প্রচ্ছদ » ছেলেবেলাপুর » বিস্তারিত

মালেক মাহমুদ

ওমলেটের মতো চোখ

২০১৫ সেপ্টেম্বর ০৪ ২১:০৪:১১
ওমলেটের মতো চোখ

রকিব জানালা দিয়ে দেখছে, লাল জামা পরে সূর্য ঘুমাতে যায়। রকিবের চোখেও ঘুম নামছে। একটু পরেই নীরবতা নেমে আসবে শহর জুড়ে। কালোছায়া ছড়িয়ে পড়ার পূর্বেই আজানের ধ্বনিতে একাকার হতে লাগল সারা শহর।

ইট পাথরের শহরে, রকিবদের বাড়ি এখনো দোতলা। পুরানো বাড়ি। এই বাড়ি কত বছর আগে নির্মাণ হয়েছে, তা এখনো কেউ ঠিক করে বলতে পারে না। বাড়ির উঠনে ঝাঁকড়া গাছ, ডাল-পালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির ইটগুলো খুলে খুলে পড়ছে। ঠিক করার কেউ নেই যেন। ছোট ভাই নিশাদ বাড়ি নেই। বাবা দেশের বাইরে।

এই বাড়ি রকিবদের নয়। ভাড়াবাড়ি। বাড়িওয়ালা কেন বাড়ি ঠিক করছে না, তা রকিব জানে না। এই পুরানো বাড়িতেই বড় হয়েছে রকিব। চেনা-জানা বাড়ি। আজ তার কাছে অচেনা মনে হতে লাগল। ঘুম ঘুম চোখ ঘুমাতে চায়।

মা উচ্চ স্বরে— রকিব, রকিব বলে ডাকতে লাগলেন।
—না, রকিবের কোনো সাড়া শব্দ নাই।
মা, গুঁটি গুঁটি পায়ে এলেন রকিবের ঘরে। শান্ত রকিবকে ডাক দিলেন আদর দিয়ে। মামণির আদরের ডাক— কী রে খোকা, কী করছিস?
—বসে আছি মা, বড্ড খারাপ লাগছে।
—কেন রে?
—তা জানি না, মা!
—আয় খাবি। তারপর ঘুমিয়ে পড়বি।
মায়ের কথা মতো তাড়াতাড়ি খেয়ে ঘুমুতে গেল রকিব। ঘুম চোখ রাতকে গভীর করতে লাগল। রাতকে দিন করতে লাগল। উলট-পালট খেলার ভাজে, ফুরফুরা মন নিয়ে ঘুমিয়ে গেল সে।

ঘুমিয়ে যেতে না যেতেই। রকিবের ওমলেটের মতো চোখ হয়ে গেল। সেই চোখে দেখতে পেল ঝলমলে সকাল। রোদের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ব্যস্ত শহর ব্যস্ততায় ভরে উঠেছে। রকিব ঢাকার রাজপথে হাঁটছে। কাকরাইলের মোড়ে যেতেই দেখতে পেল, একজন শিংওয়ালা মানুষ, শিং দেখিয়ে চলন্ত গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে। গাড়ি ও মানুষ বোকার মতো শিংওয়ালা লোকটির কথা শুনছে। লাখ লাখ গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে। গাড়িতে বসা মানুষগুলো গরম-রোদ গিলছে।

চোখ পলক দেওয়া মাত্রই দৃশ্যপট উল্টে গেল, ওমলেট চোখ দেখতে পেল, শিংওয়ালা লোকটি আর নেই। লাঠি হাতে ট্রাফিক গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে।

ভাবতে লাগল। আমি যা দেখেছি, তা কী ভুল দেখেছি! শিংওয়ালা কোনো মানুষ আছে নাকি? মনে মনে ভাবতে লাগল আর হাঁটতে লাগল। আমি যা দেখেছি ভুল দেখেছি? পা চলছে শান্তিনগরের দিকে। শান্তিনগর, অশান্তিনগর করে দেয় আষাঢ়ের মুষলধারা বৃষ্টি। আজ বৃষ্টি নেই, দুপুর রোদে ধবধবে জোছনা।

জোছনার আলো রাতে ছড়ায়, আজ দিনে-দুপুরে ছড়িয়ে আছে কেন?
মানুষ আর মানুষ, এত মানুষ রাস্তায় কেন?
মানুষগুলো কথা বলছে না কেন?

গাড়ির পিছনে গাড়ি
গাড়ির বহর।
উলট-পালট লাগে
তামাম শহর।

মানুষ হাঁটছে বোবা মিছিলের মতো। হাঁটতে হাঁটতে শান্তিনগর মোড়টায় যেতেই, ওমলেট চোখ দেখতে পেল, সেই শিংওয়ালা লোকটি। তার হাতটি দশ হাত লম্বা। এক হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাখছে। আর এক হাত দিয়ে টাকা তুলছে। সবাই দিচ্ছে কেউ কিছু বলছে না। আশে-পাশেই টহলপুলিশ। দেখছে, কিছুই বলছে না।

ডান পাশে রাজারবাগ পুলিশ লাইন। এই পথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল রকিব। আজ তার কাছে মনে হতে লাগল নতুন ঢাকা। এই নতুন ঢাকাকেই নতুন করে দেখতে লাগল ওমলেট চোখে। যা দেখছে তাই যেন নতুন নতুন লাগে। যা দেখতে লাগল তাই বলতে লাগল। ওর কথা কেউ শুনছে কেউ শুনছে না। এবং কী কেউ বিশ্বাসও করছে না রকিবের কথা।

রকিব যা দেখছে তা কেউ দেখছেই না, মনে হতে লাগল রকিরের কাছে। তবুও একা একা বক্‌বক্‌ করতে করতে হাঁটতে লাগল।

রকিবের কথা শুনে এক পাগল হি হি করে হাসতে লাগল। পাগলের কাছে যেতেই পাগল বলে উঠল— কী রে! তোর কথা কি কেউ বিশ্বাস করে না রে?

রকিব কথা না বলে মাথা ঝাঁকি দিয়ে সায় জানাল।

—কী করে করবে, তুই যা দেখেছিস ওরা তো তা দেখতেই পারে নাই। ওদের চোখতো কালা, ওমলেট না। কালা চোখে কালাকে দেখতে পায় কেউ? কালা মানে, পাপী। এই পাপীকে সেই লোক দেখতে পারবে, যে লোক এখনো কোনো পাপ কাজ করেনি। তারাই দেখতে পাবে, ওমলেট চোখে পাপীদের চেহারা।
—তা হলে ওরা কী পাপী?
—তা আমি বলব কেন? দেখার ও বলার লোক আছে না, তারা কী করে? তারা বলতে পারে না? কী করে বলবে? পাপীর চোখে পাপকে কি কখনো দেখে?
—না, দেখে না!
—হু, যারা দেখে তাড়া মুখে কিছু বলে না। কার কাছে বলবে? কালার কাছে বলে কী লাভ? উল্টো ফেঁসে যাওয়া আর কি!
হি হি হাসি, পাগলের হাসি। পাগল যা করে তা পাগলামি। ও মানুষগুলো যা করে তা কালাপাপ হি হি...।

পাগলের কাছ থেকে বিদায় নিল রকিব। হাঁটছে আর বলছে— যা দেখেছে তাই। পাপী মানুষেরা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। মতিঝিলে আসতেই দেখতে পেল বিশাল লেজওয়ালা মানুষ। লেজ দিয়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা আর টাকা। দেখেই দাঁড়িয়ে গেল। দেখতে লাগল। কীভাবে হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে টাকা তুলে পকেট ভরছে। রকিবের পাশে ফিক করে হাসতে লাগল ছয় বছরের একজন বালক নাম ঝুপঝুপ। চোখে চোখ পড়তেই কথা বিনিময় হল ওমলেট চোখে। কথা বলতে বলতে চলে আসে পুরানা বাড়ির সামনে। রকিব বাড়ির ভিতরে আসতে বললেই ঝুপঝুপ বলল— আমি ওই কুঁড়ে ঘরটায় থাকি। বাবা মা পরের বাড়ি কাজ করে। ঘরে একা থাকতে ভাললাগে না, তাই ঘোরাফেরা করি সারা শহর।

—তোমারও ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে, আমারও ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে। তুমিও পাপীর হাত পা দেখেছ, আমিও পাপীর হাত পা দেখেছি। তোমারও ওমলেট চোখ আছে, আমারও ওমলেট চোখ আছে। এই এক জায়গায় তোমার আর আমার অনেক মিল। ঝুপঝুপ রকিবের কথা শুনে এক গাল হাসি দিল। কিছু না বলেই চলে গেল কুঁড়ে ঘরের দিকে। রকিব কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখতে লাগল। বাঁদিকে ঘুরতেই দেখতে পেল ঝাঁকড়া গাছ। ভাবতে লাগল ইট পাথরের শহরের পুরানো বাড়ির ঝাঁকড়া গাছের প্রাণ শক্তিই আলাদা।

বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ল লেজওয়ালা লোকটা। শিং নেই লম্বা হাতও নেই। বড় বড় দাঁত। দাঁত দিয়ে রকিবকে কামড়ে দিতে চাইল। তখনি রকিব হাউ মাউ করে ওঠে। মা পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এসে বললেন— কী হইয়েছে রে খোকা?

ওমলেটের মতো চোখ করে রকিব বলল— মা, মা গাছতলে...!

লেখক : ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক