত্র। এ প্রবন্ধে পরিবেশিত তথ্যাবলী বিভিন্ন ধর্মের নির্ভরযোগ্য পুস্তকসমূহ থেকে সংগ্রহ করে পরিবেশন করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা মনে করছি বিভিন্ন ধর্মের তীর্থস্থান সম্পর্কে জানার জন্য এ প্রবন্ধটিই যেমন একমাত্র নয় তেমন যথেষ্টও নয়। তবে তুলনামূলক ধর্মের পাঠ হিসেব কিছুটা হলেও পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সমর্থ হবে সেই প্রত্যাশা আমরা করতে পারি। এই পর্যায়ে সকলমানুষের কল্যাণ কামনা করছি।আমাদের দয়াময় সেই রাস্তাটিই সকলের জন্যে বাতলে দিন যা যথার্থ সত্য ও সঠিক। আমিন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জয়পুরহাট গার্লস ক্যাডেট কলেজ।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/এইচএসএম/সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৫)