প্রচ্ছদ » জাতীয় » বিস্তারিত

অনিশ্চয়তায় ৫ শতাধিক

হজে যেতে পারছেন না ৩ শতাধিক

২০১৫ সেপ্টেম্বর ২১ ১২:৫৬:০৮
হজে যেতে পারছেন না ৩ শতাধিক

কাওসার আজম, দ্য রিপোর্ট : মুয়াল্লিম ফির সঙ্গে বিমান ভাড়া, সৌদি আরবে বাসা ভাড়াসহ আনুসঙ্গিক সব খরচের টাকা জমা দেওয়ার পরেও ভিসা না পাওয়ায় এবার পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবে যেতে পারছেন না তিন শতাধিক হজযাত্রী। আবার সৌদি দূতাবাস থেকে ভিসা মিললেও বিমানের টিকিট না পাওয়ায় অনিশ্চয়তায় রয়েছেন আরও পাঁচ শতাধিক যাত্রী।

হজ অফিস, হজ এজেন্সি অব বাংলাদেশ (হাব) ও সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর উত্তরার আশকোনায় হজ ক্যাম্পে দেখা গেছে, বিক্ষিপ্তভাবে কয়েকশ’ হজযাত্রী বসে আছেন। তাদের অধিকাংশই হজে যাওয়ার জন্য ভিসা পাওয়ার পর দিনের পর দিন হজ ক্যাম্পে অবস্থান করেও বিমানের টিকিট না মেলায় সৌদিতে যেতে পারছেন না। এমনই একজন যশোরের পালপাড়ার এ এফ এম শাহাবুদ্দিন (৭০)। তিনি যশোরের নতুন খয়েরতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।

শাহাবুদ্দিন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা ফারুক ট্রাভেলস’র মাধ্যমে হজের জন্য ৭০ জন রেজিস্ট্রেশন করেছি। এর মধ্যে ৩৩ জনের ভিসা ও টিকিট হয়েছে। বাকি ৩৭ জনের ভিসা হলেও বিমানের টিকিট পাইনি। এরপর এই টিকিটের আশায় আমিসহ বাকিরা গত বুধবার থেকে এখানে (হজ ক্যাম্প) পড়ে আছি।’

এ ব্যাপারে ফারুক ট্রাভেলস’র মালিক ফারুক আহমেদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘‘৭০ জন হজযাত্রীর জন্য এক কোটি ৬৫ লাখ টাকা হাব অফিসে জমা দিয়েছি। তিন দিন ধরে টিকিটের জন্য হাব অফিসে ঘুরছি, কিন্তু এখনও ৩৭ জনের টিকিট পাইনি। তারা শুধুই বলছেন, ‘পেয়ে যাবেন, পেয়ে যাবেন’। এখন আমি কী করব।’’

হজ ক্যাম্পে কথা হয় আল ফালাহ ট্রাভেলস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা হোসেন সিরাজের সঙ্গে। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমার এজেন্সির ৪৯ জনের ভিসা পেলেও বিমানের টিকিট হাতে পাইনি।’

ফারুক ট্রাভেলস ও আল ফালাহ ট্রাভেলসের মতো আরও অনেকগুলো হজ এজেন্সির মালিক ও হজযাত্রীরা একই সমস্যায় পড়ে অনিশ্চিয়তার প্রহর গুনছেন।

এর মধ্যে রয়েছে— আল মাবরুর ট্রাভেলসের ৪৭ জন, আল ফাত্তাহ ট্রাভেলস এ্যান্ড ট্যুরসের ৪৯ জন, ব্রাইটের ২৫ জন, জুয়েল ট্রাভেলসের ৪৯ জন, হাসান ওভারসিজের ৪৯ জন ও আল রাইয়ানের ৪৫ জন। এ ছাড়া আরও অনেক হজ এজেন্সির কয়েকশ’ যাত্রী ভিসা পেলেও বিমানের টিকিট না পাওয়ায় অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন হজ ক্যাম্পে।

শুধু তাই নয়, নির্ধারিত কোটার বাইরে সৌদি সরকার বাংলাদেশ থেকে যে ৫ হাজার হজযাত্রীকে এ বছর পবিত্র হজ পালনের জন্য অনুমতি দিয়েছিল, তার মধ্যে তিনশতাধিক যাত্রীর ভিসা লজমেন্টই হয়নি। এ কারণে তারা এবার হজে যেতে পারছেন না।

