প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ও কিছু প্রশ্ন

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৩ ১৮:১১:২৮
ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ও কিছু প্রশ্ন

মনোজ দে

বাংলাদেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় বেনিয়াতন্ত্র সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো ঘাড়ের ওপরে চেপে বসেছে। নয়া উদার পুঁজিবাদের এই যুগে শিক্ষা একটি অতি মুনাফা উৎপাদনকারী পণ্য। আমাদের দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রতিটা স্তরে শিক্ষাব্যবসা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। এর ফলে শিক্ষার ব্যয়ভার এতটাই বেড়েছে যে, একমাত্র একাডেমিক শিক্ষায় নিশ্চিত ভবিষ্যতের সুরক্ষা দেখতে পাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সন্তানের শিক্ষা এখন বেদনার্ত দীর্ঘশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর কৃষক, শ্রমিকের পরিবারগুলোর সন্তানেরা সিঁকি পথে, আধা পথে ঝরে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে মালয়েশিয়াগামী নৌকায় চেপে বসে থাইল্যান্ডের গণকবরে লাশ হওয়ার নিয়তি বরণ করছে।

শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে দেখছে রাষ্ট্রও

মানুষের কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হচ্ছে শিক্ষা, জ্ঞান। পূর্ব প্রজন্মের মানুষ তার পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে যায় তার প্রজন্মের অর্জিত জ্ঞান ও শিক্ষা। এভাবেই মানুষের সভ্যতা এগিয়েছে। এটাই মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব। স্বাভাবিক সমাজে, স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যবস্থায় মানুষ কখনও তার জ্ঞান, শিক্ষাকে বিক্রিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখে না। সবকিছুকেই বাজারে বিক্রিযোগ্য পণ্য হিসেবে দেখার দৃষ্টি একটা অস্বাভাবিক-বেসামাল-ক্ষ্যাপা সমাজে (sane society) সম্ভব। আমাদের সামাজিক মানুষের মনস্তত্ত্বে শিক্ষা একটি স্বীকৃত অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রাচীন গুরু-শিষ্যের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা বৌদ্ধদের মঠনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা- সবক্ষেত্রেই শিক্ষাকে দেখা হয়েছে মানুষের অধিকার হিসেবে। শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬২ ও ১৯৮২ সালে দুটি বড় ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। এই দুই ছাত্র আন্দোলনে আইয়ুব খান ও এরশাদের সামরিক সরকারের পতনের সূত্রপাত হয়েছিল।

শিক্ষা মানুষের অধিকার। তাই সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক। সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য। এ ধারণাতে সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র তার সংবিধানে ও জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসেবে সরকার শিক্ষাকে গণমুখী, সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাহলে জরুরি প্রশ্নটা সামনে এসে যায় উচ্চশিক্ষা কেনার প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়, সান্ধ্য কোর্স, কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম, বেসরকারি কলেজ, কোচিং, টিউশন, নোটবই- শিক্ষা নিয়ে ব্যবসার এত আয়োজন কেন? সংবিধানে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের রাষ্ট্র আসলে শিক্ষাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে? উচ্চশিক্ষার শিক্ষার্থীদের ওপর সাম্প্রতিক ভ্যাট আরোপ খোলা ডাস্টবিনের মতো এই প্রশ্নের মীমাংসা খোলাসা করে দিয়েছে। রাষ্ট্র শিক্ষাকে পণ্য হিসেবেই দেখছে।

আজকের শিক্ষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন

শিক্ষার্থীদের চলমান ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ‘শিক্ষা পণ্য না অধিকার’ এ প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে নিয়ে আসছে। নিচু স্বরে হলেও গত দুই দশকে শিক্ষা আন্দোলনের একটা বড় প্রশ্ন ছিল শিক্ষার পণ্যকরণের বিপরীতে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এ সব আন্দোলন বিগত ও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার পুলিশ ও তাদের ছাত্র সংগঠন দিয়ে পিটিয়ে দমন করেছে। পারিপার্শ্বিক বাস্তবতায় শিক্ষা পণ্য না অধিকার এই প্রশ্নটি আজ শিক্ষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। এর মর্ম অনুসন্ধান ও মীমাংসার উপরে নির্ভর করছে আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের ভবিষ্যৎ।

