প্রচ্ছদ » সাহিত্য » বিস্তারিত

রবি শংকর বলের দোজখ্‌নামা

জীবন-কর্ম-প্রেম-দ্রোহের গল্প

২০১৫ সেপ্টেম্বর ২৪ ১৪:০৩:৪৪
জীবন-কর্ম-প্রেম-দ্রোহের গল্প

রেজা রিফাত

মৃত্যুর পরের জীবনটা কেমন-সে সম্পর্কে আমাদের কোন ধারণা নেই। একটা অন্যজগত, অপেক্ষমাণ পরাবাস্তবতা! দুজন মানুষ যখন কবরে শুয়ে শুয়ে কথোপকথন চালিয়ে যায়- কি নিয়ে কথা বলবে তাঁরা? খুব কৌতূহল উদ্দীপক ব্যাপার! “দোজখ্‌নামা” উপন্যাসে কি বিভিন্ন ধর্মে বর্ণিত নরকের বর্ণনা থাকবে? (মোটাদাগে বইটার নাম দেখে যে কারো মনে হতে পারে)। আদতে তা না, বরং এটা বলা যায় একটা দীর্ঘ ইতিহাসকে উপজীব্য করে দুজন মানুষের জীবন, কর্ম, প্রেম, যন্ত্রণা উঠে এসেছে চমৎকারভাবে।সত্যিই রবি শংকর বলেরদোজখনামা’, অসাধারণ একটি গ্রন্থ। উপমহাদেশের উর্দুভাষার দুই মহান স্রষ্টা মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব এবং সাদাত হাসান মান্টোর কন্ঠস্বর খুঁজতে গিয়েই ‘দোজখ্‌নামা’র সৃষ্টি।

উপন্যাসের শুরুটা হয় উত্তম পুরুষে- লখনৌতে গিয়ে লেখক ঘটনাক্রমে পেয়ে যান সাদাত মান্টোর অপ্রকাশিত এই উপন্যাস। সাদাত মান্টো যিনি তাঁর কবরের ফলকে লিখে রেখেছেন, কে বড় গল্প লেখক- মান্টো না আল্লা?। মির্জা গালিবের উপর লেখা এ দস্তান মূলত তুলে এনেছে ১৮০০ সাল থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত দেড় শ বছরের ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ১৯৪৭ এর দেশ ভাগ, এর পরবর্তী দাঙ্গা। পুরো বইতেই আমরা পাই মির্জা গালিবের গজল। এছাড়াও কত মানুষের আখ্যান-কিস্‌সা উঠেছে পুরো বই জুড়ে। ফরিদ উদ্দিন আত্তারের গল্প, রুমির মসনবির কিসসা, হাফিজ- মীর তকি মীরের গজলসহ কত কত কল্পকথা উঠে এসেছে। আমি পড়তাম- আর মুগ্ধতা বেড়েছে ক্রমশ।

উর্দু কবিতার তিন দিকপালের একজন মির্জা গালিব, এছাড়াও মোঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ বড় কবি হিসেবে ধরা হয় গালিবকে। কবরে শুয়ে মির্জা এবং মাণ্টো শুরু করেন তাঁদের নিজেদের গল্প। যেন ইতিহাসের দুই দুঃসময়ের দুটি উচ্ছন্ন জীবন পরস্পরকে একজনের আয়নায় আরেকজনকে দেখার চেষ্টা! কি করে এক এক জন গালিব কিংবা মান্টো হয়েছে তাঁর বয়ান উঠে আসে ধীরে ধীরে। একজন ব্যক্তি যখন বেড়ে উঠতে থাকেন, ইতিহাস তৈরি হতে থাকে তাঁর নিজস্ব কক্ষপথে। ইতিহাস মানেই তো ক্ষয়-সৃষ্টির পারস্পরিক উত্থান একইসাথে।

পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টিশীল মানুষের জীবন কখনই সুখের ছিল না। নিরন্তর বেদনার পথে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করে করে একজন গালিব/মান্টো হয়ে উঠেন। এই পথ সাধক আর সাধনার পথ। যেখানে নিজের জীবনের সুখ-সাচ্ছন্দ্য বিলীন হয়ে যায় সৃষ্টির যন্ত্রণায়, যেটা একজন সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অঅনুমেয়। তখন পৃথিবী নিছক দোজখ ছাড়া আর কিছু না। এই বইতেই মির্জা গালিব বলছেনকিন্তু আল্লা আমাকে পৃথিবীতেই দোজখ দেখিয়ে কবরে পাঠাবেন। কেন জানেন? আমার একটাই গুনাহ। এই নশ্বর জীবনটাকে তো খোদা একেবারে মুছে দিতে চান, আমি সেই জীবনের কয়েকটা মুহূর্তে অনন্তের স্বাদ দিতে চেয়েছিলাম- আমার গজলে। খোদা তাঁর জন্য আমাকে শাস্তি দিবেন না? দেবেনই তো। কে হে তুমি মির্জা গালিব, খোদার দুনিয়ায় পাশে শব্দ দিয়ে আর একটা দুনিয়া করতে চাও বেওকুফ! তুমি কবিতা লেখো, কিসসা বানাও, তসবির আঁকো, সুর বাধো তুমি বেওকুফ ছাড়া আর কি! আপনি কি করবেন, মান্টো ভাই? শব্দকে যে আমি ভালোবাসি, শব্দ ছেনে ছেনে রং বের করি, শব্দের গভীরে ঢুকে সুর শুনতে পাই, অন্ধকারকে দেখতে পাই- এসব যে আমি পারি, তা তো আল্লাহর দান। তবু তিনি আমাকে শাস্তি দিবেন? আমি অনেক পরে এই শাস্তির অর্থ বুঝে ছিলাম। যাকে দেখা যায় না, তুমি তাকে দেখেছ, যা শোনা যায় না, তা তুমি শুনেছ; যাকে অনুভব করা যায় না, তাকে তুমি অনুভব করেছ; এই জন্যই তো তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে। অনন্তের স্বাদ পাওয়ার জন্যই নরক-জীবন দেখতে হবে তোমাকে। আল হাল্লাজকে যেমন শাস্তি পেতে হয়েছিল। একটা দুনিয়া তুমি গড়তে চাও, আর তার ভার বহন করবে না তা কি হয়?”মির্জা গালিবের জীবন ছিল ছন্নছাড়া, মাত্র ১৩ বছর বয়েসে বিয়ে হয় অথচ স্ত্রীর সাথে অমিল। নিজের হাভেলি(বাড়ি) না থাকার জন্য হাহাকার। বেহিসেবি জীবন, অর্থকষ্ট এবং জীবনের শেষের দিকে খাবারের অভাবে পর্যন্ত পড়তে হয় তুর্কি রক্তের গর্বিত মির্জাকে। শেষ বয়সে এত বেদনা এসে ঘিরে ধরে মির্জাকে, ধুঁকে ধুঁকে অন্ধ পর্যন্ত হয়ে যান। যদিও এর কিছুদিন আগেই তাকে দেখতে হয় মোঘল সাম্রাজ্যের পতন এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। ইংরেজদের নিষ্ঠুরতা, অপমান তাকে দগ্ধ করে প্রচণ্ডভাবে। নিজের স্বজাতির লাশ দিল্লীর রাস্তায় দেখে হতবাক হয়ে যান গালিব। তার পূর্বসূরি মীরের গজলে আশ্রয় নেন মির্জা গালিব।

আকাশ তলায় বসে তুমি নিজের দুঃখ নিয়ে কাঁদছ মীর; কত সমাজ সংসার এখানে পুড়ে ছাই হয়ে গেলো।

