প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস

স্বস্তি মিলছে কি গণতন্ত্রে

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৪ ২২:০৪:০৮
স্বস্তি মিলছে কি গণতন্ত্রে

শাহনেওয়াজ খান, দ্য রিপোর্ট : সমাজ বিকাশের নানা ধাপ পেরিয়ে বিশ্ববাসী আজ গণতন্ত্রের যুগে বাস করছে। গোত্রতন্ত্র, রাজতন্ত্র, ধর্মীয় শাসন, উপনিবেশিক শাসন ও সমাজতান্ত্রিক উন্মেষ পেরিয়ে গণতন্ত্র অবশ্য এখনো পূর্ণরূপ বা একক আধিপত্য লাভ করতে পারেনি। এখনো গণতন্ত্রকে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরুতে হচ্ছে।

সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের পূর্ণরূপ কেমন হবে, এটাই কি সামাজিক পরিবর্তনের সর্বশেষ ধাপ বা প্রচলিত গণতন্ত্রেই রয়েছে মানবজাতির মুক্তি— কথাটি বলার সময় এখনো আসেনি। তার পরও অনেক বছর পেরিয়ে যাওয়ায় অবশ্যই গণতন্ত্রকে মূল্যায়নের সম্মুখীন হতে হবে।

ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ ছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তে বিভিন্ন দেশ গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করলেও এর বিপরীত অবস্থাও রয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, জাপান, ভারত প্রভৃতি দেশ গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ সুফলভোগী। পূর্বের অবস্থার তুলনায় দেশগুলো গণতান্ত্রিক যুগে এসে অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় রয়েছে। গণতন্ত্রের চর্চা দেশগুলোক অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে দিয়েছে। সহিংসতা এড়ানো ছাড়াও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি লাভে সক্ষম হয়েছে তারা। তবে সম্প্রতি গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে খ্যাত গ্রিস এ বিশ্বাসে কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে।

গণতন্ত্রের লালন-পালন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রভৃতি দিক থেকে অনেক উন্নতি অর্জন করেছে দেশটি। কিন্তু সম্প্রতি দেশটি ঋণের ফাঁদে পড়ে সরকারি সম্পদকে বেসরকারিকরণ করতে বাধ্য হয়েছে। অর্থাৎ জনগণের সম্পদ চলে গেছে কতিপয় লোকের হাতে। নতুন করে আরও ঋণ নেওয়ার ফলে দেশটির অর্থনীতি বেশি মাত্রায় পরনির্ভর হয়ে পড়েছে। দেশটি এখন অর্থনীতির দুষ্টচক্রে পড়ে গেছে, বিপ্লব ছাড়া সেখান থেকে বেরুনোর স্পষ্ট কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। তবে এ অবস্থার জন্য দেশটির গণতন্ত্রকে অতটা দায়ী করা যায় না, যতটা দায়ী গণতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীরা। এই পুঁজিবাদী সমাজই গণতন্ত্রকে নিজস্ব গতিপথ থেকে প্রতিনিয়ত সরিয়ে দিচ্ছে।

অবশ্য এটা একটি মাত্র রূপ। গণতন্ত্রের সার্বিক পরিস্থিতির জন্য আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হবে। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনার ফলে ধর্ম তার জীবনযাপনের ওপর সবসময়ই প্রভাব ফেলেছে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব থাকবেই। মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ না হওয়ায় তাকে দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে হয়। এ কারণে উদ্ভব হয় সমাজ ও গোত্রের। যা মানুষকে অনুশাসন ও শাসনের জালে আবদ্ধ করে।

সমাজ ও বিশ্বাস একত্রিত হয়ে একসময় সৃষ্টি করে রাজতন্ত্রের। যার ফলে রাজার অধীনে শাসিত হয় রাজ্য। এক্ষেত্রে রাজ্যে শান্তি-অশান্তি রাজার মন-মানসিকতা ও দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। জনগণের এ ব্যাপারে কোনো ভূমিকা নেই। কালক্রমে সামরিক বাহিনী ও ব্যবসায়ীরা এ অবস্থায় পরিবর্তন আনে। বিভিন্ন বিদ্রোহ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ একসময় রাজতন্ত্রের পরিবর্তে উপনিবেশিক শাসন নিয়ে আসে। যা এক পর্যায়ে গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্রের পথকে প্রশস্ত করে।

