প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

 

উচ্চশিক্ষায় বিশ্বব্যাংকের নীলনকশা ও ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১১ ২০:১৯:৩৯
উচ্চশিক্ষায় বিশ্বব্যাংকের নীলনকশা ও ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন

আরিফুজ্জামান তুহিন

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের চেষ্টা নতুন নয়। পাকিস্তান আমল থেকেই এই চেষ্টা করা হচ্ছে। মূলত এটা একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় মডেল। বহু ইউরোপীয় রাষ্ট্র আছে যেখানে শিক্ষাব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে করা। এমনকি শিক্ষাকালীন একজন শিক্ষার্থী যাতে নিজের খরচে থাকতে পারে সে জন্য ১ শতাংশ সুদে ঋণও দেওয়া হয় তার দৈনন্দিন খরচ নির্বাহের জন্য। আর শিক্ষাগ্রহণের পাশাপাশি চাকরি করার সুযোগ ইউরোপে রয়েছেই। কিন্তু বাংলাদেশে সেই পাকিস্তান আমল থেকে শিক্ষার যে বাণিজ্যিকীকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে তার পেছনে কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই। স্রেফ শিক্ষাটাকে চাল-ডাল-আটা-পেঁয়াজ-রসুন-জামাকাপড়ের মতো একটি পণ্য হিসেবে গণ্য করে তার ক্রেতার কাছ থেকে মুনাফা লুটে নেওয়া।

আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন করছে সেখানেও মুনাফা লুটে নেওয়ার বিষয়টি রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা শুধু ভ্যাটের বিরোধিতাই করছেন। কারণ এটি তাদের চলমান অতিমূল্যে কিনে নেওয়ার উচ্চশিক্ষার পথে বড় আরেকটি বোঝা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। আন্দোলনের এটি একটি দুর্বল দিক হলেও এই প্রথম আপাত শান্ত-নিরীহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একেকটি ক্যাম্পাস যে ভবিষ্যতের অগ্নিগর্ভ তা গত দুই দিনেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু চলমান ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের সলুক সন্ধান বা আরও গোড়ায় এর উৎস্য সম্পর্কে খোঁজ নিতে পরিস্থিতি বেরিয়ে আসছে তা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। ফলে এই লড়াইয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল সর্বজন বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে নামতে হবে তীব্র আন্দোলনে, সেটা আজ বা আগামীকাল অথবা নিকট আগামীর অন্য যে কোনোদিনে।

বাংলাদেশের গোটা উচ্চশিক্ষা খাতকে একটি উচ্চ মুনাফা তৈরির বাজার হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এ জন্য এ খাতের উদারিকরণের বা বেসরকারিকরণের জন্য বিশ্বব্যাংক উদগ্রীব। যেমনটি বিশ্বব্যাংক ছিল এ দেশের সকল শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণের ব্যাপারে। সব থেকে বড় উদাহরণ আদমজী জুট মিল। এ প্রতিষ্ঠানটিকে লাভে আনার জন্য টেকনোলোজি আপগ্রেডের জন্য যত টাকার প্রয়োজন হোত তার চার ভাগ বেশি টাকা লেগেছে এটিকে বন্ধ করতে। অথচ বিশ্বব্যাংক টেকনোলজি আপগ্রেড করে আদমজীকে বাঁচিয়ে আমাদের শিল্প বিকাশের জন্য ঋণ দেয়নি উল্টো বন্ধ করার জন্য চার গুণ বেশি ঋণ দিয়েছে। তো শিক্ষার আন্দোলন যারা করছেন তাদের আদমজীতে গিয়ে শ্রমিকের সাথে বা কোনো শ্রমিক অঞ্চলে গিয়ে আন্দোলনের নসিহত দেওয়া হচ্ছে না— এসবের মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে, সম্পর্ক আছে সেটাই কেবল স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্র

বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ক্রমান্বয়ে কিভাবে বেসরকারিকরণ হবে তার একটি কৌশলপত্র দিয়েছে। এটি একটি নয়া উদার পুঁজি ভাষা (নিউ লিবারেল ক্যাপিটাল ল্যাঙ্গুয়েজ)। কিন্তু এটি আমাদের দেশের মানুষের কাছে বলতে পারেন নীলনকশা। যেমনটি ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলাকে হারানোর জন্য মীরজাফরের নেতৃত্বে করা হয়েছিল। যড়যন্ত্রকে আমরা নীলনকশা বলি।