দোজখ্‌নামা’য় অন্যদিকে সমান তালে এগোতে থাকে মির্জা গালিবের গজলে মুগ্ধ মান্টোর গল্প। পিতার দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান মান্টো। পিতার অনাদর অবহেলায় একধরনের গ্লানি নিয়ে বেড়ে উঠেন উর্দু সাহিত্যের এই মহান লেখক। বেপরোয়া- দুর্বিনীত মান্টো তিনবারের চেষ্টায় পাশ করেন ম্যাট্রিক। আর সেই সময় থেকে ডুবে যান মদের নেশায়, যে বদভ্যাস চিরকালই তাকে ভোগায় এবং জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এছাড়াও সেসময় সমাজের অচ্ছুৎ দেহপসারিনীদের সাথে গড়ে তোলেন সম্পর্ক, নিয়মিত যেতেন হিরামান্দিতে। মান্টো নিজের জীবনকে বলতেন কুত্তার জীবন। আস্তে আস্তে জড়িয়ে পড়েন লেখালেখিতে। একটা পর্যায়ে অমৃতসর ছেড়ে চলে যান বোম্বাই ভাগ্য ফেরানোর আশায়। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখা, সফিয়ার সাথে বিয়ে, আরেক লেখক ইসমত চুঘতাইয়ের সাথে সম্পর্কসহ নানা গল্প বলে চলেন অবলীলায়। ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পরে ফিরে আসেন করাচিতে। ততদিনে দেশ বিভাগের বিষাক্ত তীর তাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ছিল সম্ভবত তার জীবনের সবচাইতে দুঃখের ঘটনা।

কেমন করে কাটবে বর্ষার অন্ধকার রাত্রিগুলি;আমার চোখ যে তারা গুনতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে!

১৯১৯ সালে তালাশ গল্পের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রকাশ করেন সাদাত মান্টো। সমাজের অচ্ছুৎ- গরিব এদের জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা তুলে এনেছেন নিষ্ঠার সাথে। তার লেখার উঠে এসেছে মানুষের ভণ্ডামি- নোংরামি আর অন্ধকার দিক। লেখার সাথে আপোষ করেননি কখনো। মান্টোর অনেক লেখাই বিবেচিত হয় অশ্লীলতার দোষে, তাকে জড়িয়ে পড়তে হয় মামলা মকাদ্দমায়। তার বিখ্যাত গল্প “ঠাণ্ডা গোস্ত”সহ অনেক গল্পে উঠে এসেছে এদের জীবন। মান্টো নিজেই বলছেন তার লেখা সম্পর্কে এবং অন্যদের ধারনা; শালা, শুয়োর কাহিকা, “ঠাণ্ডা গোস্তলিখো, এত বড় কাফের তুমি? কি বলে ওরা তুমি শুনছো? শুধু নারী- পুরুসের মাংসের গল্প লিখেছ, রেড লাইট এরিয়া ছাড়া আর কি আছে তোমার লেখায়। হাত তুলে দিলাম মির্জা সাব, না কিছু নেই। হত্যা আছে, ধর্ষণ আছে, মৃতের সাথে সঙ্গম আছে, খিস্তির পর খিস্তি আছে- আর এসবের পিছনে লুকিয়ে আছে কয়েকটা বছর- রক্ত ভেসে যাওয়া বছর- ১৯৪৬, ১৯৪৭, ১৯৪৮- আছে নো ম্যানস ল্যান্ড, দেশের ভেতরে এক ভুখণ্ড যেখানে টোবা সিং মারা গেছিল

এটাকে মোটামুটি ভাবে দোজখ্‌নামার গল্প বলা যায়। একটা দীর্ঘ পটভূমিকে তুলে এনেছেন রবি শংকর বল তার অসামান্য মুন্সিয়ানায় এ বইতে। পাঠকের বইয়ের মাঝপথে কিছুটা ধৈর্যচ্যুতি আসতে পারে, তাতে করেও এ বইকে ম্লান করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। লেখক অসম্ভব পরিশ্রম করে এই বই লিখেছেন, তা বলা যায়। পাঠককে যেন মুখোমুখি করে দেন ইতিহাস- কিসসা- গজলের। দিল্লী-বোম্বে- করাচী ভাসতে থাকবে মুগ্ধ পাঠকের চোখে। একজন মান্টো কিংবা গালিব হওয়ার জন্য জীবনেরও কিছু দায় থাকে, তার চারপাশের আনন্দ- দুঃখ- না পাওার যন্ত্রণা তাকে তাড়িত করে। জীবন নেহায়াৎ ছোট- সুন্দর! তবু... জীবন কখনো কখনো কারো কারো জন্য দোজখ্‌ হয়ে উঠে।