প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

সাগর আনোয়ার

দ্য রিপোর্ট

গণতন্ত্রের যাত্রায় বার বার হোঁচট

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৫ ১৭:২৫:০৪
গণতন্ত্রের যাত্রায় বার বার হোঁচট

স্বাধীনতার ৪৪ বছরে গণতন্ত্রের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশে গণতন্ত্র যাত্রাপথে বারবার হোঁচট খেয়েছে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে জাতীয় নির্বাচনের স্থায়ী গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি দাঁড় করতে ব্যর্থ হয়েছে এদেশের ক্ষমতাসীন সরকারগুলো।

অনেকে বলেন, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গণতন্ত্র হোঁচট খায় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের সাধারণ নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি, জবরদখল ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। জাসদের সে সময়ের নেতাদের দাবি- ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কুমিল্লার দাউদকান্দিতে জাসদ প্রার্থী আব্দুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের বিজয় ছিনিয়ে নেয়। নির্বাচনে জাসদ প্রার্থী রশিদ পেয়েছিলেন ২৪ হাজার ভোট। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী খন্দকার মোশতাক পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ভোট। কিন্তু রাতে ব্যালটবাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে উল্টো ফল ঘোষণা করে খন্দকার মোশতাককে বিজয়ী করা হয়।

একইভাবে বরিশালের উজিরপুরে তৎকালীন জাসদ সভাপতি মেজর (অব.) জলিলকে নির্বাচন কমিশন বিজয়ী ঘোষণা করলেও নির্বাচনের পরের দিন ঢাকা থেকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেতা হরনাথ বাইনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

১৯৭৩ সালের সাত মার্চের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে অস্বাভাবিকতার মধ্যে প্রবেশ করেছিল ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে তার মৃত্যু ঘটে। ওই দিন সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে সবদল বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সামরিক আইন জারি হয়। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয়। ১৫ আগস্ট বিকেলেই মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়। সামরিক আইনের অধীনে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার উপ-রাষ্ট্রপতি, ১০ জন মন্ত্রী, ৬ জন প্রতিমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় বহাল থাকেন।

এদিকে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক ১৯৭৫ সালের ৩ অক্টোবর বাকশাল গঠনের সময়কার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন। ১৯৭৫ সালের ৩ অক্টোবেরই খন্দকার মোশতাক ২ বছরের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। যাতে ১৯৭৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সে নির্বাচন হয়নি। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান ডেপুটি মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর থেকে নিজেকে চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন।

এরপর ৩০ এপ্রিল জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এভাবে সেনাবাহিনীর প্রধান ও চিফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর থেকেই রাজনীতিতে শক্ত ভিত গঠন শুরু করেন জিয়াউর রহমান। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার আগে জাগদল নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মও গঠন করেন জিয়া। রাষ্ট্রপতি জিয়ার উপ-রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ছিলেন এই দলের আহ্বায়ক। পরে ৩০ মে ১৯৭৭ সালে গণভোট হয়। হ্যাঁ, না ভোট। সেই ভোটে জিয়া ৯৮ শতাংশ ভোটারের সমর্থন দাবি করেন।

এভাবে সামরিক শাসক থেকে নিজেকে বেসামরিকীকরণের দিকে নিতে থাকেন জিয়া। পরে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা করেন ১৯৭৮ সালের ৩ জুন। নির্বাচনে তিনিই জয়ী হোন। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২৮ আগস্ট জাগদল বিলুপ্ত করে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠন করেন তিনি। তবে একদলীয় বাকশাল থেকে উর্দিপরা জিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো সকল দলের অংশগ্রহণে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। সেই নির্বাচনে জিয়ার নেতৃত্বাধীন সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, সিপিবি থেকে শুরু করে ইসলামপন্থী দলগুলোও স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেন জিয়া।

জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের দুই বছরের মাথায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন তিনি। ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত থেকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন আব্দুস সাত্তার। কিন্তু ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে উৎখাত করে আবারও গণতন্ত্রের কবর রচনা করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

১৯৮২ সাল থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় বছর স্বৈরশাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করেন বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল। কিন্তু এরমধ্যেও এরশাদ তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে নেন।

এরশাদের অধীনেই ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসন লাভ করে। এরশাদের অধীনে সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, সিপিবি অংশ নিলেও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।

আবারও এরশাদের অধীনেই ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ সংসদ নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচন বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলই বর্জন করে। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সেই নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে ২৫১টি আসন লাভ করে জাতীয় পার্টি।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এভাবেই স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনের পর ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হোন এরশাদ। বাংলাদেশের মানুষ আবার স্বপ্ন দেখে গণতন্ত্রের।

এদিকে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষভাবে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪২৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৭৫টি দল থেকে মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয় লাভ করে। তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন লাভ করে।

এরপর বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে চললেও আবার তা হোঁচট খায় বিএনপির হাতেই। বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এককভাবে করার চেষ্টা করে। সেই নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ বিরোধীদল বর্জন করে। পরে জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে আবারও ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। মানুষ আবারও স্বপ্ন দেখে গণতন্ত্রের।

৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও নবম নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার ২০০৬ সালের ১১ জানুয়ারি হোঁচট খায় বাংলাদেশের গণতন্ত্র। সে সময় জরুরী অবস্থা জারির মাধ্যমে দেশ অনির্বাচিত সরকারের হাতে চলে যায়। পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। মানুষ আবার স্বপ্ন দেখে গণতন্ত্রের।

এভাবে বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্র ফিরে আসে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও মুখ থুবড়ে পড়ে গণতন্ত্র। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই বর্জন করে। ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনাভোটে নির্বাচিত হয়। ৩০০ আসনের বাকি ১৪৭ আসনে নামমাত্র ভোট অনুষ্ঠিত হয় বলেই মনে করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

এভাবেই বার বার হোঁচট খাচ্ছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি তৈরির মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তা না হলে বারবারই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। মানুষের গণতন্ত্রের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : সাংবাদিক

• মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখা— লেখকের নিজস্ব চিন্তা ও মতের প্রতিফলন। দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম কর্তৃপক্ষ লেখকের লেখার বিষয়বস্তু, মত অথবা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের দায় নেবে না।