বাংলাদেশের শিক্ষায় পণ্যায়নের যাত্রা

নব্বইয়ের দশকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পণ্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত হলেও এগুলো বাণিজ্যিক উচ্চশিক্ষা বিক্রির প্রতিষ্ঠান। হেলা-ফেলা ব্যাপার নয় ৯০টার মতো এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে চার লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে, উচ্চশিক্ষা কিনতে বাধ্য করানো হচ্ছে। শতকরা হিসেবে উচ্চশিক্ষা নেওয়া ৬৫ ভাগ শিক্ষার্থী এ সব প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। দেশে টাকা দিয়ে উচ্চশিক্ষা কেনার এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিসংখ্যান অনেক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে বসেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দুটি প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে। প্রথমত, এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যখন পাস করে বেরুবে তখন তাদের চাকরি হবে কি? দেশে ইতোমধ্যেই ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ ও এনজিওতে চাকরি সংকুচিত হয়ে আসছে। বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এ সুযোগে বেসরকারি খাতে চালু থাকছে সস্তা শ্রমের চাকরি। আলাদীনের চেরাগের মতো কর্মসংস্থানের জন্য যদি কোনো নতুন ক্ষেত্র তৈরি না হয় তবে আগামী দিনগুলোতে এ পরিস্থিতি ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে বাধ্য। দ্বিতীয়ত, সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী যখন টাকা দিয়ে উচ্চশিক্ষা কিনছে তখন সংখ্যালঘিষ্ঠরা কেন বাদ যাবে? এক দেশের নাগরিকরা কেন দুই নীতিতে চলবে? যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রণীত কৌশলপত্রে ২০২৬ সালের মধ্যে সকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক করার প্রকল্প রয়েছে। এ প্রকল্প অর্জনের সময় রয়েছে আর ১১ বছর।

বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ে জনকল্যাণের গল্প

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষায় বিনিয়োগ অতি মুনাফাপ্রবণ হওয়ায় এবং পুনঃবিনিয়োগের অর্থ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আসায় বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সুরক্ষিত ও লোভনীয় ব্যবসা ক্ষেত্র। অতিমুনাফার এই ধরনের কারণে আগের জোট ও বর্তমানের মহাজোট সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, তাদের মনোনীত ও দলীয় অবসরপ্রাপ্ত আমলা, উপাচার্য, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী নেতারা হাত ধরাধরি করে এ ব্যবসায় এসেছে। এখনও আসার প্রতিযোগিতাতেও আছেন অনেকে। ঠিক এ কারণেই আওয়ামী লীগ নেতা হাছান মাহমুদ ও বিএনপির বুদ্ধিজীবী নেতা এমাজউদ্দীন আহমেদের কণ্ঠে ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন নিয়ে একই সুর শোনা যায়। যদিও বলা হচ্ছে অলাভজনক, অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে। এখানে মুনাফা করার কোনো সুযোগ নেই। ছাত্রদের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হচ্ছে সেটা তাদের ক্লাস, ল্যাব, পরীক্ষাসহ অন্যান্য শিক্ষা সংক্রান্ত কাজে ব্যয় হচ্ছে। বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে আইনে চলছে সেখানে নির্ভেজাল জনকল্যাণ একমাত্র উদ্দেশ্য। আর এর কর্তাব্যক্তিরা একেকজন ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল, না হয় মাদার তেরেসা। অভাগা শিক্ষাহীন এ দেশের জনগণকে একটু আলোক তারা বিতরণ করছে। প্রশ্নটা তাই জাগতে বাধ্য দেশে এমন শত শত মানবদরদী থাকতে কেন ঢাকা শহরের ফুটপাথে কয়েক লাখ মানুষ কুকুরের পাশাপশি শুয়ে রাত কাটায়?

