প্রচ্ছদ » সাহিত্য » বিস্তারিত

উৎপল কুমার বসু : সূচনা পর্বেই আলাদা

২০১৫ অক্টোবর ০৯ ১৮:৩০:২১
উৎপল কুমার বসু : সূচনা পর্বেই আলাদা

মৃদুল দাশগুপ্ত

পুরভোটের সল্টলেক–ঝঞ্ঝা পেরিয়ে অফিসে আসছি, মোবাইলে মেসেজ ভেসে উঠল : উৎপলকুমার বসু আর নেই। তখনই কেমন মেঘলা হয়ে গেল চারদিক। ফোন আসতে থাকল। দক্ষিণ কলকাতার নার্সিংহোমে শনিবার দুপুরে মারা গেছেন। গত এক বছরে ছিলেন খুবই অসুস্থ, বারবার এই নার্সিংহোমে আসতে হয়েছে। গত বছর সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কৃত হলেন যখন, প্রতিক্রিয়া জানাতে অস্পষ্টভাবে একটি দুটি শব্দের বেশি বলতে পারলেন না।

১৯৬৯, ৭০। আমরা যখন সবে কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ, উৎপলকুমার তখন ছিলেন কিংবদন্তির কবি। তার ‘পুরী সিরিজ’ কাব্যগ্রন্থটি সে সময় কোহিনুর রত্নটির মতো এ ভারত–ভূম থেকে উধাও হয়ে বোধ করি উৎপলকুমারের সঙ্গে বিলেতেই অধিষ্ঠিত ছিল। কত খোঁজাখুঁজি করেছি সে বই। আশ্চর্যের ব্যপার, আলিপুরে জাতীয় গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে গিয়ে ওই বইয়ের নাম লিখে স্লিপ জমা দিতেই এক কর্মচারী টেবিলে দিয়ে গেলেন সবুজ রেক্সিনে বাঁধানো পুরী সিরিজ। হায়, সেকালে ছিল না জেরক্স মেশিন। হাতে লিখে কয়েকটি কবিতা নিয়ে আমরা কয়েকজন ‘গহ্বর প্রস্তুত সীতা, গহ্বর প্রস্তুত’ বলতে বলতে নকশালপন্থী ঠাসা আলিপুর জেলখানা পেরিয়ে চলে গেলেম। ওই সময় একবার তারাপদ রায়ের বাড়িতে গিয়েও তার বইয়ের তাক ঘাঁটতে চরম পুলকে পেয়ে যাই ওই বই, থুড়ি হীরকখণ্ডটি। গায়েব করে দেব–দেব ভাবছি, কিন্তু তারাপদদার ছোটভাইটি ছিলেন ঈষৎ অস্বাভাবিক, একটু হিংস্র ধরনের। তিনি হাত থেকে ছিনিয়ে দাদার বইয়ের তাকে যথাস্থানে রেখে হাসি হাসি হিংসুটে মুখে ঠায় বসে রইলেন। সে সময় উৎপলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘চৈত্রে রচিত কবিতা’ (১৯৫৬) ফের ছাপিয়েছিল কোনো একটি লিটল ম্যাগাজিন। কলেজ স্ট্রিটের পাতিরাম থেকে সেই পত্রিকাটি দৃশ্যত লুট হয়ে গেল।

পঞ্চাশ দশকের কৃত্তিবাস পত্রিকা ঘিরে যে তরুণ কবিদের উত্থান, তাদের তরুণতমটি, উৎপলকুমার ব্যতিক্রমী কাব্যভাষায় তির্যক, অথচ মাধুর্যে পরিপূর্ণ নাগরিকতায় সবুজ–ধূসর উভয় প্রান্তরে সূর্যাস্তের রঙ মিশিয়ে নিজেকে আলাদা চিহ্নিত করেছিলেন তার সূচনা পর্বেই। শক্তি–সুনীল–অলোকরঞ্জন–বিনয়, ৫০ দশকের বিবিধ বর্ণ বিচ্ছুরিত হীরকস্রোতোধারাটিকে এক কথায় উৎপল একটু ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। আমাদের বাংলা কাব্য ভাষায় আধুনিকতার পর্বে যুক্তি–শৃঙ্খল ছিন্ন করার ওই সূচনা। নচেৎ ‘তুমি জানু, তুমিই জানালা’ অর্থহীন এই কাব্যপঙ্ক্তিও কেন এত মোহময় হবে? অনেক কাল ধরেই আমার মনে হয়েছে, উত্তর আধুনিকতার সূত্রপাতও ঘটিয়েছেন উৎপল।

কৃত্তিবাসীদের দলটি থেকে শক্তি, উৎপল, কিছুটা বিনয়ও হাংরিদের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। ষাটের দশকের সেই হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনে, আপনারা জানেন, ধরপাকড়ও হয়েছিল। অশ্লীল সাহিত্য প্রয়াসের দায়ে উৎপল তার অধ্যপনার চাকরি খোয়ান। সন্দীপনের ভাষায় ‘এরোপ্লেনের বিচ্ছিরি ছায়া বুলিয়ে বিলেতে চলে’ যান।

