প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হলো না তার

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৭ ২১:৪৯:৫৫
সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হলো না তার

বাহরাম খান

মঞ্চে ধূমপান নিয়ে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। মিডিয়াতে প্রায় অপরিচিত মুখটি হঠাৎ সারাদেশে আলোচনার শীর্ষে। এর কিছু দিনের মধ্যেই আবার বোমা ফাটালেন। এবার সাংবাদিকদের প্রতি বিষোদ্গার করলেন, দাড়ি কমা না রেখেই।

সাংবাদিকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য এবং মন্ত্রিত্বের কারণেই অনেক বেশি সমালোচনার তীর তাকে সহ্য করতে হয়েছে। এক পর্যায়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মিডিয়ায় কথা বলতে সতর্ক করা হয় মন্ত্রীকে।

বলছি সদ্য প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী প্রসঙ্গে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়া এই মন্ত্রী সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ১৪ সেপ্টেম্বর।

প্রায় অপরিচিত একজন মন্ত্রী হঠাৎ এত আলোচনায় চলে আসায় তার বিষয়ে একটু উৎসাহী হয়ে উঠি। মৌলভীবাজারের দু’জন সাংবাদিক এবং ঢাকায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বললাম। মিডিয়ায় প্রকাশিত পরিচয়ের বিপরীত চিত্র জানলাম। উৎসাহ আরও বেড়ে গেল।

প্রতিদিনই সচিবালয়ে যাওয়া হয়। কয়েক দিনের চেষ্টায় তার সাক্ষাৎ মিলল। সাংবাদিকদের বিষয়ে সমালোচনা করার কয়েক দিন পরেই তার দফতরে দেখা করেছিলাম।

উচ্চ পর্যায় থেকে কিছু দিনের জন্য মিডিয়ায় কথা বলতে বারণ করা হয়েছে। সেই সময়েই দেখা করতে যাই। এপিএস শুনতে রাজি না। সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলবেন না মন্ত্রী। অনেক বুঝিয়ে তাকে রাজি করালেও আরেক বাহানা দেখালেন। জানালেন, মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার মেজ মেয়ের অনুমতি নিতে হবে।

মানুষকে ভালোবাসার সহজাত গুণ ছিল তার

ফোনে কথা হলো মন্ত্রীর মেয়ের সঙ্গে। তিনি শর্ত দিলেন, সাংবাদিক হিসেবে দেখা করা যাবে না। ব্যক্তিগত কাজে দেখা করা যাবে। বললাম, ব্যক্তিগত পরিচয়েই দেখা করতে চাই। এভাবে অনেক অদৃশ্য গেট পার হয়ে মন্ত্রীর রুমে ঢুকলাম।

তখন টেবিলে তিন-চার জনের সঙ্গে কথা বলছিলেন মন্ত্রী। আমি সোফায় বসলাম। সামনের লোকদের বিদায় করে মন্ত্রী নিজেই দাফতরিক টেবিল ছেড়ে সোফায় এসে বসলেন। দাঁড়িয়ে সম্মান দেখালাম।

বললাম, ব্যক্তিগত বিষয়ের কথা উল্লেখ করে আপনার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। কিন্তু আমার আগ্রহ সাংবাদিক হিসেবেই। আপনার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো কাজ নেই।

আরও জানালাম মিডিয়ায় আপনি যেভাবে পরিচিত হয়েছেন, এটাই যে আপনার আসল পরিচয় নয় সেটি মানুষের জানা দরকার। এজন্য একটি দীর্ঘ ইন্টারভিউ নিতে চাই। আপনি কথা বললেই সেটা সম্ভব।

জানাজায় মানুষের ঢল

মহসিন আলী বললেন, ‘এখন কথা বলতে একটু সমস্যা আছে। কিছুদিন যাক, পরে যোগাযোগ করো। আমি তোমাকে সাক্ষাৎকার দেব।’ আমি বললাম এখন যেহেতু আপনাকে নিয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে তাই এই সময়ে সাক্ষাৎকার না ছাপালে প্রাসঙ্গিকতা হারাবে। জবাবে মন্ত্রী বললেন, উপর থেকে কথা বলতে নিষেধ আছে। এখন কথা বলা যাবে না। তবে, তোমার সঙ্গে আমি কথা বলব।

ওপাড়ের ডাকে চলে যাওয়ায় সেই সাক্ষাৎকারটি আর নেয়া হলো না।

সাধারণত অপরিচিত সাংবাদিকদের কেউ ‘তুমি’ সম্বোধন করেন না মন্ত্রীরা। প্রথম দেখাতেই মহসিন আলী যেভাবে তুমি করে সম্বোধন করলেন, মনে হলো আমি উনার অনেক দিনের পরিচিত কেউ। পৌরসভা থেকে মন্ত্রিসভায় উঠে আসা এই মানুষটির সবাইকে ভালোবাসার, কাছে টানার শক্তি অনুভব করলাম।

সময় গেলে সাক্ষাৎকার কিংবা রিপোর্ট কোনো কিছুই কাজে আসবে না। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই একটু প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করি। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এভাবে কথা বলতে গেলেন কেন?

