প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

যে সব আমলে মৃতদের উপকার হয়

২০১৫ অক্টোবর ০৯ ১৬:৪৭:২৪
যে সব আমলে মৃতদের উপকার হয়

প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত—এ ব্যপারে ঐকমত্যে উপনীত যে, মৃত লোকেরা জীবিত লোকদের দুই-ধরনের আমল দ্বারা উপকৃত হবেন। আর এটা হচ্ছে—

এক : মৃত লোকটি জীবিতাবস্থায় যে সৎকর্মের কারণ হয়েছিল।

দুই: মৃত লোকটি তার জীবনকালে যে কাজের কারণ ছিল না।

মৃতলোক তার জীবনকালে যে সৎকর্মের কারণ হয়েছিল সে কারণেই মৃত্যুর পরও তিনি তার ছাওয়াব পেতে থাকবেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিম্নোক্ত হাদিসের ভিত্তিতেই এমন কথা বলা হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন ‘যখন আদম সন্তান মারা যায়; তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি কাজ থেকে ছাওয়াব পেতে থাকেন। ছাদকায়ে জারিয়া। এমন সু-সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। বা এমন জ্ঞান— যার দ্বারা তার মৃত্যুর পরও মানুষ উপকৃত হয়’। [মুসলিম, হাদিস : ৩০৮৪; তিরমিযি, হা : ১২৯৭; নাসায়ী, হা : ৩৫৯১; আবু দাউদ, হা : ২৪৯৪, আহমদ, হা : ৮৪৮৯; দারিমী, হাদিস, ৫৫৮]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অপর এক হাদিসে বলেন : যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো উত্তম সুন্নাত (কর্ম পদ্ধতি বা পন্থা) আবিষ্কার করে সে জন্য সে তার প্রতিদান পাবে এবং তার মৃত্যুর পর যারা সে অনুযায়ী আমল করে সে জন্যও ছাওয়াব পাবে। তাদের ছাওয়াব কমিয়ে দেওয়া হবে না। [মুসলিম, হা : ১৬৯১; তিরমিযী, ২৫৯৯; নাসায়ী, হা : ২৫০৭, ইবনে মাজাহ, হা : ১৯৯]

এতদুভয় হাদিসে উল্লিখিত বিষয় দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন। কারণ তিনি নিজেই এ সবের কারণ ছিলেন। তেমনিভাবে মৃত ব্যক্তি নিম্নের হাদিসে বর্ণিত কর্ম ও জিনিস দ্বারাও উপকৃত হবেন। মুমিনের মৃত্যুর পর যে সব সৎকর্ম ও কাজের ছাওয়াব তার আমলনামায় যুক্ত হবে তা হল যে এলমের সে প্রচার করেছে বা শিক্ষা দিয়েছে। কিংবা যে সন্তান সে রেখে গিয়েছে। অথবা যে কোনো কুরআন শরীফ উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছে। অথবা কোনো মসজিদ নির্মাণ করেছে। অথবা পথচারী মুসাফিরদের জন্য যে মুসাফিরখানা তৈরি করে গেছে। অথবা কোনো নদী খনন করে জারি করে গেছে। অথবা তার জীবদ্দশায় ও সুস্থ্য অবস্থায় যে সাদকাহ তার সম্পদ হতে করেছে। এ সবের ছাওয়াব তার মৃত্যুর পর তার আমলনামায় যুক্ত হবে। [ইবনে মাজাহ, হা : ২৩৮ ও ইবনে হোযাইমা হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন]

এ সব হাদিস থেকে জানা যায় যে, মৃত ব্যক্তি জীবিত লোকদের যে সব সৎকর্মের কারণ ছিলেন তাদের সেই সব সৎকর্ম দ্বারা তিনিও উপকৃত হবেন।

মৃত ব্যক্তি জীবিতদের যে সব সৎকর্মের কারণ ছিলেন না সে ধরনেরও কিছু কর্ম দ্বারাও উপকৃত হবেন বলে হাদিস থেকে জানা যায়। মৃত ব্যক্তি জীবিতদের সব ধরনের সৎ কর্ম দ্বারা উপকৃত হবেন না। এমনকি জীবিতরা তার ছাওয়াব তার জন্য উৎসর্গ করলেও। কারণ দ্বীনের মূল নীতি হল, وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى ‘মানুষ কেবল তার ছাওয়াব পাবে যা সে নিজে করেছে।’