২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্রে চার পর্বভিত্তিক মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কৌশলপত্রে চার পর্বে উচ্চশিক্ষায় এ সংস্কার বাস্তবায়নের বাধা হিসেবে বলা হয়েছে ছাত্র আন্দোলনকে। কৌশলপত্রের নির্মাতারা একটি তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখোমুখি হতে পারেন—এই ভেবে একসঙ্গে সব ভর্তুকি উঠিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে কৌশলপত্রে মন্তব্য করেছেন। একইসঙ্গে কৌশলপত্র বাস্তবায়ন হলে তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়ার ভয় থেকে ধাপে ধাপে বেসরকারিকরণের পথ বেছে নিয়েছে ইউনিভাসির্টি মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) ও বিশ্বব্যাংক।
চার পর্বের প্রথম ধাপগুলো হল— প্রাথমিক পর্ব ২০০৬-২০০৭, স্বল্পমেয়াদী ২০০৮-২০১৩, মধ্যমেয়াদী ২০১৪-২০১৯ এবং দীর্ঘমেয়াদী ২০২০-২০২৬। কৌশলপত্রের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার পুরোটাই অধিক দামে ক্রয় করতে হবে। উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে নিম্নবিত্ত, দরিদ্র ঘরের লাখ লাখ শিক্ষার্থী।

এখন আমরা আছি এটির তৃতীয় পর্বে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বজন বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নীরবে শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে। মূল বেতন হয়তো সেই ২০ টাকা। কিন্তু প্রতি সেমিস্টারে এখন খরচ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নীরবে সামান্য সামান্য করে বেড়েছে, কৌশলে বাড়ার কারণে আন্দোলন হয়নি। তারপরও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন এর গতিপথ বুঝতে আমাদের সহায়তা করবে যে ভেতর ভেতর শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। যে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন হয়নি সেখানেও হিসাব করলে দেখা যাবে গত ৭ বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংকের নীলনকশার বেসরকারিকরণের গতি ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে।

পাবলিকবিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তুকি থাকবে না

মঞ্জুরী কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ব্যয়ের ৫০ শতাংশ অর্থ আসতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ খাত থেকে। তবে এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ খাতে আয় বাড়ানোর দিকটা জোর দিতে হবে।

বাজারনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর, উপেক্ষিত বিজ্ঞান ও মৌলিক শিক্ষা

কৌশলপত্রের সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষার পুরোটাই হবে বাজারনির্ভর একটি লাভজনক বাণিজ্যিক বিষয়। মৌলিক জ্ঞান আহরণ কিংবা বিজ্ঞান শিক্ষার পুরোটাই থাকবে উপেক্ষিত। কোন কোন বিষয়ে গবেষণা হবে তা নির্ধারণ করে দেবে বিশ্বব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংকসহ অর্থায়নকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। মৌলিক বিজ্ঞানের পাশাপাশি সাহিত্য, দর্শন বা ইতিহাসের মতো মৌলিক জ্ঞানচর্চার বিষয়গুলো ক্রমশ বন্ধ করে দেওয়া হবে। মানবিক ও বিজ্ঞান বিভাগ সম্পর্কে কৌশলপত্রের ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানবিক ও বিজ্ঞান শাখা থেকে বের হওয়া স্নাতকের বর্তমান চাকরির বাজারে ও বাস্তব জীবনে তেমন কোনো মূল্য নেই।’ এসব বিষয় থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিতদের যেহেতু চাকরি নেই, তাই উক্ত বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করেন কৌশলপত্র নির্মাতারা। বিজ্ঞান ও মানবিক শিক্ষার কোনো বাজারমূল্য নেই। তাই বাজারমুখী উচ্চশিক্ষার বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে কৌশলপত্রে। কৌশলপত্রের সুপারিশকৃত বিষয় সম্পর্কে ১৩ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘তথ্য ও প্রযুক্তি বিদ্যা, ব্যবসা ও শিল্প বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দ্বার খুলে গেছে। কিন্তু এই নতুন শিক্ষা খাতের তুলনায় মানবিক শাখার কোনো ভবিষ্যৎই নেই।’ মানবিক ও বিজ্ঞান শিক্ষার ভবিষ্যৎ না থাকায় কৌশলপত্রের অন্যত্র বলা হয়েছে মৌলিক বিজ্ঞান, সাহিত্য (বাংলা ও ইংরেজি), দর্শন, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ে যাবে।

ছাত্র আন্দোলনকেই যত ভয়,
নির্মাণ করা হবে না আবাসিক হল

আবাসিক হলগুলোকে ছাত্র আন্দোলনের কারণ হিসেবে কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন করে আবাসিক হল নির্মাণ না করার সুপারিশ করা হয়েছে এ কৌশলপত্রে। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, ‘অধিকসংখ্যক আবাসিক হল সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করে।’
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি হলে মাত্র ৪৩ দশমিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পায়। এর বাইরে সব শিক্ষার্থীকে শহরে উচ্চমূল্যে বাড়িভাড়া অথবা পরিবারের সঙ্গে থাকতে হয়। ফলে একাডেমিক সময়ের বাইরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়।

ছাত্র নিয়ন্ত্রণে থাকবে ক্যাম্পাস পুলিশ

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যাম্পাস পুলিশ রাখার বিধান করার সুপারিশ করা হয়েছে। কৌশলপত্রের সুপারিশ মতে, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করা উচিত। ক্যাম্পাস পুলিশ প্রক্টর অফিসের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে। এই ক্যাম্পাস পুলিশের নেতৃত্বে থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর।

বিনিয়োগকারীর নাম যখন বিশ্বব্যাংক

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে সব ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়ে থাকে। মঞ্জুরী কমিশনের কৌশলপত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের এতদিনের লক্ষ্য পূরণ হতে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, মঞ্জুরী কমিশনের কৌশলপত্র বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক গত বছরের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৬৭ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা চুক্তি করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসনের বিলুপ্তি ঘটবে

মঞ্জুরী কমিশনের কৌশলপত্র প্রণয়ন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি খর্ব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ভিসি নিয়োগ করবে সার্চর্ কমিটি। সাবেক ভিসি, শিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক নিয়ে তৈরি হবে সার্চ কমিটি। কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে সার্চর্ কমিটির মাধ্যমে ভিসি নিয়োগ হলে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা যাবে।

মঞ্জুরী কমিশনের সুপারিশ মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম, রিসার্চের বিষয় ঠিক করে দেবে ব্যবসায়ী, আমলা, এনজিওবিদরা। শিক্ষাবিদদের অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি চলে যাবে আমলা, ব্যবসায়ী, এনজিওবিদদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বলে আর কিছু থাকবে না। শিক্ষার্থী তৈরি হবে এনজিওবিদ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে।

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সুপারিশ

মঞ্জুরী কমিশনের কৌশলপত্রে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে। মঞ্জুরী কমিশনের রিপোর্ট মতে, ‘ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক থাকায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নষ্ট করে।’ তবে মঞ্জুরী কমিশনের ছাত্ররাজনীতি বন্ধের আসল কারণ জানা গেছে কৌশলপত্রের অন্য একটি বক্তব্যের মাধ্যমে। ওই বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও রাজনৈতিক দলের ছাত্র নেতৃবৃন্দের জোরালো প্রতিবাদের কারণে বেতন-ফি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ছাত্ররাজনীতি থাকলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনোভাবেই বেতন-ফি বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।

কৌশলপত্রের নির্মাতারা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির

দেশের উচ্চশিক্ষা কৌশলপত্র প্রণেতাদের অধিকাংশ এনজিওকর্মী, সাবেক আমলা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম শমসের আলী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের চেয়ারম্যান এম সবুর খান ও ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দারের মতো ব্যক্তিরা। যারা অধিকাংশই ব্যবসায়ী। তার চেয়ে অবাক হওয়ার মতো বিষয় হল দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ওই বিশ্ববিদ্যায়গুলোর অনুমোদন বাতিল করতে সুপারিশ করেছে দুদক। শুধু দুদকই নয়, মঞ্জুরী কমিশনও সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষকের অভাব, লাইব্রেরি, গবেষণা, নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ অন্যান্য অবকাঠামোর অভাবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। তবে উচ্চ আদালতের সাময়িক আদেশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে চালাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। এমনকি কৌশলপত্র প্রণয়নে এমন কয়েকজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে রাখা হয়েছে, যাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ইউজিসি সম্প্রতি কালো তালিকাভুক্ত করেছে এবং সেখানে উচ্চ শিক্ষাদানের কোনো পরিবেশ নেই বলে মন্তব্য করেছেন।