মূলত পুঁজিবাদের মুখপাত্র হিসেবে সৃষ্টি হওয়া গণতন্ত্র পুঁজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে আসছে। এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য উদ্ভব ঘটে সমাজতন্ত্রের। এখানে গণতন্ত্রের সঙ্গে সমাজতন্ত্রের মূল পার্থক্যটা অর্থনৈতিক।

আমাদের আলোচনার মূল বিষয় যেহেতু গণতন্ত্র তাই বাকি সব বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণের সুযোগ নেই। গণতন্ত্র নিয়েই এ আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। গণতন্ত্রকে মূল্যায়ন বা বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রথমেই বুঝতে হবে গণতন্ত্র আসলে কী। বিশ্বে সম্ভবত এটাই সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ যার সংজ্ঞা ও ব্যবহার একেকজন একেকভাবে করছে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্র বিষয়টি বেশ জটিল হয়ে যায়। তবে শব্দটির ব্যবহার ও উৎপত্তি থেকে এ কথা স্পষ্ট যে গ্রিক শব্দ ‘ডেমোক্রেসিয়া’ (যা ‘ডেমোক’ ও ‘ক্রাটোস’ ভিন্ন দুটি শব্দের সম্মিলিত রূপ) বলতে ‘জনগণের শাসন’ বুঝায়। অর্থাৎ এটি এমন একটি শাসন ব্যবস্থা যাতে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকবে।

আক্ষরিক অর্থে শাসন ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কখনই সম্ভব নয়। কারণ, রাষ্ট্রের সবাই মিলে প্রশাসনিক শাসনকাজ একসঙ্গে করা সম্ভব নয়। তাই জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনে তাদেরই ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়। যারা জনগণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে। যদি ওই জনপ্রতিনিধিরা বেশিরভাগ জনগণের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে কোনো কাজ করে তাহলে তা হবে গণতন্ত্রের লঙ্ঘন। বিশ্বজুড়ে কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিই এখনো এ লঙ্ঘন পূর্ণরূপে এড়াতে পারেনি। জনপ্রতিনিধিদের এই ব্যর্থতাই গণতন্ত্রের বিকাশের পক্ষে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ছাড়া গণতন্ত্রে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী হল জনতার সিদ্ধান্ত। অর্থাৎ আমার সিদ্ধান্ত আমিই নেব। গণতন্ত্রের মূল কিছু বিষয়ের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, ব্যবসায়িক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, জবাবদিহিতা ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হল কোনো দেশের বেশিরভাগ জনগণ যদি চায় তারা বাকস্বাধীনতার বিপক্ষে থাকবে তাহলে গণতান্ত্রিক নীতি অনুযায়ী এটাই বাস্তবায়িত হবে। যা স্বাভাবিকভাবে গণতন্ত্রের লঙ্ঘন বলে মনে হতে পারে, কিন্তু আদতে কি তাই?

গণতন্ত্রে যেহেতু বেশিরভাগ জনগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হয়, তাই সেখানে সবসময় সংখ্যালঘুর স্বার্থ রক্ষা না হওয়াটা স্বাভাবিক। এ ছাড়া জনগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে আইন ও পদ্ধতি বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। তাই স্থানভেদে গণতন্ত্রে পার্থক্য থাকবেই। সম্ভবত এই পার্থক্যটাই পৃথিবীর সর্বশেষ ধাপ হিসেবে গণতন্ত্রকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা।

