প্রচ্ছদ » লাইফস্টাইল » বিস্তারিত

মরিয়ম সেঁজুতি

অতিথি লেখক

শুভ্র কাশফুলের ছোঁয়ায় দুর্গা

২০১৫ অক্টোবর ০৮ ১৭:২২:৩৪
শুভ্র কাশফুলের ছোঁয়ায় দুর্গা

‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি, ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি, শরৎ তোমার শিশির ধোয়া কুন্তলে, বনের পথে লুটিয়ে পড়া অঞ্চলি, আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি’— ষড়ঋতুর এই অপরূপ দেশের অনেকটা জুড়েই যে শরতের সৌন্দর্য তার বর্ণনা কবিগুরু অত্যন্ত সুন্দরভাবে দিয়েছেন। আবার নীলাকাশ থেকে কখনো কখনো রবীন্দ্রনাথ মেঘবালিকার বিদায়ের কথা বলেছেন, মেঘ বলেছে যাব যাব।

শরতের মেঘ হয় শ্বেত শুভ্র। পেঁজাতুলোর মতো অনায়াস আনন্দে আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তার অলস ভ্রমণ। শরৎ ঋতুকে নিয়ে সিংহল রাজকন্যা খনার উক্তি হচ্ছে— ‘খনা বলে চাষার পো, শরতের শেষে সরিষা রো।’ এবারের শরৎ মেঘের চরিত্রই আলাদা। এ যেন বৃষ্টির গন্ধমাখা জলজ মেঘ। শরতের এই বেয়াড়াপনার কারণে শহুরে জীবনের প্রাত্যহিকতায় হঠাৎই যেন ছন্দপতন ঘটে। তবে এবারের ঈদের আমেজে যেমন কিছু ছন্দ ফিরে পেয়েছিল, তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আগমনের ধ্বনিতেও যেন রাজধানীর বুকে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পূজা নিয়ে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা।

‘আশ্বিনের মাঝামাঝি উঠিল বাজনা বাজি, পূজার সময় এলো কাছে। মধু বিধু দুই ভাই ছুটাছুটি করে তাই, আনন্দে দুই হাত তুলি নাচে’— রবিঠাকুরের এই কবিতার মাধ্যমেই বোঝা যায় দুর্গাপূজার সঙ্গে কাশফুলের যেন আত্মীয়তা রয়েছে।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী দুর্গা আসে কাশফুলকে সঙ্গী করেই। বাঙালীর বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে ঈদ ও দুর্গাপূজা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুটো উৎসবই আসে ত্যাগ ও আনন্দের বার্তা নিয়ে। শাস্ত্রীয় বিধানে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে ও চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষে দুর্গোৎসব পালন করা যায়। চৈত্রমাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা ও আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয় দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।

বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা অধিক জনপ্রিয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী বাংলা ভাষাভাষীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা হলেও কোথায়, কখন কীভাবে এর সূচনা হয় তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে অর্থাৎ প্রাচীনকাল থেকেই পাঞ্জাবের হরপ্পা ও সিন্ধুর মহেঞ্জোদারোতে দেবীর পূজা হতো। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং দেবীর পূজা করেছেন। ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, তৎকালীন শ্রীহট্ট বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেটে রাজা গণেশ পঞ্চদশ শতকে প্রথম মূর্তিতে দুর্গাপূজা করেন। ষোড়শ শতকে রাজশাহী অঞ্চলের রাজা কংশনারায়ণ দুর্গাপূজা করেন। পূর্বে রাজা-জমিদার-মহাজন তথা বিত্তবানরা আত্বীয়স্বজন সমন্বয়ে ধুমধাম করে দুর্গাপূজা করতেন। কালের বিবর্তনে সেই রাজাও নেই, জমিদারও নেই। তবে এখন ধনী-গরীব, গোত্র-বর্ণ সর্বোপরি সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে বর্তমানের দুর্গাপূজা।

সারাদেশে ২৪ হাজার ও ঢাকা মহানগরীতে ১৭৯টি পূজামণ্ডপে উদযাপিত হবে দুর্গাপূজা। মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হয় এই পূজা। মূলত মহালয়া বোধন আর সন্ধিপূজা- এই তিন পর্ব মিলেই দুর্গোৎসব। পুরাণ মতে, মহালয়ার মাধ্যমে শুরু হয় দেবীপক্ষের। এর আগের পক্ষ হল পিতৃপক্ষ। আর মহালয়ার প্রাক-সন্ধ্যায় অর্থাৎ শুক্লপক্ষের চতুর্দশীতে কাত্যায়ানী মুনির কন্যারূপে মহিষাসুর বধের জন্য দেবী দুর্গা জন্মগ্রহণ করেন। আবার কৃত্তিবাসী রামায়ণে জানা যায়, পদ্মযোনি ব্রহ্মার নির্দেশে রাবণ বধের জন্য রামচন্দ্র সাগরের বালুকাবেলায় আয়োজন করেছিলেন দেবী পূজার। এ সময় সাগরের গতিপথ দক্ষিণে সরে যায়। অর্থাৎ আশ্বিন মাস হচ্ছে সূর্যের দক্ষিণায়ন কালের অন্তর্ভুক্ত। এই সময়টি হচ্ছে দেবতাদের নিদ্র্রার কাল। রাবণ বধের কারণে রামচন্দ্র এই অকাল দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। এ জন্য একে অকাল বোধন বলে। আর মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথির সংযোগকালের সন্ধিক্ষণে আয়োজিত হয় সন্ধিপূজার। শাস্ত্রমতে, রাম তার স্ত্রী সীতাকে রাবনের কব্জা থেকে উদ্ধার কতে ১০৮টি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর পূজা করেছিলেন। রামের সেই বীরত্বকে স্মরণ করতেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষ এই পূজা করে।

শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজনে কুমারী পূজা এক ব্যতিক্রমী ব্যাঞ্জনা। অষ্টমী তিথিতে প্রতিমার বদলে শুদ্ধাত্মা ভগবতী মা দুর্গার প্রতীক হিসেবে জীবিত কুমারীকে ভক্তিভরে অঞ্জলি দেওয়া হয়। হিন্দু শাস্ত্রমতে, এক থেকে ষোলো বছরের মেয়েরা কুমারী হিসেবে পূজিতা হওয়ার যোগ্য। সব নারীতে মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার লক্ষ্য। যে দেবী সব নারীর মধ্যে বিরাজমান তাকে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্যই দুর্গাপূজার সঙ্গে এ পূজার আয়োজন করা হয়। রামকৃষ্ণ মিশন সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কুমারী পূজার জন্য একজন কুমারী এরই মধ্যে নির্বাচন করা হয়েছে। তবে তার পরিচয় পূজার দিন ব্যতীত জানা যাবে না।

ছবি : সংগৃহীত

(দ্য রিপোর্ট/ডব্লিউএস/এজেড/অক্টোবর ০৮, ২০১৫)