বিলেতে বসে একটাও কবিতা লেখেননি। কেন তিনি লেখেন না?— আমার ভাবনা হত সে সময়। অলোকরঞ্জন তো জার্মানিতে বসেও লেখেন। প্রশ্নটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একবার করে ফেলি। সুনীল বলেছিলেন, ‘বিলেতে বাংলা ভাষাটাও তো চারপাশে শুনতে পায় না। বাংলা ভাষার আবহের মধ্যে নেই। মনে হয় তাই ও লেখে না।’

সে সময় শম্ভু রক্ষিত সম্পাদিত ‘ব্লুজ’ পত্রিকায় উৎপলকুমার বসুর একটি ছোট্ট গদ্য প্রকাশিত হয়। ওই লেখায় তরুণ কবিদের প্রতি তিনি বৈপ্লবিক আহ্বান জানান ভাষাশৃঙ্খলা ভাঙার। ওই লেখায় ব্রিটিশ কবিদের এক সভার বিবরণ দিয়েছিলেন তিনি। এক সাহেব কবিতা পড়ছেন, তার বেল্টের দুদিকে দুটি পিস্তল!

আমরা অনেকেই ভেবেছিলাম, উৎপলকুমার বুঝি ওইরকম। মাঝ ৭০ দশকে যখন বরাবরের জন্য ফের কলকাতায় ফিরে এলেন, কফি হাউসে আসবেন জেনে আমরা সেজেগুজে সদলে হাজির হলাম। উৎপল এসে বসে পড়লেন আমাদের মাঝখানটিতে। কিন্তু কোথায় সাহেবি পোশাক–আশাক! গোড়ালি দেখা যায় এমন পাজামায় ঘিয়ে রঙের হাফ পাঞ্জাবিতে একেবারে ভূগোলের মাস্টারমশাই লাগল তাকে। শুধু একটু পাইপ খান তামাক ভরে— এই যা। নিয়মিত কফি হাউসে আসতেন। আমাদের সখ্যে মেতে উঠলেন তিনি। স্বল্পবাক কিন্তু গল্পগাছায় সাবলীল। রসিক, তীর্যক মোচড় দিয়ে মাতিয়ে দিতেন। আর কত গল্প দেশ বিদেশের। কত বিষয়ে তার অনুসন্ধান। বিদেশে রুদ্ধ, কিন্তু বাংলায় ফিরে তার কবিতা পেল তুমুল স্রোতোধারা। ১৯৭৮–এ বের হল আবার পুরী সিরিজ, ১৯৮২–তে লোচনদাস কারিগর, ১৯৮৬–তে খণ্ডবৈচিত্রের দিন, ১৯৯৫–এ সলমা জরির কাজ, ১৯৯৬–এ কহবতীর নাচ, এর পর তুসু আমার চিন্তামণি, মীনযুদ্ধ, অন্নদাতা যোশেফ, সুখদুঃখের সাথী, গত বছর সাহিত্য অকাদেমি পেলেন ‘পিয়া মন ভাবে’ বইটির জন্য। গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার শেষ বই হাঁস চলার পথ। তার গদ্যের বই ‘ধূসর আতাগাছ’। বাংলা কবিতার কয়েকটি ধর্মগ্রন্থের প্রণেতা উৎপল। আর, ধর্মগ্রন্থের কোনো সমালোচনা হয় না।

মন মানে না বৃষ্টি হল এত/সমস্ত রাত ডুবো নদীর পাড়ে/আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙুল/স্পর্শ করি জলের অধিকারে। লিরিকেও তিনি মিশিয়েছেন মায়া। কবিতার ইতিহাস, টেকনিকের ইতিহাস— বলতেন তিনি।

কলকাতার ভবানীপুরে ১৯৩৯ সালে জন্মেছিলেন উৎপল। ছোটবেলা কেটেছে বহরমপুর আর বালুরঘাটে। স্কুলে পড়েছেন এই দুই শহরে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতায়। ভূগোলে স্নাতকোত্তর। স্ত্রী আর ছেলেকে রেখে গেছেন। তার স্ত্রীর নাম সান্ত্বনা, ছেলে ফিরোজ। বাহারউদ্দিনের সল্টলেকের বাড়ি থেকে একদিন নিজে গাড়ি চালিয়ে উৎপলকুমার আমাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন আমহার্স্ট স্ট্রিটে আজকাল অফিসে, আমার প্রাপ্তিগুলোর সর্বোত্তম এটি একটি ঘটনা।

আমাদের ‘আজকাল’ পত্রিকার ঘনিষ্ঠ সুহৃদজনের একজন ছিলেন উৎপলকুমার বসু। নিয়মিত লিখতেন, আসতেন। লোকমাতা দেবী নামে সমকালীন বিষয়, রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে তার তীর্যক রচনাগুলি বড়ই জনপ্রিয় হয়েছিল।

ফাঁকা ফাঁকা লাগছে খুব।

লেখক : পশ্চিম বাংলার বিশিষ্ট কবি।