বুনিয়াদি শিক্ষায় ব্যবসা ও ঝরে পড়া নিচের তলার মানুষ

বিগত দুই দশকে দেশে প্রাক প্রাইমারি থেকে শুরু করে বুনিয়াদি ও উচ্চশিক্ষার সকল স্তরে বাণিজ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। প্রাইভেট টিউশন, কোচিং বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। একজন শ্রমিক কিংবা দিনমজুর কৃষাণকেও তার সন্তানকে স্কুলে পড়াতে হলে প্রাইভেট ও কোচিংয়ে দিতে হয়। মাস শেষে পকেট থেকে ২০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করা যে কতটা কঠিন আর দীর্ঘশ্বাসময় সে বেদনা শুধু তারাই উপলব্ধি করতে পারে। শিক্ষার ব্যয়ভার কুলোতে না পেরে মাঝপথেই ঝরে পড়ে তাদের সন্তানেরা। মেয়ে হলে পোশাক কারখানায় আর ছেলে হলে ভিটেমাটি কিছু থাকলে তা বিক্রি করে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে উঠে বসা। সমাজের নিচেরতলার এইসব হতভাগা মানুষের শ্রমশক্তিতে অর্জিত রেমিটেন্স আর রফতানি আয়ে সচল থাকছে আমাদের দেশের অর্থনীতির চাকা। নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হওয়ায় ডুগডুগি বাজাচ্ছি আমরা। অর্থনীতির নড়বড়ে ভিতকে শক্ত কাঁধের উপর ধরে রাখা এ সব মানুষের ক্ষোভ, যন্ত্রণা, জীবন আমাদেরকে স্পর্শই করে না। আমরা এক দূরারোগ্য শ্রেণীঘৃণা, অস্পৃশ্যতা দেখিয়ে যায় তাদের জন্য। অথচ এ ভূখণ্ডের কোনো পরিবর্তন, অর্জন সম্ভব হয়নি তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া।

ঘটি-বাটি-সম্বল বিক্রি করে মধ্যবিত্তের সন্তানের শিক্ষা

নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এমনও দেখা যায় তাদের সন্তানদের শিক্ষার পেছনে অধিকাংশ আয় ব্যয় করতে হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় একটি কলেজে পড়াতে গিয়ে দেখেছি কোচিংয়ের নামে সেখানে ব্যবসাটা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। কলেজে ভর্তির দুই মাসের মাথায় একাদশ শ্রেণীতে একটা টেস্ট পরীক্ষা নেওয়া হল। সে সময় শিক্ষকদের বলা হল প্রশ্ন কঠিন করতে ও খাতা কঠিন করে দেখতে। ফলে ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করল না। এরপর তাদের অভিভাবকদের ডেকে বলা হল তোমাদের সন্তানেরা এ সব বিষয়ে দুর্বল ওদের কোচিং করাও। শুরু হল কোচিং। আমি চারটি শাখায় পড়াতাম। চার শাখার প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী আমার হাতে লিস্ট দিল তারা কোচিং করবে। আমি দেখলাম কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট ভাগ দেওয়ার পরও কোচিং করিয়ে আমার যে আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তা বেতনের চারগুণ। আর শিক্ষার্থীকে প্রতি বিষয়ে কোচিংয়ের জন্য গুণতে হবে ৫০০টাকা। এ খরচ তার বেতন, পরীক্ষা ফির বাইরের ব্যয়। এ ছাড়া এমন সিস্টেমও ছিল যেখানে একজন শিক্ষার্থী কলেজে একদিন উপস্থিত না হলে ১০ টাকা জরিমানা তে হত। এখন সেই কলেজটি একটা বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনুমতি পেয়েছে। কলেজটি চলত ট্রাস্টের নামে। অর্থাৎ সেটি জনকল্যাণমুখী, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান।

