প্রচ্ছদ » অর্থ ও বাণিজ্য » বিস্তারিত

‘জ্বালানী ঘাটতির অর্ধেক চট্টগ্রামে’

২০১৫ অক্টোবর ১০ ২১:০১:৪৪
‘জ্বালানী ঘাটতির অর্ধেক চট্টগ্রামে’

দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : সারাদেশে জ্বালানীর যে পরিমাণ ঘাটতি হয়, তার অর্ধেকটাই চট্টগ্রামে হয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এ কারণে দেশী-বিদেশী বড় বড় কোম্পানিগুলো চট্টগ্রাম থেকে সরে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের। সমস্যা সমাধানে কুতুবদিয়া গ্যাস ফিল্ড, ফেনীর নাইকো ও মিয়ানামার থেকে গ্যাস আনার তাগিদ দেন তারা।

তবে সামনের দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে সারাদেশের গ্যাস সমস্যা সামাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

তিনি বলেন, সরকার পরিকল্পিত কারখানার জন্য জ্বালানী দেবে। প্রয়োজনে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ রেখে তা শিল্প-কারখানায় দিতে চাই।

রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে শনিবার ‘চট্টগ্রামের শিল্পায়ন : জ্বালানীর প্রাপ্যতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ সব কথা উঠে আসে। রাজধানীতে কর্মরত বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের সংগঠন চিটাগাং জার্নালিস্টস ফোরাম ঢাকা (সিজেএফডি) এ বৈঠকের আয়োজন করে।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নসরুল হামিদ বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানী নিয়ে অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেন। এই হতাশার মধ্যেই আমরা আশার আলো দেখব। এর আগে বাংলাদেশ কোথায় যাবে তার সঠিক পরিকল্পনা করা হয়নি।

তিনি বলেন, ২০ বছর আগেই যদি উন্নত বাংলাদেশের কথা চিন্তা করা হতো তাহলে এত সমস্যা হতো না। ফলে আমাদের এখনকার প্রয়োজন এখনই সমাধান করতে হচ্ছে, যে কারণে সব কাজ একসঙ্গে করতে গিয়ে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। এখন আমরা একটা নিশানা পেয়েছি। আগের দিনের বিতর্কে না গিয়ে আমরা পরিকল্পনা করে ভবিষ্যতে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে চাই।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের অভিজ্ঞ লোক ও নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর বড় একটা অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশেই এখন বিদ্যুৎ-জ্বালানী নিয়ে অনেক বড় প্রকল্প হচ্ছে। প্রকৌশলীদের দেশের কল্যাণে সেখানে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের বিশাল কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। সেটা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। আশা করছি, আগামী দু’বছরের মধ্যে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

নসরুল হামিদ বলেন, আবাসিক এলাকার গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে এলপিজির ব্যবহার বাড়িয়ে এবং সিএনজিতে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই গ্যাস দিয়ে শিল্প-কারখানায় সরবরাহ করা হবে। এতে শিল্পে গ্যাসের সঙ্কট অনেকটাই কমে যাবে। এ ছাড়া আমরা এলএনজিও নিয়ে আসছি।

এ সময় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানী উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সামসুল আলম প্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, কেবিনেটে আপনারা আগে ঘোষণা দেন, নিজেরা নিজেদের বাসার গ্যাস সংযোগ কেটে দেবেন। তাহলে আমরাও আমাদের গ্যাস সংযোগ সারেন্ডার করব। তার এমন কথায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা ভাল প্রস্তাব। আলোচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুরনো হওয়ায় আমাদের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা কমছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের অডিট চলছে। এটা শেষ হলে পুরনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। শিল্পে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী কীভাবে করা যায় তা নিয়েও জরিপ করা হবে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী শিল্প চাই। দীর্ঘমেয়াদী বিদ্যুৎকেন্দ্রের দিকে যাওয়া এবং সঠিক জ্বালানী সরবরাহ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আগামীতে পাইপলাইন ও বোতলের গ্যাসের দামের সমন্বয় করা হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, এলএনজি (তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আসতে সময় লাগবে। এটা কবে আসবে তা সুনির্দিষ্ট করে সরকারকে বলতে হবে। গ্যাসের সঙ্কট হলে সামনে আছে কয়লা। আরেকটি হল ফার্নেস তেল। ভারতে তুষ দিয়ে বহু বয়লার চালানো হচ্ছে। দরকার হলে আমাদেরও সেটা করতে হবে। অর্থ্যাৎ যখন যে জ্বালানী ব্যবহার আমাদের জন্য সুবিধা হবে তখন সেটা আমাদের ব্যবহার করতে হবে।

তিনি বলেন, শিল্প-কারখানায় বয়লারের দক্ষতা ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ। এটাকে আরও বাড়াতে হবে। ন্যূনতম দক্ষতা অন্তত ৭৫ শতাংশ হওয়া দরকার। বিদ্যুৎ-জ্বালানী নিয়ে সরকারের পরিষ্কার পরিকল্পনা জনগণ ও ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে ধরতে হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুব আলম বলেন, চট্টগ্রামকে নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। ব্যবসায়ের উন্নয়নে চট্টগ্রামের সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বন্দর সুবিধা আর ভারী শিল্পের জন্য অনুকূল হওয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু সাঙ্গু গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ ও সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্র থেকে কাঙ্ক্ষিত গ্যাস না পাওয়ায় চট্টগ্রামকেন্দ্রিক গ্যাস উৎপাদন অনেকটা কমে গেছে। অন্যান্য গ্যাসক্ষেত্র থেকে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপও পাওয়া যায় না। ফলে চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে।

আয়োজক সংগঠন সিজেএফডির সভাপতি ও সকালের খবরের প্রধান প্রতিবেদক সাইফ ইসলাম দিলালের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন- পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. সেলিম মাহমুদ, বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. আহমেদ কায়কাউস, পেট্রোবাংলার পরিচালক জালাল আহমেদ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম, সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি মনোয়ারা হাকীম আলী, মঈনুল আহসান, সিজেএফডির সদস্য শাহেদ সিদ্দিকি প্রমুখ।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনডিপেনডেন্ট টিভির হেড অব নিউজ রুম এডিটর মামুন আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক দিয়ে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ নগরী। কিন্তু সেখানে চাহিদার তুলনায় অনেক কম গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গত দুই দশক ধরে এই বৈষম্যের শিকার চট্টগ্রাম।

(দ্য রিপোর্ট/একেএস/এজেড/অক্টোবর ১০, ২০১৫)