আরে শোন, সব সাংবাদিক কি খারাপ? সব প্রফেশনেই তো খারাপ-ভালো লোক আছে। আমি তো খারাপ সাংবাদিকদের কথা বলছি। এরা তদবির নিয়া আসে, নিজেরাই খারাপ কাজ করে আবার উল্টাপাল্টা লিখে। এগুলা দেখলে কি আর ভাল লাগে।

তাছাড়া আমি যেভাবে বলছি আগে পিছে কাটাকাটি করে অন্যভাবেও প্রচার করছে কেউ কেউ। এই জন্যই এত সমালোচনা। যাই হোক আর কথা বাড়াইতে চাই না। পরে বিস্তারিত বলব।

রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা

আপনি তো অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে। এলাকাতেও জনপ্রিয় কিন্তু মিডিয়াটা ফেস করতে গিয়ে নেতিবাচক হয়ে গেলেন।

‘শোন, আমি কাগুজে মুক্তিযোদ্ধা না।’ পরনে থাকা পাঞ্জাবির হাতাটা গুটিয়ে দুই হাতের কনুই দেখালেন, এই দেখ ক্রলিং করতে করতে কড়া (দাগ) পড়ে গেছে। এই দাগ মরণেও মুছবে না।

‘নেত্রী আমাকে ভালোবেসে মন্ত্রী বানিয়েছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না। শপথের সঙ্গে বেঈমানি করি নাই। দুর্নীতি করি না। যা বলি সরাসরি বলি। মিডিয়ায় কি লেখা হল না হল এগুলাতে আমি পরোয়া করি না। এইসব আমার কাছে কিছু না। নেত্রীর নিষেধে এখন (মিডিয়ায়) কথা বলি না। না হলে আরও বলতাম।’

আলতো-ফালতো নেতাগিরি করি না। এলাকার মানুষদের উপকার করে ছোট থেকে বড় নেতা হয়েছি, বার বার জনপ্রতিনিধি হয়েছি। নিজের বাপের জমি বিক্রি করে মেয়ের বিয়ের আয়োজন করছি (তার মেয়ের বিয়ের কয়েকদিন আগে এই সাক্ষাৎ)। এলাকার কেউ অভিযোগ দিতে পারবে না। এজন্য আমি কাউকে পরোয়াও করি না। দুই নম্বর লোক আমি দেখতে পারি না।

মন্ত্রীর রুমে ভিন্ন চিত্র

খুব অল্প সময়ের জন্য হলেও তার সাক্ষাৎ পাওয়ায় ধন্যবাদ জানালাম। দুপুরের সময় জিজ্ঞেস করলেন খেয়েছি কিনা। জানালাম খেয়েছি। ঠিক ওই সময়েই মন্ত্রীর রুমে ঢুকলেন তার নির্বাচনী এলাকার কয়েকজন মুরুব্বি স্থানীয় ব্যক্তি।

অফিস সহকারীদের নির্দেশ দিলেন খাবার পরিবেশনের। মন্ত্রীর টেবিলেই খাবার পরিবেশন শুরু হলো। সাতজন মানুষের বসতে কষ্ট হচ্ছিল। একজনকে মন্ত্রী তার চেয়ারের পাশে বসালেন।

তাজ্জব বনে গেলাম। মন্ত্রী তার দফতরের মূল টেবিলে এভাবে ঠাসাঠাসি করে খাবার খাচ্ছেন এলাকার লোকজন নিয়ে! একজন মন্ত্রীর দফতরে ব্যবহারের জন্য একাধিক রুম থাকে। অন্য যে কোনো রুমেই তিনি সবাইকে নিয়ে খেতে পারতেন, তা করেন নি।

আট বছরের বেশি সংবাদকর্মী হিসেবে বহু জায়গায় গিয়েছি। অনেক ক্ষেত্রের শীর্ষস্থানীয় মানুষের সঙ্গে দেখা-কথা হয়েছে। মন্ত্রী মহসীনের এলাকার মানুষের প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টান্ত কোথাও দেখিনি।

বাহরাম খান, সংবাদকর্মী