প্রচ্ছদ » সম্পাদকীয় » বিস্তারিত

নিঃশব্দে চলে গেল সুলতানের তিরোধান দিবস

২০১৫ অক্টোবর ১১ ০০:০৬:৪৪

শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি এস এম সুলতান নামে দেশে এবং বিদেশে সমধিক পরিচিত। জন্ম আগস্ট ১০, ১৯২৩ সালে সাবেক যশোর জেলার নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে। জীবনাবসান ৭১ বছর বয়সে অক্টোবর ১০, ১৯৯৪ সালে যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। সমাহিত নড়াইলের চিত্রা নদীর পাড়ে নিজ কুটিরে। সুলতান ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। তার চিত্রকর্মের মূলধারায় রয়েছে পূর্ববাঙলার প্রকৃতি ও গ্রামীণ সভ্যতা। এই সভ্যতার মূল ভিত্তি কৃষি এবং কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের চিত্রনাট্য। শিল্পের মৌলিকতায় তিনি শুধু বাংলাদেশের নন, বিশ্ব দরবারের একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী। বিশ্বজুড়ে এক মৌলিক কৃষি সভ্যতার উত্তরাধিকার তিনি। তার অনন্য শিল্পকর্ম ফার্স্ট প্লান্টেশন যেন দাবি করে কৃষি সভ্যতার আদি উৎসভূমি আর কোথাও নয়, পলিবাহিত এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপেই ।

নিজের এবং নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে সুলতান বলতেন, ‘আমি আমার বিশ্বাসের কথা বলছি। আমার সকল চিন্তা, সবটুকু মেধা, সবটুকু শ্রম দিয়ে যা কিছু নির্মাণ করি তা কেবল মানুষের জন্য, জীবনের জন্য, সুন্দর থেকে সুন্দরতম অবস্থায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার ছবির মানুষেরা, এরা তো মাটির মানুষ, মাটির সঙ্গে স্ট্রাগল করেই এরা বেঁচে থাকে। এদের শরীর যদি শুকনো থাকে, মনটা রোগা হয়, তাহলে এই যে কোটি কোটি টন মানুষের জীবনের প্রয়োজনীয় বস্তুসকল আসে কোত্থেকে? ওদের হাতেই তো এ সবের জন্ম। শুকনো, শক্তিহীন শরীর হলে মাটির নিচে লাঙলটাই দাব্বে না এক ইঞ্চি। আসলে মূল ব্যাপারটা হচ্ছে এনার্জি, সেটাই তো দরকার। ওই যে কৃষক, ওদের শরীরের এ্যানাটমি আর আমাদের ফিগারের এ্যানাটমি, দুটো দুই রকম। ওদের মাসল যদি অত শক্তিশালী না হয় তাহলে দেশটা দাঁড়িয়ে আছে কার উপর? ওই পেশীর উপরেই তো আজকের টোটাল সভ্যতা।’

সুলতান তার জীবনের পরিপূর্ণতা নিয়ে এই ভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।’

শিল্পী হিসেবে সুলতান এই জন্য আমাদের জন্য গর্বের নন যে, লন্ডনে পিকাসো মার্টিন ও সালভাদর দালির সঙ্গে তার শিল্পকর্মের যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে। বরং গর্বটা এই জন্য যে, নিজের বিশ্বাস, নিজের জীবনযাপন এবং নিজের সৃষ্টিতে সুলতান ছিলেন এমন এক সভ্যতার ধারক যে সভ্যতাকে বিলুপ্ত করার জন্য আজকের পুঁজিবাদী বিশ্ব যেন মরিয়া। শনিবার একপ্রকার নিঃশব্দেই চলে গেল এই মহান শিল্পীর তিরোধান দিবস।