হজ ক্যাম্পে কথা হয় হামজা এয়ার ট্রাভেলসের পরিচালক নুরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘অতিরিক্ত কোটা থেকে হাব তাদের একশ’ জনের কোটা বরাদ্ধ করে। এসব হজযাত্রীর বিমান ভাড়াসহ আনুসঙ্গিক খরচ বাবদ দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা হাব অফিসে জমা দিয়েছি।’

টাকা জমা দেওয়ার রশিদ দেখিয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে টাকা জমা দিয়েও কেন হাব আমাদের এসব যাত্রীদের ভিসা এবং টিকিট দিল না— এ প্রশ্ন করার লোকও পাচ্ছি না। কয়েক দিন ধরে হাব অফিসে ঘুরে ঘুরেও কোনো কাজ হয়নি। ফলে আমার যাত্রীদের বলেছি নিজ নিজ বাড়িতে যেতে। তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু, হাব’র কাছ থেকে যে টাকা ফেরত পাব, এ নিশ্চয়তা কে দেবে?’

এ বছর সৌদি সরকার বাংলাদেশের জন্য এক লাখ এক হাজার ৭৫৮ জনকে পবিত্র হজ পালনের অনুমতি দেয়। তবে, নির্ধারিত কোটার বাইরে আরও অনেক বেশি হজযাত্রী নিবন্ধিত হওয়ায় সংকট তৈরি হয়। বঞ্চিত এজেন্সিদের আন্দোলন এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের চেষ্টায় সৌদি সরকার গত ৯ সেপ্টেম্বর আরও অতিরিক্ত ৫ হাজার হজযাত্রীকে হজ করার অনুমতি দেয়। ধর্ম মন্ত্রণালয় এসব যাত্রীকে সৌদিতে পাঠাতে হাব নেতাদের দিয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেয়। এই কমিটিই হজযাত্রীদের বিমান ভাড়া ও সৌদিতে থাকা খাওয়াসহ সকল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পায়। কিন্তু, শেষ মুহূর্তে হজ পরিচালনায় হাব নেতাদের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

এ ব্যাপারে হাবের মহাসচিব শেখ আব্দুল্লাহ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা দিন-রাত হজযাত্রীদের জন্য কাজ করছি। ৫ হাজার অতিরিক্ত যাত্রীর মধ্যে ৪ হাজার ৭শ’ জনেরই ভিসা হয়ে গেছে। বাকি তিনশ’ জনের হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকজন কালকেও (রবিবার) সৌদি দূতাবাসে হজ ক্যাম্পে অবস্থানরতদের ভিসার জন্য গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে সার্ভার বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে কথা বলে কোনো সমাধান করা সম্ভব হয়নি। ফলে তারা আর এবার হজে যেতে পারছেন না।’

ভিসা পেলেও শত শত যাত্রী টিকিট না মেলায় সৌদিতে যেতে পারছেন না— এমন প্রসঙ্গে শেখ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘১১শ’ জনের ভিসা প্রক্রিয়া চলছে। সবারই হয়ে যাবে। আজ (সোমবার) শেষ হজ ফ্লাইট বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে। এর আগে বাংলাদেশ বিমানের আরও দুটি হজ ফ্লাইট (বিকেল ৪টা ও সোয়া ৪টা) আছে। এসব যাত্রী এই ফ্লাইটগুলোতে সৌদিতে যেতে পারবেন।’

এদিকে বেলা ১১টা পর্যন্ত হজ ক্যাম্পের পরিচালক ও সহকারী পরিচালক কাউকেই পাওয়া যায়নি। হজ ক্যাম্পের উচ্চমান সহকারী আব্দুল আউয়াল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘উনারা সচিবালয়ে আছেন। বিকেলে শেষ ফ্লাইটে সচিবের সঙ্গে তারাও হজে যাবেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা হজ ক্যাম্পে আসবেন।’

এদিকে, রবিবার বিকেলে বঞ্চিত ও ভোগান্তির শিকার এসব হজযাত্রী ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব চৌধুরী মো. বাবুল হাসানের কাছে সমাধান চাইলে তিনি হজ অব্যবস্থাপনার জন্য ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও হজ এজেন্সিজ অব এ্যাসোসিয়েশনকেই (হাব) দায়ী করেন। তার এ ব্যাপারে কিছুই করার নেই জানিয়ে, সমস্যা সমাধানে তিনি ধর্মমন্ত্রী ও হাব নেতাদের দ্বারস্থ হওয়ার পরামর্শ দেন।

(দ্য রিপোর্ট/কেএ/একেএস/এইচ/সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৫)