প্রচ্ছদ » মুক্তমত » বিস্তারিত

সমাজ পরিবর্তনে মীনা

২০১৫ অক্টোবর ১০ ২০:৫০:৪৭
সমাজ পরিবর্তনে মীনা

লুৎফর রহমান সোহাগ

বাংলাদেশে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজ পালিত হয়েছে ‘মীনা দিবস’। প্রতিবছর ২৪ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হলেও এবার ঈদের ছুটির কারণে দিবসটি পিছানো হয়েছে। মীনা দিবসের এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম রয়েছে তা দূর করতেও মীনা’র মতো আরও চরিত্রের প্রয়োজন।

বাক্যটি অতি সরল হলেও, মীনা’র দীর্ঘ বছরের পদচারণার সফলতার চিত্রটিই উঠে এসেছে এ কথায়। মীনা সত্যিকার অর্থেই আমাদের সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এদেশের নারী শিক্ষা, বৈষম্য দূরীকরণ, বাল্যবিবাহ রোধে মীনাই প্রকৃত অর্থে সচেতনতা তৈরি করেছে। মীনা আমাদের প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতীক আর নায়কের প্রথাগত ধারণাকে ভেঙে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে নিজগুণেই।

মেয়ে শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার এ প্রতীকটি ১৯৯২ সালে নয় বছর বয়সী বালিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ওই সময়ে দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পুষ্টিহীনতা, বাল্যবিবাহ, যৌতুক কুসংস্কারাচ্ছন্ন দক্ষিণ এশিয়ায় মেয়েরা ছিল অবহেলিত। আর মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সার্ক ৯০ এর দশককে কন্যা শিশু দশক ঘোষণা করেছিল। এর আলোকেই ইউনিসেফ এর উদ্যোগে মেয়ে শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সমাজ সংস্কারক প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হয় মীনাকে, দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হয় ২৯টি ভাষায় মীনা কার্টুন, কমিক বই ও শিক্ষা উপকরণ।

স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা নির্মাণ ও ব্যবহার, বাল্যবিবাহ রোধ, শিশুদের সমান অধিকার, সব শিশুদের বাধ্যতামূলক শিক্ষা এ সবের প্রকাশ ঘটেছে মীনা কার্টুনে। মেয়েদের স্কুলে পাঠানো, কমবয়সী মেয়েদের বিয়ে থেকে স্কুলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, যৌতুক বন্ধ করা, ছেলে-মেয়ের সমান পুষ্টি ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, সমঅধিকারসহ মেয়ে শিশুদের প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্রটি কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, বিভেদ ও বৈষম্য দূরের বার্তা বিনোদনের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।

ডেনমার্কের আর্থিক সহায়তায় ফিলিপাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের এ্যানিমেশন স্টুডিও হান্না বারবারায় ১৯৯২ সালে মীনা কার্টুনের ১৩টি পর্ব নির্মাণ করা হয়। পরে ভারতের রামমোহন স্টুডিও ছাড়াও বাংলাদেশও তৈরি হয় মীনা কার্টুন। এ সব কার্টুন প্রচার করা হয় সার্কভুক্ত সাতটি দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে, কার্টুন ছবি নিয়ে বের হয় ২৩টি কমিক বইও।

বাংলাদেশে প্রথম ১৯৯৫ সালে বিটিভিতে মিনা কার্টুন দেখানো হয়। এ ছাড়াও রেডিও, ভ্রাম্যমাণ ফিল্ম, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে মীনা পৌঁছে গেছে দেশের আনাচে-কানাচে। ১৯৯৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটের অভ্যন্তরীণ বিনোদন কর্মসূচিতেও মীনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিলবোর্ড, শিক্ষা উপকরণ, দেয়ালচিত্র, রিকশা চিত্র, উপহার সামগ্রীতে মিনা হয়ে ওঠেছিল প্রধান চরিত্র। তবে কেবল বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মেয়ে শিশুদের কাছে সমাজ পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে মীনা তাদের ঘরের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে। এতেই বোঝা যায় মীনার প্রভাব কতটুকু।

বিনোদন, যুক্তি, সহজ ভাষা, বুদ্ধিমত্তা, সহযোগিতা ও সাহসিকতার কারণে মীনা কেবল শিশু নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও মুগ্ধ করেছে বছরের পর বছর। সমাজের দৃশ্যমান বিষয়গুলোর নানা অসঙ্গতি স্বার্থকতার সাথে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে মীনা প্রভাবিত করেছে সব বয়সী মানুষের। যা মানসিক পরিবর্তন সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বর্তমানে নারীদের শিক্ষায় এগিয়ে আসা, বাল্যবিবাহ রোধ, বৈষম্য দূরীকরণসহ নানা বিষয়ে সমাজের যে অগ্রগতি তার পিছনে মীনা’র ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না। মীনার অসম্ভব গ্রহণযোগ্যতার কারণেই ১৯৯৮ সালে সার্কের পক্ষ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরকে ‘মীনা দিবস’ ঘোষণা করা হয়। আর ২০০৫ সাল থেকে ইউনিসেফ বাংলাদেশ শিশুদের নিয়ে বা শিশুদের জন্য নির্মিত বিনোদনমূলক, সংবাদভিত্তিক ও জীবনধর্মী প্রতিবেদন, প্রকাশনা ও অনুষ্ঠানের জন্য মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড প্রদান করছে।

জাতীয় পর্যায়ে নারীর ব্যাপক উন্নতি সাধন হলেও কিছু বিষয়ে এখনো কাজ করার অনেক বাকি। ধর্ষণ, কর্মক্ষেত্রে হয়রানিসহ নানা কারণে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নারীরা পিছিয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে আবারও নায়কের ভূমিকায় মীনাকে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক