প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় » বিস্তারিত

পলিথিন বন্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত কালক্ষেপণ

২০১৫ অক্টোবর ০৮ ০০:০২:২৮

সংবাদপত্রের তথ্যমতে, পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরুর তারিখ পেছানো হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবরের পরিবর্তে ১ ডিসেম্বর থেকে সারাদেশে এ অভিযান চালানো হবে। এ সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্টকহোল্ডোরদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি- এই ছয় ধরনের পণ্য মোড়কজাতে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে ফের পলিথিনকে শাসনে আনতে প্রশাসন উদ্যোগী বলে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তলে তলে পথিলিন ব্যবহার হচ্ছে সর্বত্র। বেশ আগে থেকে সারা বাংলাদেশে অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে নিষিদ্ধ পলিথিন। বিভিন্ন নগরীর অভিজাত শপিংমল, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে ফুটপাতের হকার, মুদিদোকান, কাঁচাবাজার, মাছের বাজার সর্বত্রই পলিথিন ব্যাগের ছড়াছড়ি।

প্রকাশ্যেই আইন ভঙ্গ করে ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীরা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। দু-এক জায়গায় ধরা পড়লেও অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে অধরা। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যেই পলিথিন বিক্রি করছেন। দিনের পর দিন প্রশাসনের নাকের ডগায় পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে। সব জায়গার স্থানীয় প্রশাসন এ ব্যাপারে খুব একটা ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পলিথিনের যত্রতত্র এ ব্যবহার ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অন্যতম কারণ। এই বৃষ্টি মৌসুমেও শহরে পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়াতে পলিথিনের দায় আছে। শুধু তাই নয়, পলিথিন আমাদের পরিবেশের জন্য সবদিক থেকে ক্ষতি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ১০০ থেকে ৪০০ বছর সময় লাগে। এ সময়ে খাল-বিল-নদীপথে পড়ে তার উপরে পলি জমে অনেক সময় সেগুলোর স্বাভাবিক পথ রুখে দেয়, ফসলের জমিতে পড়েও অপচনশীল থেকে উর্বরতা নষ্ট করে।

১৯৯৮ সালের বন্যায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে কয়েক বছরের জোর প্রচেষ্টায় ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা ও ১ মার্চ সারাদেশে পলিথিন তৈরি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। ২০০২ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পর জোরালো অভিযান ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পলিথিনের ব্যবহার প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আবার পলিথিনের ব্যবহার বাড়তে শুরু করে, যা ক্রমবর্ধমান।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০০২ (সংশোধিত) অনুযায়ী, ওই আইন অমান্য করলে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। আর বাজারজাত করলে ৬ মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রকাশ্যে পলিথিন ব্যবহার করা হলেও এই আইনের কোনো প্রয়োগ লক্ষণীয় নয়।

বর্তমানে সারাদেশে এক হাজার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছে তাদের অবৈধ কার্যক্রম। বাজারে চাহিদা থাকাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে গোপনে গড়ে উঠছে আরও নতুন নতুন কারখানা।

ওই আইনে ১০০ মাইক্রোনের কম পুরুত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, সিমেন্ট, সারশিল্পসহ মোট ১৪টি পণ্যে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু এ সবের বাইরেও এখন পলিথিন ব্যবহার চলছে দেদার।

আমরা জানি, পলিথিন ব্যাগ ক্রেতার সহজলভ্য হওয়ার কারণে এবং বিনামূল্যে বিক্রেতা পণ্যের সঙ্গে দেয়ার কারণে এর এত চাহিদা। যে কারণে পুরোপুরি নিষিদ্ধ ও ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও আবার দেদার ব্যবহার শুরু হয়েছে পলিথিনের।

ব্যবহারের বিকল্প উপায়গুলো ব্যয়বহুল হওয়ায় ক্রেতারাও নির্বিকার ছিলেন। সরকারের উচিত ছিল বহু আগে দায়িত্ব নিয়ে পলিথিন ব্যবহারের বিকল্প কিছু ভাবা। সম্প্রতি বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি- এই ছয় ধরনের পণ্য মোড়কজাতে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করাটা হয়তো একটা বিকল্প চিন্তা। কিন্তু যথেষ্ট যে নয়, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। তার জন্য আরও বিকল্প উপায় বের করতে হবে।

পলিথিনের কুফল কত সুদূরপ্রসারী সে বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, পলিথিনের ব্যবহার তার নিজের ও উত্তরাধিকারের জীবনকে বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে যারা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে জড়িত তাদের ওপর আইনের প্রয়োগ করতে হবে। কারণ এটা একটি জাতীয় সমস্যা। বিকল্প যে ভাবনার অবতারণা ঘটিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী, তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করা উচিত নয়। এরই মধ্যে অভিযানের তারিখ পেছানোতে সবাই দ্বিধান্বিত, নতুন করে নির্ধারিত অভিযানের তারিখ যেন না পেছায়— সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।