গণতন্ত্রে জনগণের একচ্ছত্র স্বাধীনতা অন্য যে কোনো পদ্ধতিকে বেছে নেওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। এ পথ দিয়ে যে কোনো সময় যে কোনো পদ্ধতি ঢুকে যেতে পারে। এই পথ দিয়ে ঢুকতে পারে ধর্মীয় শাসন, সমাজতন্ত্র এমনকি স্বৈরতন্ত্রও। বর্তমানে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী পদ্ধতিতে জয়লাভ করে রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কিউবা, ভেনেজুয়েলাসহ বিভিন্ন দেশে ক্ষমতায় রয়েছে সমাজতান্ত্রিক দল। এমনকি গণতন্ত্রের জনক গ্রিসেও সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিল বামপন্থী দল। এ ছাড়া তুরস্ক, সুদান, তিউনিশিয়া, ফিলিস্তিন (আংশিক), ভারত প্রভৃতি দেশে ক্ষমতায় রয়েছে ধর্মভিত্তিক দল। এর বাইরে ইরান, পাকিস্তান, ইসরায়েল প্রভৃতি দেশের শাসন কার্যক্রমের ওপর রয়েছে ধর্মের প্রত্যক্ষ প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে রাজতন্ত্র চললেও সেখানে ধর্মীয় প্রভাব প্রকটভাবে লক্ষণীয়।

গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় থেকেও অন্যান্য শাসন ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আকৃষ্ট হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রায় প্রত্যেক যুগেই জনগণ যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রত্যক্ষ করেছে। তবে গণতান্ত্রিক যুগে তা সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এর আগে যুদ্ধ রাজা, সামন্ত আর সেনা সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও গণতান্ত্রিক যুগেই এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয় বেসামরিক জনগণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যুদ্ধ-সংঘর্ষের কারণে বেসামরিক লোকজন যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আগে কখনো হয়নি। এমনকি রাজতন্ত্রের যুগে বড় বড় অনেক যুদ্ধের কথা জানতই না স্থানীয় জনগণ। এরই মাঝে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটত। ধর্মীয় যুদ্ধগুলোও হতো একটা নির্দিষ্ট সীমানায়। কিন্তু গণতন্ত্রে একজন ব্যক্তির শয়নকক্ষও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক শোষণ সর্বোচ্চ রূপ ধারণ করেছে।

এ ছাড়া গণতন্ত্রের নির্দিষ্ট কোনো মতবাদ না থাকায় বিশ্বব্যাপী তা ছড়িয়ে পড়ার পরও অনেক স্থানেই অনেকটা ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রথমে ক্ষমতা দখল ও এরপর নিজস্ব মতবাদ বাস্তবায়নের কাজ করে শাসকগোষ্ঠী। এ দিক থেকে ধর্ম ও সমাজতন্ত্রের অবস্থান পুরোপুরি বিপরীত। যা প্রথমে মতবাদ জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেয় ও পরে শাসন ক্ষমতা দখল করে। এ কারণে এটা গণতন্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই হয়। এ ছাড়া মানুষের মধ্যে ধর্মীয় আচার-আচরণ, বিশ্বাস ও অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তি পাওয়ার বাসনা সবসময় বজায় থাকায় গণতন্ত্রের মাঝেও ধর্ম দৃঢ় অবস্থানে বহাল থাকে। একই সঙ্গে সামাজিক-অর্থনৈতিক সাম্যের চেতনাও প্রস্ফুটিত থাকে।

এই মানব প্রকৃতিই গণতন্ত্রকে এককভাবে পৃথিবী শাসন করতে দেবে না। ধর্ম ও সমাজ গণতন্ত্রের ওপর প্রকট রূপে দেখা দেবেই। হয়ত তখন টিকে থাকতে বর্তমান রূপ ছেড়ে অন্যরূপ ধারণ করবে গণতন্ত্র। অথবা হারিয়ে যাবে কালের স্রোতে। বিপ্লব তো সবসময় পুরাতনকে হটিয়ে দেয়। তবে হ্যাঁ, কালের বিবর্তনে গণতন্ত্রের যে টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই তা কিন্তু নয়। সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগের মতো নমনীয় কিছু দিক এ পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে দীর্ঘ সময়। এরপরও অবশ্য শেষ কথা বলা যায় না; এটার ভার থাকল মহাকালের ওপরই।

(দ্য রিপোর্ট/এসকে/সা/সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫)