প্রচ্ছদ » জাতীয় » বিস্তারিত

‘বাল্যবিবাহ রোধে আইনের বাস্তবায়ন জরুরী’

২০১৫ সেপ্টেম্বর ১৯ ১৬:০২:৪৫
‘বাল্যবিবাহ রোধে আইনের বাস্তবায়ন জরুরী’

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের বাস্তবায়ন জরুরী বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দৈনিক প্রথম আলোর কার্যালয়ে শনিবার ‘বাল্যবিবাহ রোধে দ্রুত আইন পাস ও বাস্তবায়ন চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের দেশে যতো আইন আছে, যুক্তরাষ্ট্রেও এতো আইন নেই। কিন্তু আমাদের আইনের বাস্তবায়ন নাই। বাল্যবিবাহ রোধে নতুন আইন প্রণয়নের চেয়ে আইনের বাস্তবায়নটাই জরুরী।’

‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ নয় বরং নিষিদ্ধ করতে কাজ করতে হবে’, মত দেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নতুন আইনের খসড়ায় ছেলে-মেয়ের বিয়ের বয়সে আগেরটাই অর্থাৎ ২১ এবং ১৮ বছর পুনর্বহাল রাখা হয়েছে। যদি বাবা মায়ের মতামত কিংবা যুক্তিসংগত কারণ থাকে তবে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ করা যাবে।’

এ বিষয়ে অন্য আলোচকদের ঘোর বিরোধিতার প্রসঙ্গে নাসিম বলেন, ‘‘আইনের খসড়ায় এই ‘তবে’ শব্দটা থাকবে না, হবে যেটা হবেই আবার তবে কিসের? এখানে কোনো যদির দরকার নাই।’’

গ্রামে কিংবা বস্তিতে আর্থসামাজিক কারণেই বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে মেয়েদেরকে উঠে দাঁড়াতে হবে। দারিদ্র্যতা হ্রাস পেলে এবং শিক্ষা বাড়লে বাল্যবিবাহও হ্রাস পাবে।’

স্বাস্থ্যগত কারণেই মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ এর নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দারিদ্র্য হ্রাসে সারা বিশ্বের মধ্যে প্রশংসিত হয়েছি। দারিদ্র্যকে জয় করতে পারলেই আমরা এই বাল্যবিবাহ থেকে বের হয়ে আসতে পারব।’

বাল্যবিবাহ যেহেতু আগের চেয়ে কমেছে, তাহলে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাল্যবিবাহকে আমরা একদিন শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে পারব বলেও মনে করেন তিনি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রত্যেকটি আইনকেই ভাব, স্বভাব এবং অভাব এই তিনটি দিক দিয়ে পর্যালোচনা করা যায়। বাল্যবিবাহ রোধে নতুন খসড়া আইনে ভাব এবং স্বভাবটা খুবই প্রশংসনীয়। এখানে নারী ও শিশুর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই খসড়া আইনের সবচেয়ে অভাবের জায়গা ধারা ২। এখানে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বলা হলেও তবে বাবা-মায়ের মতামতের ভিত্তিতে ১৬ করার কথা বলা হয়েছে। এই তবে কথাটি যুক্ত করে আইনটিকে আবারও সেই ১৯২৯ সালের প্রণিত আইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

দারিদ্র্য ও যৌন নিপীড়ন যদি বাল্যবিবাহের কারণ হয়ে থাকে তাহলে এর দায় কার এমন প্রশ্ন রেখে মিজানুর রহমান আরও বলেন, ‘শিশু এবং বৃদ্ধদের দায়িত্ব যদি রাষ্ট্রের হয়ে থাকে তাহলে এই দারিদ্র্য এবং যৌন নিপীড়নের দায়ও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।’

কণ্যাশিশু মানে দায় নয় সম্পত্তি এমন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কন্যাশিশুর শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়া রোধ করতে পারলে বাল্যবিবাহ অনেকাংশেই কমে যাবে।’

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ প্রয়োজন মন্তব্য করে সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতি খসরু বলেন, ‘গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ইচ্ছা এবং অনিচ্ছার কোনো দাম নাই। লেখাপড়া নিশ্চিত করতে পারলে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে এ সমস্যাটা কমে আসবে।’

বাল্যবিবাহ সুস্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতীয় সমস্যা উল্লেখ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনটা সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইনটাই আসলন নয় মন্তব্য করে সংসদ সদস্য নূরজাহান বেগম বলেন, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সেই ১৯২৯ সাল থেকেই আইন আছে। যদি আইনটাই আসল হতো তাহলে এতোদিনে আমরা অনেককিছুই অর্জন করে ফেলতাম। এখানে সমচেতনতাই মূল বিষয়।’

পুরস্কারের জন্য বাল্যবিবাহ আইনে বয়স কমানো হচ্ছে অনেকের এমন ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার মাতৃ মৃত্যু এবং শিশু মৃত্যু হ্রাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছে। তাহলে বয়স কমিয়ে পুরস্কারের আসা করে সরকার মাতৃমৃত্যু এবং শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি নিবে না। বর্তমান সরকারই অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি নারীবান্ধব।’

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের এ্যাডভোকেসি পরিচালক চন্দন জেড গোমেজ বলেন, ‘খসড়া আইনে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৬ করা হচ্ছে এমন কথা প্রত্যন্ত অঞ্চলে রটে গেছে। গ্রামের মানুষের এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে ব্যপক প্রচারণা দরকার।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘শিশুর পেটে শিশু চাই না, মায়ের পেটে শিশু চাই।’

আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন, আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, ওয়ার্ল্ড ভিসনের সাবিরা নুপুর প্রমুখ।

(দ্য রিপোর্ট/পিএম/একেএস/আরকে/সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৫)