প্রচ্ছদ » বিশ্ব » বিস্তারিত

শাহনেওয়াজ খান

জার্মানীতে শরণার্থী : বোঝা না আশীর্বাদ

২০১৫ সেপ্টেম্বর ০৮ ১৬:০৬:২৮
জার্মানীতে শরণার্থী : বোঝা না আশীর্বাদ

যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে যাওয়া শরণার্থীদের নিতে রাজি হচ্ছে না এমন সময় এগিয়ে এসেছে জার্মানী। দেশটি প্রচুরসংখ্যক শরণার্থীকে জায়গা দিচ্ছে। এমনকি শরণার্থী সঙ্কট মোকাবেলায় অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও নিয়েছে।

জার্মানীর এই উদ্যোগকে মানবিক দিকে থেকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হয়। যদিও প্রশ্ন রয়েছে, শরণার্থী সমস্যা তো আসলে পশ্চিমাদেরই সৃষ্টি। কথাটি সর্বাংশে সত্য না হলেও অনেকাংশেই সত্য। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায় যুক্তরাষ্ট্রের। জার্মানীর দায়ভার সেখানে কতটুকু তা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবে তা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যের তুলনায় বেশি নয় নিশ্চয়ই।

আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশেই যুদ্ধ-সংঘাতের পাশাপাশি রয়েছে অভাব। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে চলছে ভয়াবহ সংঘর্ষ। সহিংসতার জাঁতাকলে পিষ্ট মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরাও।

ভূমধ্যসাগর, তুরস্ক বা অন্যান্য পথে ইউরোপে পাড়ি দেওয়া বেশিরভাগ শরণার্থীই সাব-সাহারান আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোর। যুক্তরাজ্য বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলো যখন শরণার্থীদের ব্যাপারে অনেকটা নিশ্চুপ তখন এদের একটি বিশাল অংশকে জায়গা দিচ্ছে জার্মানী।

জার্মানীর এ অবস্থানের পেছনে মানবিক দৃষ্টিকোণ তো রয়েছেই, সঙ্গে রয়েছে আর্থসামাজিক দৃষ্টিকোণও।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জার্মানীর বিশাল অর্থনীতির জন্য দেশটিতে প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন। আর তা যদি কমমূল্যে পাওয়া যায় তাহলে তো কথাই নেই। এদিক থেকে শরণার্থীরা দেশটির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। এদের স্বল্পমেয়াদে থাকা ও কাজের অনুমতি দেশটির শ্রমিক চাহিদা মেটাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল— জার্মানীতে শরণার্থী হিসেবে শুধু যুদ্ধসংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকেই নয়, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত অনেক অবৈধ কর্মীও যাবে। তারা শরণার্থীদের সঙ্গে মিশে দেশটিতে থাকার সাময়িক অনুমতি লাভ করবে। এই লোকদের মূল লক্ষ্য কয়েক বছরের জন্য বৈধতা লাভ করে অর্থ উপার্জন করা। সুতরাং, সস্তা শ্রমিক হিসেবে প্রশিক্ষিত-স্বল্প প্রশিক্ষিত কর্মীর একটা বিশাল অংশ সহজেই পাচ্ছে জার্মানী।

শ্রমিক নেওয়ার দিক থেকে অবশ্য জার্মানীর পূর্ব ইতিহাস রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কা সামলাতে ১৯৫৫ সালে ‘অতিথি শ্রমিক’ নেয় পশ্চিম জার্মানী। ইতালী, স্পেন, তুরস্কসহ ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলো থেকে শ্রমিক নেওয়া হয়। সে সময় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লোক অতিথি শ্রমিক হিসেবে দেশটিতে যায়, যারা এখন বিশাল জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক পূর্ব জার্মানীও উত্তর ভিয়েতনাম, কিউবা ও মোজাম্বিক থেকে লোক নেয়। তবে দুই জার্মান একত্রিত হওয়ার পর বেশিরভাগ ভিয়েতনামীই সেখান থেকে চলে আসে।

১৯৯০ সালে দুই জার্মানী একত্রিত হওয়ার পরের বছর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ২ লাখেরও বেশি ইহুদি নেয় দেশটি। এ ছাড়া বসনিয়া যুদ্ধের সময় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ বসনিয়ানকে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেয় জার্মানী, যাদের বেশিরভাগই পরবর্তীতে চলে আসে।

সস্তা শ্রমের বিষয়টি ছাড়াও আরেকটি বিষয় এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আর তা হল জনসংখ্যা। দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ৮ কোটি ১০ লাখেরও বেশি। এদের মধ্যে এক কোটিরও বেশি লোক ভিন্ন দেশ থেকে আসা। এ অবস্থায় নতুন করে শরণার্থী এলে জনসংখ্যা আরও বাড়বে।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে জার্মানীকে বর্তমানে যে সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে তা হল- দেশটির মূল অধিবাসীদের সংখ্যা নিম্নগামী। জন্মহার শূন্যেরও নিচে (মাইনাস) থাকায় দিন দিন মূল জার্মানের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশটির ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সঙ্গে জনসংখ্যার মিল রাখতে আপাতত অভিবাসী ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পোড় খাওয়া জার্মানী বর্তমানে ইউরোপে অর্থনৈতিকভাবে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় বর্তমান ইউরোপীয় ইউনিয়নে দেশটির প্রভাব অনেক বেশি। এক্ষেত্রে শরণার্থী সঙ্কট মোকাবেলা ও অন্যান্য ইস্যুতে দেশটির সরব ভূমিকা এ অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

শরণার্থীদের নেওয়ার কারণে রাজনৈতিক দিকে থেকে জনগণের সহানুভূতি লাভ করবেন জার্মান চ্যান্সেলর এ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল। একই সঙ্গে সিরিয়া, লিবিয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গেও জার্মানীর সম্পর্কের আরও উন্নয়ন ঘটবে, যা তাদের ব্যবসায় ও কূটনীতিকে আরও ত্বরাণ্বিত করবে।

এ সমস্ত আর্থসামাজিক দিক বিশ্লেষণের পরও শরণার্থীদের প্রতি জার্মানীর এ আচরণকে স্বাগত জানাতেই হয়। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুরতে থাকা হতভাগা লোকগুলো তো সাময়িকভাবে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেল। সঙ্গে সঙ্গে এটাও ভুলে গেলে চলবে না— ধনী দেশুগলোর কারণে সৃষ্ট এ সঙ্কট মোচনের দায়ভার কিন্তু তাদের কাঁধেই।

লেখক : সাংবাদিক