প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

কুয়াকাটায় ড্রাগনফল চাষে সম্ভাবনার হাতছানি

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৮ ১৯:৫৫:৫৬
কুয়াকাটায় ড্রাগনফল চাষে সম্ভাবনার হাতছানি

কাজী সাঈদ, কুয়াকাটা : ক্যাকটাস গোত্রের সবুজ গাছটি দেখে প্রথমে হয়ত অনেকে ভাবতে পারেন— বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্যই বুঝি এটি রোপণ করা হয়েছে। এরপর গাছটির রাতে ফোটা ফুলটি দেখেছেন তাদের অনেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তেও যেতে পারেন। কিন্তু না, পরিবেশ বা বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য এ গাছটি চাষ করা হচ্ছে না। এটি চাষ করা হচ্ছে গাছটির ফলের জন্য।

ফলটির নাম— ড্রাগনফল। বাংলাদেশে এ ফলের চাষ সাম্প্রতিক এবং হাতেগোনা কয়েকটি জায়গায় হলেও— ইতোমধ্যে ফলটি তার স্বাদে ও গুণে দেশবাসীর কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই ফলটি ব্যবসায়িকভাবে চাষের সম্ভাবনার বিষয়ে যাচাই-বাছাইও শুরু করে দিয়েছেন অনেকেই। এর মধ্যে কেউ কেউ সফলতার দেখা পেয়েছেন বা পেতে চলেছেন।

পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায়ও ফলটির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হয়েছে। মোঃ সফিকুল আলম তার বাড়ির আঙ্গিনায় ড্রাগনফলের চারা রোপণের মাধ্যমে এ চাষ শুরু করেন। সফিকুল আলম কুয়াকাটার মৎস্য বন্দর আলীপুর ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি লতাচাপলী ইউনিয়ন টিম লিডার। এ বছর বৃষ্টির মৌসুমে সফিকুল আলমের ড্রাগনফল গাছে ৪০-৫০টি ফল ধরেছে। এ ড্রাগনফল দেখার জন্য নিকটবর্তী এলাকার লোকজন ছুটে আসছে তার বাড়িতে। মূলত এ অঞ্চলে এ ফলটি প্রথম চাষ হওয়াতেই তা দেখতে এ উৎসুকতা। তবে তা কেবল দেখতে নয়— এলাকার অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছেন ফলটি চাষেও।

ড্রাগনফল দেখতে আসা স্থানীয় অনেকেই জানান, ড্রাগন গাছে ফল দেখে তারা অবাক হন। এ ফল তাদের কাছে অপরিচিত। তবে কৌতূহল মেটাতে একটা ফল খেয়ে তাদের অনেকেই তৃপ্ত হয়েছেন। তাদের অনেকের অভিমত, এলাকায় ড্রাগনফলের চাষ হলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে কৃষকরা।

কলাপাড়া কৃষি দফতর সূত্রে জানা যায়, চিরসবুজ ক্যাকটাস গোত্রের এ গাছটি ১৩ শ’ শতাব্দীতে প্রথম সেন্ট্রাল আমেরিকায় চাষ হয়। বর্তমানে ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ চীন, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ড্রাগনফলের ব্যাপক উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে ২০০৭ প্রথম এ ফলের চাষ করা হয়। ড্রাগনফলের চারটি জাত রয়েছে। এগুলো হল— সাদা, লাল, হলুদ ও কালচে লাল। তবে সাদা ও লাল রঙের ফল বেশী স্বাদযুক্ত বলে জানান কৃষিবিদরা। পূর্ণবয়ষ্ক একটি ড্রাগন গাছে ২৫ থেকে ১০০টি ফল পাওয়া যায়।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রপিকাল জলবায়ুর সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগনফলের চাষ করা যায়। তবে উচ্চ জৈব পদার্থসমৃদ্ধ বেলে-দোআঁশ মাটি এ ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে এর চাষ ভাল হয়। মাঝারি বৃষ্টিপাত এ ফল চাষের জন্য উত্তম। বর্ষা মৌসুমে ড্রাগন গাছে ফল আসে।

ড্রাগনফল চাষী মোঃ সফিকুল আলম বললেন, ‘উঁচু সমতল জমি এ ফল চাষের জন্য ভাল। জলাবদ্ধতা না থাকলে এ ফলের ফলন ভাল হয়। প্রতিদিনের স্বাভাবিক পরিচর্যায় গাছ বেড়ে ওঠেছে এবং ফলও ধরেছে। যেহেতু এ এলাকার মাটিতে ড্রাগনফল উৎপাদন হয়েছে। তাই সরকারি কিংবা ব্যক্তি মালিকানায় এ অঞ্চলে ফলের চাষ করলে বহু লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। সাধারণ মানুষের জীবনের ফিরে আসবে আর্থিক স্বচ্ছলতা।’

ভেষজ-চিকিৎসক ডা. নিখিল চন্দ্র দেবনাথের মতে, ‘ড্রাগনফল একটি ঔষধী ফল। এ ফল শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি একটি ব্রেইন টনিক হিসেবে কাজ করে। ড্রাগন ফল পেটের পীড়া, লিভারের সুস্থ্যতা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ নিরসনে অত্যন্ত উপকারী। শরীরের রক্তের গ্লুকোজকে অতি সহজে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এ ফল। তাই ডায়াবেটিস রোগীর জন্য ড্রাগনফল মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। তা ছাড়া প্রচুর ভিটামিন সি, মিনারেল ও উচ্চ ফাইবার রয়েছে এ ফলে।’

কুয়াকাটায় ফলটি চাষে সম্ভাবনার কথা জানিয়ে কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মশিউর রহমান বললেন, ‘কুয়াকাটায় যেহেতু ড্রাগন ফলের উৎপাদন হয়েছে, সেক্ষেতে এ মাটিতেই ড্রাগনফল চাষের জন্য উপযুক্ত। সরকারের উদ্যোগে হোক কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে হোক, চারা সংগ্রহ করে ড্রাগনফলের উৎপাদন হলে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রফতানি করা সম্ভব হবে।’

(দ্য রিপোর্ট/আইজেকে/আরকে/সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৫)