প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

ভগবান কেন আসেন

২০১৫ সেপ্টেম্বর ০৫ ০২:৫৬:০০
ভগবান কেন আসেন

শ্রী বেণুধারী দাস ব্রহ্মচারী

শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীপাদ শ্রীচৈতন্য চরিতামৃতে ভগবানের অনন্ত অবতার বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন-

অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড, তার নাহিক গণন।

কোন লীলা কোন ব্রহ্মাণ্ডে হয় প্রকটন।।

এই মতো সব লীলা যেন গঙ্গাধার।

সে লীলা প্রকট করে ব্রজেন্দ্রকুমার।।

চৈ.চ.মধ্য২০/৩৮০-৮১

তাহলে প্রশ্ন হতে পারে, কর্মফল ভোগ্যজীব এই সংসারে বার বার জন্মমৃত্যুচক্রে ঘুরপাক খায়, আর ভগবানও বার বার জন্মগ্রহণ করেন; তাহলে পার্থক্য কী? ভগবান এ প্রসঙ্গে সবাইকে সংশয়মুক্ত করার জন্য বললেন-আমি ‘অজ’অর্থাৎ জন্মরহিত, তবে স্বেচ্ছাক্রমে স্বীয় চিৎশক্তি আত্মমায়া অর্থাৎ যোগমায়াকে আশ্রয় করে আমি স্বীয় স্বরূপে অবতীর্ণ হই(গী.৪/৬)। ব্যাসাবতার শ্রীল বৃন্দাবন দাস ঠাকুরকৃত শ্রীচৈতন্য ভাগবতে (আদি-৩/৫২) পাই-

এসব লীলার কভু নাহি ভেদ।

আবির্ভাব, তিরোভাব মাত্র কহে ভেদ।।

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ একটি ব্যবহারিক দৃষ্টান্তের মাধ্যমে এই শ্লোকের তাৎপর্য সরলভাবে বুঝিয়েছেন-‘ভগবান চিরকালই অজ, নিত্য, শাশ্বত, পুরাতন, আদি পুরুষ সচ্চিদানন্দময়।তাঁর আবির্ভাব ও অন্তর্ধান সূর্যের মতো-আমাদের দৃষ্টিপথে উদিত হলে যেমন আমরা মনে করি সূর্যের উদয় হলো। আকাশে সূর্যকে দেখে যেমন আমরা মনে করি সূর্য এখন আকাশে রয়েছে, তারপর আমাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলে আমরা মনে করি,সূর্য এখন অস্তগেল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সূর্য এক জায়গায় স্থির হয়ে আছেন, আমাদের বিকৃত ইন্দ্রিয়ের প্রভাবে আমরা মনে করি যে, সূর্য উদিত হয় এবং অস্ত যায়। ভগবানও তেমন নিত্য। তাঁর আবির্ভাব ও অন্তর্ধান সাধারণ মানুষের জন্ম-মৃত্যুর মতো নয়; তা সম্পূর্ণ ভিন্ন’।

তারপর ভগবান তাঁর আবির্ভাবকাল বর্ণনা করে বলেছেন-মানুষ যখন বেদবিহিত আচার অনুষ্ঠানাদি পরিত্যাগ করে বিবিধ অসদাচরণে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত হয় অর্থাৎ অধর্মের প্রাদুর্ভাবকালে জীবের প্রতি করুণা পরবশ হয়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে প্রকাশ করে(সৃজামি) ভূতলে অবতরণ করেন।

এখন আমাদের কৌতুহল জাগতে পারে যে, ভগবান এ জগতে এসে কীভাবে তাঁর কার্যাদি সমাধান ও জীবগণের প্রতি কৃপা বর্ষণ করেন। সে প্রসঙ্গে পরবর্তী শ্লোকের অবতরণ। তাতে তিনি বলেছেন, আমি অবতীর্ণ হয়ে মূলত তিনটি কার্যসমাধা করি-

সাধুদের পরিত্রাণ অসাধুর বিনাশ।

যে করে অধর্ম তার করি সর্বনাশ।।

আর ধর্ম স্থিতি অর্থ করিতে সাধন।

যুগে যুগে আসি আমি মান সে বচন।।-গীতার গান

১। সাধুদের পরিত্রাণ: আমার যে সকল একান্ত ভক্ত আমার দর্শনাকাঙ্ক্ষায় অতিশয় উৎকণ্ঠ চিত্ত, তাঁদের দর্শন দান করি। তাঁদের বিরহ বেদনা দূর করি অর্থাৎ ভক্তদের সঙ্গে লীলা আস্বাদন করি।

২। দুষ্কৃতি বিনাশ: সমাজে উৎপীড়নকারী অসুরদের বিনাশ করে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করি।

৩। ধর্ম সংস্থাপন: অর্থাৎ জগৎ জীবের কল্যাণার্থে তাঁদের ধর্মযোগ শিক্ষাপ্রদান করি, যার মাধ্যমে জীব আমার ধামে ফিরে আসতে পারে।

শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর প্রাঞ্জল তাৎপর্যে-এজগতে ভগবানের আসার কারণগুলোকে দুভাগে ভাগ করেছেন-১। গৌণ কারণ ২। মুখ্য কারণ

১।গৌণ কারণ: অসুর বিনাশ ও ধর্মসংস্থাপন কার্যদুটিকে তিনি গৌণ কারণ বলে বর্ণনা করেছেন। কারণ অসুর বিনাশের জন্য ভগবানকে সরাসরি আসতে হবে কেন? ভগবানের অনন্ত শক্তি রয়েছ যার ভ্রুভঙ্গিতে, ইঙ্গিতে এই সমস্ত অসুর অনায়াসেই বিনাশ প্রাপ্ত হয়। ভগবানের বিভিন্নাংশ জীবশক্তি একটি ছোট মশা, আজ বহুলোককে হত্যায় পর্যবসিত করছে। আসুরিক সভ্যতার ভগবদ্‌বিহীন সমাজ ভগবানকে অস্বীকার করে, প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করে,কত উন্নত টেকনোলোজির সূক্ষ্ম আবিষ্কার, কিন্তু সে সবকিছু আজ একটি ছোট মশা বা ডেঙ্গুর কাছে পরাস্ত হচ্ছে। বঙ্গভূমির রাজধানী কলকাতায় এই মশার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য করপোরেশনের কত পরিকল্পনা, মিটিং-মিছিল, হোড়িং প্রভৃতি জনসচেতনার বহু প্রয়াস দর্শন করা যায়। এক কথায় বলা যায় ‘মশা মারতে কামান দাগা’। পাপাচারী মানুষের ভারে ভারাক্রান্ত পৃথিবীতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও বহু সংখ্যায় নাশ দেখা যায়। তাছাড়া অসুরস্বভাবী স্বার্থান্বেষী মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হিসেবে রয়েছে পারমাণবিক বোমা। এক সময় একজন বৈজ্ঞানিক ও শ্রীল প্রভুপাদের বার্তালাপের সময় প্রভুপদের এক প্রশ্নের উত্তরে বৈজ্ঞানিক মহাশয় বলেন, আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো পারমাণবিক বোমা যা মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ লক্ষ জনসংখ্যা ধ্বংস করতে সক্ষম। শ্রীল প্রভুপাদ খুবই দুঃখিত সুরে বলেছিলেন, হ্যাঁ, আপনারা ধ্বংস করার জন্য তৈরি হয়েছেন। অসুরেরা নিজেরাই বিভ্রান্ত হয়ে নিজেরাই নিধন প্রাপ্ত হয়। তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে অসুর-সংহার ভগবানের কার্য নয়।

এবার বিচার করা যাক, ধর্মসংস্থাপন-এক্ষেত্রেও দেখব ভগবানের প্র্রেরিত দূত, ভগবানের শক্তি সমন্বিত মহান শক্তিশালী আচার্যও এই কাজটি করতে সক্ষম। বর্তমান সময়ের কথা বিবেচনা করলে বলতে পারি, শ্রীমন্‌মহাপ্রভু চলে যাওয়ার পর এই বৈষ্ণব ধর্ম নানাপ্রকার অপসম্প্রদায় কর্তৃক কলুষিত হয়ে পড়ে।গৌরশক্তি স্বরূপ সচ্চিদানন্দ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শাস্ত্রসমূহের সারকথা সহজ ভাষায় সংকলন করে প্রাকৃত গৌড়ীয় সারধর্ম জগতে প্রচার করে অপসম্প্রদায় কর্তৃক কলুষিত হয়ে পড়ে। গৌরশক্তি স্বরূপ সচ্চিদানন্দ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শাস্ত্রসমূহের সারকথা সহজ ভাষায় সংকলন করে প্রাকৃত গৌড়ীয় সারধর্ম জগতে প্রচার করে ভক্তিগঙ্গায় জগৎকে প্লাবিত করে রক্ষা করলেন। পরবর্তীকালে তাঁর সুযোগ্য সন্তান শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর ও

শ্রীল সরস্বতী ঠাকুরের মহান শক্তিশালী শিষ্য ও নিজজন শ্রীল প্রভুপাদ আজ সারা বিশ্বকে বৈষ্ণব ধর্মে সিক্ত রে নিঃশেষ ও শূন্যবাদরূপ অধর্মের হাতছানি থেকে জগতকে রক্ষা করলেন। আজও বর্তমান আচার্যগণ ধর্মকে জগতের প্রতিটি দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এবং মহাপ্রভুর বাণী সার্থক করা জন্য ব্যাপৃত আছেন।