সুতরাং কেউ অন্যের সৎকর্ম দ্বারা উপকৃত হবে না। তেমনিভাবে কেউ কারো মন্দ কাজের বোঝাও বহন করবে না। وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ‘কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না।’ [ সূরা নজম, ৩৯]


এটাই হল ইসলামের সাধারণ বিধান। কেউ কারো সৎকর্ম দ্বারা উপকৃত হবে না তেমনিভাবে কাউকে অন্য কারো কুকর্মের বোঝাও বহন করতে হবে না। তবে এই সাধারণ বিধান থেকে কিছু জিনিস ব্যতিক্রম রয়েছে। এই ব্যতিক্রম আল কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং আল কুরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা জীবিতদের যে সব আমল দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন বলে প্রমাণিত তা ছাড়া অন্য কোনো আমল দ্বারা তারা উপকৃত হতে পারবেন এমন কথা বলা যায় না। কারণ বিষয়টি একটা গাইবি বিষয়। এ বিষয় কুরআন ও সহীহ হাদিস ছাড়া মনগড়া কথা বলার সুযোগ নেই। আমরা এখানে এরূপ কিছু কর্ম প্রসঙ্গে আলোচনা করছি।


১.) দোয়া : জীবিত লোকদের দোয়া দ্বারা মৃত লোকেরা উপকৃত হবেন। কারণ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন :

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ

‘আর যারা তাদের পর (মুহাজির ও আনসারদের পর) আগমন করেছে তারা বলে হে আমাদের পালন কর্তা আমাদের ক্ষমা করে দাও আর আমাদের যে সব ভাইয়েরা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছেন তাদেরকেও।’ [সূরা হাশর : ১০]

এ উম্মতের পরের লোকেরা পূর্বের মুমিনদের জন্য দোয়া এ জন্যই করেন যে তারা এ দোয়া দ্বারা উপকৃত হন। এ দোয়া দ্বারা উপকৃত না হলে আল্লাহ তাআলা এ দোয়ার কথা প্রসংশা হিসেবে আলোচনা করতেন না।
ওসমান ইবনে আফফান থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো মৃত মানুষের দাফন শেষ করতেন তখন পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন, তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য দোয়া করো এবং তিনি যেন সঠিক উত্তর দিতে পারেন সেই প্রার্থনা কর। কারণ সে এখন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে।’ [ আবু দাউদ, ২৮০৪]

বোরাইদা ইবনে হাছীব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসুল তাদেরকে শিখাতেন, তারা যখন কবরস্থানে যায়; তখন যেন বলেন:

وَالْمُسْلِمين [ وَالْمُسلمَات ] وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَاحِقُونَ. أسأَل الله لنا وَلكم الْعَافِيَة ‘السَّلَام عَلَيْكُم أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤمنِينَ
`তোমাদের ওপর শান্তিবর্ষিত হোক। হে মুমিন ও মুসলিম অধিবাসীগণ। আমরা ইনশাআল্লাহ অবশ্যই আপনাদের সাথে যুক্ত হচ্ছি। সুতরাং আমাদের নিজেদের জন্য এবং আপনাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ [মুসলিম, ১৬২০, নাসায়ী, ২০১৩, ইবনে মাজাহ, হা : ১৫৩৬, আহমদ, হা : ২১৯০৭] মুসলিমের বর্ণনায় আছে:
وَالْمُسْتَأْخِرِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ ‘السَّلَامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا
‘মুমিন মুসলিম কবরবাসীদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের মধ্যে যারা আগে চলে গেছেন আর যারা পরে আসবেন তাদের সকলকেই রহমত করুন। আমরাও ইনশাআল্লাহ তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি।’ [মুসলিম, খ : ২, পৃ : ৬৭০, হা : ১০৩]

এই হাদিস দুটিতে দেখা যায় যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত সাহাবীদেরকে মৃত লোকদের জন্য দোয়া করতে শিখিয়ে দিয়েছেন। আরও শিখিয়েছেন যে, কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যই হল কবরবাসীর জন্য দোয়া করা। আল্লাহ যেন তাদের ক্ষমা করে দেন এই প্রার্থণা করা। এ কারণেই উম্মতে মুসলিমা এ বিষয়ে ঐকমত্যে উপনীত যে, জীবিতদের দোয়া দ্বারা মৃতরা উপকৃত হন।

লেখক : বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, প্রফেসর, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

  • নোট : বুজুর্গ পাঠক, এই লেখকের এ সংক্রান্ত আরও কিছু লেখা ছাপব এ পাতায়। নজর রাখুন।

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/এইচএসএম/আরকে/অক্টোবর ০৯, ২০১৫)