প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

ভ্যাট দেব না, গুলি কর

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১০ ১৮:১০:২৪
ভ্যাট দেব না, গুলি কর

মনোজ দে

বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে শিক্ষা ও জ্ঞানের সর্বজনীনতা ও বিশ্বময়তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একইভাবে সার্বভৌমত্ব বা স্বশাসনের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বভৌম এলাকায় জ্ঞানচর্চার জন্য দায়বদ্ধ একমাত্র সামাজিক মানুষের কাছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার ফলাফল শুধু নগদ নয়, আগামী পৃথিবীর সমাজ ও মানুষের। ইউরোপে আলোকায়নের মধ্য দিয়ে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বর্তমান ধারার যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রের অধিভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বশাসনের এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র ও সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভাল করলেও এর উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার ছিল না। মোটামুটি গত শতকের ৭০-এর দশক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞানগত উদ্ভাবনা এ ধারণার মধ্যে কমবেশি আবর্তিত হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত অধিকার হিসেবেই স্বীকৃত।

ইংল্যান্ডের লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচারের সরকারের আমলে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্বশাসনের ক্ষমতা খর্ব করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে জুড়ে দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বহুজাতিক খবরদারিত্বের সূচনা হয়। শিক্ষা অধিকার থেকে পরিণত হয় পণ্যে। উচ্চশিক্ষা ব্যবসা দিয়েই ২০০৮ সালের মহামন্দা মোকাবেলা করেছিল যুক্তরাজ্য।

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক উচ্চশিক্ষা নব্বইয়ের দশকে শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় নামে এ সব প্রতিষ্ঠান হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধারণাকেই এখানে গ্রহণ করা হয়নি। বাংলাদেশের বাজারে সে সময়ে প্রবেশ করা সেবা খাতের জন্য জনবল তৈরিতে বিবিএ, এমবিএ, কম্পিউটার সায়েন্স এ রকম কয়েকটি বিষয় নিয়ে এ সব প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। সাধারণত মেধার যোগ্যতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চান্স না পাওয়া ধনিক শ্রেণীর সন্তানেরা এ সব প্রতিষ্ঠানে পড়তে শুরু করে। চালু হয় টাকা দিয়ে শিক্ষা কেনার এ রীতি। গত দেড় দশকে বৈশ্বিক পুঁজির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলাদেশেও পুঁজির আধিপত্যে বাণিজ্যিক উচ্চশিক্ষার দুয়ার খুলেছে কিছু ব্যবসায়ী। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টেলি যোগাযোগসহ অন্যান্য সেবা খাতের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে প্রায় দেড় শতাধিক এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাজারের চাহিদার উপর ভিত্তি করে হাতে গোনা কয়েকটি বিষয়ে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। এখন আর শুধু ধনিক শ্রেণীর সন্তানেরা এ সব প্রতিষ্ঠানে পড়ছে না, মফস্বলের চাকরিজীবী কিংবা গ্রামের কৃষকের সন্তানেরাও জমি বিক্রি করে এখানে পড়তে আসছে। এনজিওদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সপ্তাহ সপ্তাহ উচ্চ কিস্তির টাকা পরিশোধ করে তাদের কিনতে হচ্ছে এ উচ্চশিক্ষা। সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সারা জীবনের কষ্টে জমানো সঞ্চয় পুরোটাই বিনিয়োগ করছে বাবা-মা। সর্বস্ব বিনিয়োগে তারা চাকরি পাবে এমন নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। বরং উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে অনিশ্চয়তা আর হতাশা।

গত বুধবার ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে গেলে পুলিশ লাঠিপেটা,টিয়ারশেল ও গুলি ছুঁড়েছে। গুলিতে রক্তাক্ত হয়েছে শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুলিশের দমন-পীড়নে পিছপা হয়নি তারা।

টাকার বিনিময়ে শিক্ষা বিক্রি করা এ সব প্রতিষ্ঠানে শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। তাদের কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক অধিকার কিংবা কথা বলার অধিকারকে সেখানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বিরাজনীতিকীকরণের ক্ষেত্র বজায় রাখতে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান ষোলআনা সচেতন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনীতি হয় বলে সেগুলো খারাপ এ ধারণাকে গুলিয়ে খাওয়াতে সবসময়ই মরিয়া থেকেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা বছরে বছরে টিউশন ফিসহ অন্যান্য ফি বাড়ানোর সুযোগের অপেক্ষায় থেকেছে এবং বাড়িয়ে চলেছে। শিক্ষার্থীরা কোনো প্রতিবাদ এখানে করতে পারেনি। এ সব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা শুধুই ভেবেছে বাণিজ্য আর মুনাফার বিষয়টা। সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তারা মুনাফা করেই যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীদের চার বছরে কোর্স সমাপ্ত করতে গুনতে হচ্ছে কমবেশি ৫-২০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে আবাসন, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত করলে ব্যয়ের অঙ্কটা দ্বিগুণের কম হবে না। এ সব ব্যয় মেটাতে হাঁসফাঁস করতে থাকা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের ওপর মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে আরোপ করা হয়েছে সাড়ে সাত শতাংশ ভ্যাট। বছরে শিক্ষা কেনার জন্য যে ছেলেটি বা মেয়েটি ৩ লাখ টিউশন ফি দেয় তাকেই নতুন করে গুনতে হবে আরও সাড়ে একুশ হাজার টাকা।

সরকারের এই ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে বিভিন্ন বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছে। গত তিন মাস ধরে তারা আন্দোলন করছে। গত বুধবার ইস্ট ওয়েস্টের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে গেলে পুলিশ লাঠিপেটা, টিয়ারশেল ও গুলি ছুঁড়েছে। গুলিতে রক্তাক্ত হয়েছে শিক্ষকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পুলিশের দমন-পীড়নে পিছপা হয়নি তারা। নতুন করে সংগঠিত হয়ে আবার রাস্তায় নেমেছে। তারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছে ‘আমাদের গুলি কর, আমরা ভ্যাট দেব না’। এ স্লোগানকে শুধু আবেগি স্লোগান বললে ভুল হবে। এ স্লোগান চূড়ান্ত রাজনৈতিক স্লোগান। রাষ্ট্রকে সরাসরি রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার স্লোগান। চরম বিরাজনৈতিক শিক্ষা আবহের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীরা যখন এ স্লোগান তোলে তখন বুঝতে হয় অন্ধ হলেও প্রলয় বন্ধ থাকে না। শিক্ষার্থীরা আমাদের সমাজ-রাজনীতির বাইরে নয়। এখানে রাজনীতির অর্থ নাগরিক হিসেবে কারো অধিকার। এ অধিকার ক্ষুণ্ন হলে আমরা কথা বলবই। জনগণের সেবক হিসেবে সরকারের অধিকার নেই অন্যায়-অবিচার আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার, কিংবা জুলুম করার। আমাদের কর-ভ্যাটের টাকায় চলা কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আমাদেরই লাঠিপেটা বা গুলি করার অধিকার নাই। এ অধিকার তাদের নেই শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষক কিংবা অন্য কারো উপর নিপীড়ন করার।

শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন কি শুধু ভ্যাট কমানোর আন্দোলন? ভ্যাট বাতিলের দাবির সঙ্গে ওদের আন্দোলনের স্লোগানগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ‘আমরা ছাত্র, ক্রেতা নই’, ‘আমার বাবা এটিএম বুথ নয়, মৌলিক অধিকারের উপর ভ্যাট নয়’, ‘মালের পেট কেন ভরাবে আমার বাবা’- এ সব স্লোগানে তরুণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রবণতা স্পষ্ট। তারা উপলব্ধি করতে পারছে শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্র এক শ্রেণীর মানুষকে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে। এ ব্যবসার নির্মম বলি হচ্ছে তারা। তাদের অনিশ্চয়তা, তাদের হতাশাকে তারা প্রশ্ন করছে, মোকাবেলা করছে। একই রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েও শিক্ষা টাকা দিয়ে তাদের কিনতে বাধ্য করানো হচ্ছে। এ বৈষম্য, এ নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক স্লোগান তুলছে। এখানে রাজনীতিটা রাজনৈতিক দলের প্রশ্ন নয়, বরং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে অধিকারের প্রশ্ন। এ আন্দোলন সমাজের তরুণ অংশের মধ্যে নতুন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্ম দিচ্ছে। এ আন্দোলন শিক্ষার পণ্যায়নের বিপরীতে অধিকারের রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে আনছে। এ আন্দোলন থামার নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক এ্যাক্টিভিস্ট।

• মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখা— লেখকের নিজস্ব চিন্তা ও মতের প্রতিফলন। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের লেখার বিষয়বস্তু, মত অথবা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।