উচ্চ মাধ্যমিকের এ ধাপ পেরিয়ে আমাদের এখানে শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধ। পাবলিক বা জন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চান্স পাওয়াটা ভাগ্যই বলা যায়। নাহলে উপায় বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে ধনিক শ্রেণীর সন্তানেরা এ সব প্রতিষ্ঠানে পড়লেও এখন সেখানে গ্রামের কৃষক, মফঃস্বলের শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবীর সন্তানেরা পড়ছে। অনেক পরিবারই এনজিওগুলোর কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা বছর বছর জমি বিক্রি করে সন্তানের টিউশন ফির খরচ যোগাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য বাড়া, বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ, ট্যাক্স-ভ্যাট, ডায়াবেটিকস-প্রেসারের ওষুধের সঙ্গে তাল মেলাতে নাভিশ্বাস ওঠা বাবা-মা হয়তো অবসরের পর পেনসন সমর্পণ করেই তার সন্তানদের এ সব বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে পাঠাচ্ছে। লেখাপড়া করলেই উন্নতি কিংবা স্বস্তিদায়ক একটা চাকরি এ রকম ধারণা আমাদের উপনিবেশিত মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বে থাকায় অভিভাবকেরা সন্তানের জন্য এ টাকা ব্যয় করছেন। এর পূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

মুনাফার লাগাম কার হাতে?

বাজারি চাহিদা-যোগানের সংকটকে কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বছর বছর বাড়িয়ে চলেছে টিউশন ফি। ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি প্রতি বছরই এ টিউশন ফি বাড়ানো হচ্ছে। প্রতিবছর ভর্তি হওয়া নতুন শিক্ষার্থীদের কাছে এটা বাড়ানো হয়। তবে পুরনো শিক্ষার্থীরা তাদের ভর্তির শুরুর ফি দিয়েই পড়তে পারে। এ জন্য কোনো অসন্তোষ দেখা যায় না। মধ্যম সারির একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর আগে ১১৭ ক্রেডিটের আইন বিষয়ে পড়তে খরচ ছিল ২ লাখ ২১ হাজার টাকা। সেখানে চার বছর পর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ভ্যাটসহ চার লাখ ৯৫ হাজার টাকা। আবার টিউশন ফি নির্ধারণের মাপকাঠি যে কি সে ব্যাপারে সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কোনো মাথাব্যথা নেই। ফলে একেক বিশ্ববিদ্যালয় একেক নিয়মে চলছে। তাদের খেয়ালখুশি, ইচ্ছামাফিক। তারা একদিকে বলছে ট্রাস্ট বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আর অন্যদিকে কোন যুক্তিতে বছর বছর টিউশন ফি বাড়িয়ে চলেছে তার কোনো সদুত্তর কারো কাছে নেই। এখানে সরকারও নিশ্চুপ এবং খোলাবাজার অর্থনীতি নীতির সমর্থক। তাদের যুক্তি হচ্ছে আমরা বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারি না, শুধু প্রভাবিত করতে পারি। কলের গানের এ ভাঙা রেকর্ড আমাদের অর্থমন্ত্রী বার বার করে বলে থাকেন। যদিও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কয়েক গুণ কমে গেলে যে খোলা বাজার অর্থনীতির সূত্রে দেশের বাজারে তেল-বিদ্যুতের দাম কমবে না কেন প্রশ্ন করলে আবার চরম নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক তত্ত্বের সবক শোনা যাবে মন্ত্রী, উপদেষ্টাদের কাছে। জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এ হস্তক্ষেপের গল্পও শোনা যাবে তাদের কাছে। এই দ্বিচারিতা আমাদের অর্থণীতির নীতি। কখনও প্রয়োজনে খোলাবাজার আবার কখনও প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনীতি। সরকারের নিয়ন্ত্রক যেন অদৃশ্য কেউ।

শিক্ষা শতভাগ বাণিজ্যিক করতে বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন

বাণিজ্য প্রধান শিক্ষানীতি থেকে জনবিশ্ববিদ্যালয়ও বিচ্ছিন্ন নয়। ফি বছর সরকারের বাজেট থেকে বরাদ্দ কমানো আর নিজস্ব আয় বাড়ানো বিশ্বব্যাংকের এমন প্রেসক্রিপশনে জনবিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষার জন্য যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে সেখানে উচ্চশিক্ষাকে পুরোপুরি বাণিজ্যিক উচ্চশিক্ষা করবার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এ কৌশলপত্র ২০ বছর মেয়াদী। অর্থাৎ ২০০৬ থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে ২০২৬ সাল পর্যন্ত উচ্চশিক্ষার সর্বস্তরে পুরোপুরি বাণিজ্যিকিকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জনবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সান্ধ্য কোর্স চালু, ভর্তি-সেশন চার্জসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানো, খাবারে ভতুর্কি প্রত্যাহার ও হল ডাইনিং বন্ধ, জগন্নাথ কিংবা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় মডেলের মধ্যম ব্যয়ের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এ সব কিছুই ইউজিসির কৌশলপত্র বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অংশ। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব ব্যয়ে চলার বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন গ্রহণ করা হয়েছে। জোট সরকারের আমলে গ্রহণ করা হলেও এক্ষেত্রে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা মহাজোটের সরকার এ নীতিতেই চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যম নিজের ব্যয়ে দাঁড়ানো মানে বুঝতেই পারছেন উচ্চ টিউশন ফি দিয়েই উচ্চশিক্ষা কিনতে হবে জনগণকে। এক্ষেত্রে শিক্ষাকে বর্তমানের আধা পণ্য, আধা সেবা ও আধা অধিকার হিসেবে দেখার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। কৌশলপত্র বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উচ্চশিক্ষাকে পুরোপুরি পণ্য (কমোডিটি) হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে। আর এর মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন ধারণা পুরোপুরি লোপ পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যু হবে

ইউরোপে আলোকায়নের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা ও জ্ঞানের সর্বজনীনতা ও বিশ্বময়তা ওতপ্রোতভাবে যেমন সম্পৃক্ত, একইভাবে সার্বভৌমত্ব বা স্বশাসনের ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয় এর সার্বভৌম এলাকায় জ্ঞানচর্চার জন্য দায়বদ্ধ একমাত্র সামাজিক মানুষের কাছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার ফলাফল শুধু নগদ নয়, আগামী পৃথিবীর সমাজ ও মানুষের। ইউরোপে আলোকায়নের মধ্য দিয়ে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বর্তমান ধারার যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রাষ্ট্রের অধিভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও স্বশাসনের এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র ও সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের দেখভাল করলেও এর উপর হস্তক্ষেপ করার অধিকার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় তাই কোনোভাবেই সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এটা জন প্রতিষ্ঠান। জন ধারণা লোপ পেলে আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ই লোপ পাবে। মৃত্যু হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের।

তাই জনবিশ্ববিদ্যালয় বা বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয় নয় বিশ্ববিদ্যালয় বাঁচাতে সমাজের সকল স্তরের মানুষের এগিয়ে আসা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয় না বাঁচলে বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র বাঁচবে না।

শিক্ষা পণ্য নয় অধিকার

পণ্য নির্ভর উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে প্রতিনিয়ত থাকতে থাকতে মানুষ একসময় মানব চৈতন্য হারিয়ে পুরোপুরি পণ্য-মানুষে পরিণত হয়। তার কাছে তখন সবকিছুই মুনাফা করার বিষয় বলে মনে হয়। প্রেম-যৌনতা থেকে শুরু করে বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তান কিংবা অন্য কেউ আর রক্ত-মাংস-মনন-আবেগের মানবীয় সত্তা বলে মনে হয় না। ব্যবস্থার কাছে মানব চৈতন্য হারানো এ সব মানুষের কাছেই সভ্যতার নিয়ামক শক্তি শিক্ষা, জ্ঞান পণ্য বলে মনে হতে পারে। শিক্ষাকে মনে হতে পারে আলু, পটল,বার্গার, ফ্রাইড রাইচের মতো। তাই এর সাথে তারা যুক্ত করতে পারেন বাণিজ্য ও ভ্যাট।

শিক্ষা অধিকার। মানুষের কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার প্রাণশক্তি শিক্ষা রাষ্ট্র ও সংবিধানগত অধিকার। এ অধিকারকে পণ্য বানানোর কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হয়নি। শিক্ষার অধিকারকে অবশ্যই আজ ও আগামী প্রজন্মের স্বার্থে বাঁচাতে হবে। ভ্যাটবিরোধী লড়াই চূড়ান্তভাবে মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার লড়াই।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক এ্যাক্টিভিস্ট