২। মুখ্য কারণ: সিদ্ধান্ত হচ্ছে যে, ভগবান জগতে আসার মুখ্য কারণটি হচ্ছে সাধুদের পরিত্রাণ করা। শ্রীল প্রভুপাদ গীতার ৪/৮ শ্লোকের তাৎপর্যে লিখেছেন-‘ভগবানের ভক্তদের নানাভাবে কষ্ট দেয়, তাঁদের উপর উৎপাত করে, তাই তাঁদের পরিত্রাণ করার জন্য ভগবান অবতরণ করেন।’তাঁর ভক্তদের বিরহ বেদনা দূর করার জন্য, ভক্তদের আনন্দ বিধানের জন্যই এ জগতে ছুটে আসেন। কথাটি একটু অত্যুক্তি মনে হতে পারে। একবার মুসলমান সম্রাট আকবর তাঁর বিদুষক বীরবলকে (হিন্দু) বলেন, আমি শুনেছি তোমাদের ভগবানকে ভক্তদের সুরক্ষার জন্য এই ধরাধামে চলে আসতে হয়। আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে যে, তোমাদের ভগবান কি সর্বশক্তিমান নয়? কারণ ভগবান অবশ্যই সর্বশক্তিমান হবেন এবং তাঁর ইঙ্গিতে এই চরাচরে সমস্ত কার্য সম্পাদিত হবে। সুচতুর বীরবল সম্রাটের প্রশ্নের উত্তরের জন্য কিছুদিন সময় চাইলেন।একদিন সকালবেলায় শান্ত-সুনির্মল পরিবেশে পুষ্প উদ্যানে হাস্য-কৌতুক রসে প্রাতঃভ্রমণরত মহারাজ ও বিদুষক। বাগানে পাখিদের কলকাকলি, প্রস্ফুটিত ফুলের সৌরভ, কচি ঘাসের উপর শিশির বিন্দু-সে এক অপরূপ শোভা, মানুষের সংসার জীবন ও ক্লেশকে ভুলিয়ে দেয়। উদ্যানের পাশে স্বচ্ছ জলের একটি সুবৃৎ সরোবর, তাতে দেখা গেল এক নাবিক পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে সম্রাটের ছোট পুত্রটিকে নিয়ে জলবিহার করছে। তা দেখে রাজা খুবই উল্লসিত। কৌতুক রসের মহড়ায় বীরবল রাজাকে আনন্দরসের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিয়েছেন।এমতাবস্থায় প্বার্শবর্তী সরোবর থেক জলে পড়ে যাওয়ার কিছু শব্দ সেই আনন্দে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। রাজা ফিরে দেখেন তাঁর ছেলে, যাকে নিয়ে জলবিহার হচ্ছিল, সে জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। রাজা কারো অপেক্ষা না করে সবস্ত্রে জলে ঝাঁপ দিয়ে তার শিশুপুত্রকে উদ্ধার করেন। কিন্তু রহস্যের বিষয় এই যে, বাস্তবে তা কিন্তু তার শিশুপুত্র ছিল না। তা ছিল পুত্রের আকারে তৈরি মডেল বা খেলনা। এই ঘটনায় রাজা খুবই দুঃখরোষ প্রকাশ করেন। ভীতগ্রস্ত নাবিক সমস্ত সত্যরহস্য প্রকাশ করে বলেন, এ সমস্তই বীরবলের পরিকল্পনা মাত্র। রাজাকে অনেক অনুনয় বিনয় করে শান্ত করে বীরবল বলেন-মহারাজ, কয়েকদিন আগে আমার প্রতি আপনার প্রশ্নের উত্তর দানের জন্য আমার এই পরিকল্পনা। দেখুন মহারাজ, আপনার লক্ষ লক্ষ সৈন্য রয়েছে যারা আপনার ভ্রুভঙ্গিতে প্রাণ পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত। তারা কি আপনার বিপদগ্রস্ত পুত্রের প্রাণরক্ষা করতে সমর্থ? আর তাছাড়া আমি আপনার সঙ্গে রয়েছি, এ দাসের প্রতি কি আপনার এতটুকু বিশ্বাস নেই? না, বস্তুত ছেলেটি আপনার, আপনি আপনার ছেলেকে এত ভালোবাসেন যে, কারো অপেক্ষা না করে নিজেই বিপদকে তুচ্ছ করে জলে ঝাঁপ দিয়ে তাকে বাঁচিয়েছেন। আপনার এই এক সন্তানের প্রতি এতটাই প্রেম-ভালোবাসা প্রদর্শন করলেন। দেখুন, আমাদের ভগবান সমস্ত জীব বা অনন্তকোটি সন্তানের পিতা, তাঁর অনন্ত প্রেম। তাই তাঁর সন্তানেরা যখন বিপদাপন্ন হয়ে আর্তিভরে তাঁকে ডাকেন, তখন কি আর তিনি স্থির থাকতে পারেন? তিনি সর্বদা সন্তানদের জন্য উদগ্রীব। তাই তিনি বার বার এই ধরাধামে স্বয়ং চলে আসেন। তাই এই আলোচনার মাধ্যমে বোঝাতে চাইছি যে, ভগবানের আসার মুখ্য কারণটি হলো তাঁর ভক্তদের আনন্দ বিধানার্থে তাঁদের তাঁর লীলায় অংশগ্রহণ করিয়ে আনন্দ প্রদান করা।–হরেকৃষ্ণ

লেখক: কৃষ্ণভক্ত,পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/সেপ্টেম্বর৫,২০১৫)