এবার ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনকারীরা মনোযোগ দিন

দেশের সংবিধান শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে গণ্য করেনি, এটা অধিকার হিসেবে বলা হয়েছে। ভ্যাট নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটা ক্রেতার বাইরে নেবার সুযোগ নেই। ফলে যে নামেই তা আসুক অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কেও যদি এটি দিতে বলা হয় তবে দিনশেষের এটি আসলে শিক্ষার্থীদের পকেট থেকে যাবে। কিন্তু যে দামে আপনি উচ্চশিক্ষা কিনছেন সেই দামটি উচ্চমূল্যের অর্থাৎ আপনাকে বেশি দামে বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা উচ্চশিক্ষা নিতে বাধ্য করছে। ভ্যাটের পাশাপাশি এ বিষয়টির ওপর শিক্ষার্থীদের নজর দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হলে কোনো লাভ করা যাবে না। যারা বলছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চ্যারিটি করতে আসেনি তারা হয় গণ্ডমূর্খ না হয় তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকপক্ষের মুখপাত্র। কারণ এটি যে আইনে পরিচালিত হয় সেই আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে কোনো মুনাফা বা লাভ করা যাবে না। কিন্তু ইউজিসির সর্বশেষ মূল্যায়ন প্রতিবেদন যেটি এ বছর বের হয়েছে তাতে দেখা গেছে, নর্থসাউথ, ইস্টওয়েস্ট, ব্র্যাক, স্টামফোর্ড, এআইইউবি থেকে শুরু করে ৯০ ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় লাভে রয়েছে। আর এসব মুনাফার অর্থে তারা দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছেন আরও অনেক কিছু। এত এত মুনাফা করার পরও তারা প্রতি বছর সেমিস্টার ফি বাড়াচ্ছে। কিন্তু এর কোনো প্রতিবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা করছে না। এই দিকটা তাদের নজরে রাখতে হবে।

আর এই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা সরকারের কাছ থেকে অনুদান পায় সেই অনুদানের টাকা কোথায় যায় সেটা জানার অধিকার আপনাদের আছে।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে ২০০৮ সালের অক্টোবরে একনেকের এক বৈঠকে হায়ার এডুকেশন কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এইচইকিউইপি) নামের একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ৬৮১ কোটি টাকার বিশাল প্রকল্পের অর্থ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক মান উন্নয়নের জন্যও ব্যয় করা হবে। বিশ্বব্যাংক প্রকল্পটির ৮৮ শতাংশ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই প্রকল্প অনুযায়ী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বাণিজ্যিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশ্বব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে আনা অর্থ ভর্তুকি পাবে। ইতোমধ্যে বড় অংকের অনুদান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পেয়েও গেছে।

অর্থাৎ মালিকরা মুনাফা লুটেই যাবে আর আপনার সব ক্রেতা হিসেবে বাড়তি দাম দিয়ে যাবেন— এবার একটু হাত গুটানোর পালা। ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন করে আপনারা ঐতিহাসিক একটি শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছেন। এখন সময় বাকি হিসাবগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলা।

ভ্যাট নেওয়াটা কি খুব জরুরী?

অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ভ্যাট দিতে হবে। অর্থমন্ত্রীর দরকার টাকা। তিনি টাকা ছাড়া কিছুই চেনেন না। কিন্তু তিনি দেশের ৩০ হাজার কোটি টাকা গত ৬ বছরে লোপাট হতে দিয়েছেন। তাতে তার মনে হয়নি দেশের ক্ষতি হচ্ছে। তো এত টাকা যদি সরকারি দলের লোকেরা লোপাট করে তাহলে শিক্ষার্থীদের ওপর তো কিছুটা চাপ যাবেই!

আসুন হিসাবটা একটু মিলিয়ে নেই। দেশে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার ৬৫৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অথচ ২০০৯ সালে যখন যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলো তখন এর পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি ৪১ লাখ টাকা। মাত্র ছয় বছরে খেলাপি ঋণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ জুন ২০১৫)
এর সোজা অর্থ হল স্বাধীনতার ৪৪ বছরে যত লুটপাট হয়েছে গত ছয় বছরেই তার তুলনায় বেশি লুটপাট হয়েছে দেশের টাকা।

আর কে না জানে, সরকারি রাজনীতির প্রভাব না থাকলে ব্যাংক থেকে কোটি টাকা ঋণ নেওয়া সম্ভব নয়। এসব অর্থ ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিয়েছে দেশের সরকারি দলের লোক ও সরকার-সমর্থিত ব্যবসায়ীরা। হলমার্ক বা বিসমিল্লাহ গ্রুপ তার অন্যতম উদাহরণ।
মোট ঋণের ১০ দশমিক ৪৭ শতাংশ খেলাপি। মানে ১০০ টাকা যদি ঋণ থাকে ব্যাংকের তাহলে সেখান থেকে ১০ টাকা আর কখনও তুলতে পারবে না ব্যাংক। খেলাপি ঋণের বেশিরভাগ হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এর দায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এড়াতে পারেন না।

এর বাইরে আরেকটা গোপন হিসাব আছে। এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো নিজেদের হিসাবের খাতা পরিষ্কার রাখতে ৩৬ হাজার ৯৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা রাইট-অফ বা অবলোপন করেছে। অর্থাৎ এই পরিমাণ অর্থ আর খেলাপি ঋণ হিসাবে দেখানো হচ্ছে না। এর মধ্যে কেবল ২০১১ সাল পর্যন্ত অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ৮৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সুতরাং এই অর্থ যোগ করলে খেলাপি ঋণ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। আর চারটি সেলফোন কোম্পানির ৪ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট না দেওয়ার বিষয়টি না হয় এ যাত্রায় আলাপই করলাম না। সে তুলনায় সামান্য অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অন্যায্য ভ্যাটের নামে আদায় করার কোনো নৈতিকতা নেই, যুক্তিও নেই।

স্লোগান ঠিক করে দেবার তোমরা কে হে?

‘মন পাবি, দেহ পাবি, ভ্যাট পাবি না’ কিংবা ‘জয়বাংলা ভ্যাট সামলা’ এ রকম স্লোগান ও ছবি দিয়ে ফেসবুকের ফিড ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কারা দিচ্ছে? এরা সরকারের প্রেমে দেওয়ানা মাস্তান। যতই সরকার ভুল করুক, অন্যায় করুক তবু নিজ দলের স্বার্থে তারা চুপ থাকবে। এরাই এ রকম প্লাকার্ডওয়ালা ছবি ও কুৎসিত মন্তব্য দিয়ে আন্দোলনবিরোধী পাল্টা প্রতিরোধের ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

গত মাসে ঢাকা থেকে ইউরোপে আসার আগে এক রিকশাওয়ালা বলেছিল, ‘জয়বাংলা ক্যাথা কাপুড় সামলা’ প্রচলিত এই স্লোগানের একটা গূঢ় অর্থ আছে। প্রত্যেকটা স্লোগানের আসলে তাৎপর্য রয়েছে। কেউ ‘আল্লাহ আকবর’ স্লোগানে দিয়ে মানুষ খুন করে বলছে কাফের-নাস্তিক মেরে ঠিক করেছি। আবার কেউ জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর ও ঢাকার ধানমণ্ডির ভ্যাটবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। বর্তমান সরকারের কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। সরকার-সমর্থক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী কোনো কিছু বিবেচনা না করেই বলতে শুরু করে এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীদের কাজ। এটা আসলে ফ্যাসিবাদ।

ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই সরকারের সময় যত অন্যায়কে আড়াল করা হয়েছে তার বড় একটি হল যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের চেষ্টা করা হচ্ছে। অথবা ইহা শিবিরের আন্দোলন। অর্থাৎ বর্তমান সরকার একটি চেতনাবাদ সামগ্রিকভাবে সবার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। আর তার কর্মের, তার দুর্নীতির সমালোচনা করা হলে আপনাকে সে জামায়াত-শিবির, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের লোক এবং স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এটাই হল ফ্যাসিবাদ।

ফ্যাসিবাদ আসে অন্ধ দেশপ্রেম কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদের স্লোগান নিয়ে। যেমনটি জার্মানিতে এসেছিলো। জরুরি প্রশ্ন হল- সরকার যখন জয়বাংলা বলে সব অপকর্ম করবে, ছাত্রলীগ জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে মাস্তানি করবে- তখন কি ‘জয়বাংলা’ স্লোগান ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের তাৎপর্য আর বহন করতে পারে।

আর কোন আন্দোলনে কোন স্লোগান দেওয়া হবে তা আন্দোলনের বাস্তবতায় বেরিয়ে আসে। এটা ঘরে বসে ফেসবুকে বখোয়াজি করার কোনো বিষয় নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে গোটা একটি পরিবার এ আন্দোলন না হলে এর আগে এমন গভীরভাবে তা বোঝা যেতো না। এখানকার শিক্ষার্থীরা এ রকম আন্দোলন আগে কখনও করেননি। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কয়েক যুগের অভিজ্ঞতা আছে ছাত্র আন্দোলনের। ফলে দুটির মান ও বাস্তবতা এক করে ফেলাটা হয় নিবুদ্ধিতা অথবা শয়তানি। সবার আগে বোঝা দরকার আন্দোলনের মূল স্পিরিট। আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকা দাবি ও দাবি আদায়েরর পদ্ধতি যদি দেখেন তাহলে দেখবেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম রাজনৈতিক বর্গ হিসেবে হাজির হয়েছে। এই আন্দোলনের উচ্চতা শাসক শ্রেণীর দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়া শুরু করেছে, সম্ভবত সরকার এ কারণেই ভয়ে উল্টা-পাল্টা কথা বলছে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক