প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

উপমহাদেশে মুদ্রা : শুরু যেখান থেকে

২০১৫ অক্টোবর ১১ ১৮:৫৯:৪৮
উপমহাদেশে মুদ্রা : শুরু যেখান থেকে

সোহেল রহমান : কথায় বলে, টাকায় কী না হয়? সারা বিশ্বই এখন চলছে যেন ‘টাকার জোরেই’! জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মানুষও তাই প্রতিনিয়ত ছুটছে টাকার পেছনে। কবির ভাষায়— ‘টাকার আমি, টাকার তুমি/ টাকাতে যায় সব কেনা/ টাকার রঙে রক্ত গরম/ টাকাতেই যায় দেশ চেনা।’

আর্থিক লেনদেনের শুরুটা কিন্তু হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের ধাতব মুদ্রার মাধ্যমে। পরবর্তীকালে সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে মানুষ তৈরী করেছে কাগজী মুদ্রা বা টাকা।

অবশ্য আদিম যুগে মানুষ তার প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত বা কিনত পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে। তখন বেচা-কেনা চলত নিজের সংরক্ষিত বাড়তি পণ্যের বিনিময়ে। বিনিময় মাধ্যম হিসেবে তখন ব্যবহৃত হতো শস্য, গরু কিংবা ঘোড়া। কিন্তু এভাবে এক জিনিসের সঙ্গে অন্য জিনিস বদলা-বদলী করার যে অসুবিধা অনেক— এটা বুঝতে আদি যুগের মানুষের খুব বেশীদিন সময় লাগেনি। ধাপে ধাপে এ কাজে ব্যবহৃত হতে লাগল পাথর, নুড়ি ও কড়ি ইত্যাদি।

পরবর্তীকালে মানুষ যখন ধাতু আবিষ্কার ও এর ব্যবহার শিখল— তখন থেকে ধাতু নির্মিত মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। বিশেষত বিভিন্ন দেশের সওদাগর ও বণিকেরা এক ভূ-খণ্ড থেকে অন্য ভূ-খণ্ডে পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন ধরনের ধাতব তথা সোনা, রূপা ও তামা নির্মিত মুদ্রা ব্যবহার করত। অবশ্য এগুলোর নাম ‘মুদ্রা’ রাখা হয়েছে আরও অনেক পরে। সেই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ধাতব মুদ্রার ব্যবহার প্রচলিত রয়েছে।

মানুষের শেকড় অনুসন্ধান তথা মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রামাণিক বস্তু হচ্ছে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ধাতব মুদ্রা, শিলালিপি, প্রাচীন পাণ্ডলিপি ও মানুষের ব্যবহার্য বস্তু। প্রাচীন ইতিহাস জানার জন্য ইতিহাসবিদরা সাধারণত মুদ্রাকেই অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে থাকেন। কারণ মুদ্রায় সময়কাল উল্লেখ থাকে।

উপমহাদেশে মুদ্রার ব্যবহার : এই উপমহাদেশে মুদ্রার ব্যবহার কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে এতদ অঞ্চলের আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার বছরের সুদীর্ঘ সময়কালে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর পরিচয় ও ঐতিহাসিক তথ্যসমূহের অধিকাংশই প্রত্নতত্ত্ব বিশেষতঃ ধাতব মুদ্রার মাধ্যমেই আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীন মৌর্য বংশ (আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৪-১৮৬) থেকে শুরু করে মধ্যযুগের তুর্কী বিজয়ের খিলজী শাসন, খিলজী শাসন থেকে মোগল সম্রাট শাহ্ আলম পর্যন্ত এবং পরবর্তীকালে বৃটিশ-ভারত যুগ শেষে বর্তমান কালের বাংলাদেশ পর্যন্ত ইতিহাসের পর্যায়-ক্রমিক ধারার সাক্ষী বিভিন্ন সময়ের ধাতব মুদ্রা।

এক সময়ে পণ্ডিতমহলের ধারণা ছিল যে, গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ভারত ঘুরে (খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৭) যাওয়ার পরেই এ অঞ্চলে মুদ্রা চালু শুরু হয়েছে।

কিন্তু পরবর্তীকালে রোম ঐতিহাসিক ‘কুইন্টস কার্টিয়াস’-এর লেখা থেকে জানা যায় যে, আলেকজান্ডার ভারতের তক্ষশীলা নগরে পৌঁছালে সেখানকার রাজা অন্তি তাঁকে ৮০ ট্যালেন্ট মূল্যের ‘ছাপযুক্ত’ রূপা উপহার দিয়েছিলেন। সুতরাং বলা যায়, আলেকজান্ডার ভারতে আসার আগে থেকেই এ অঞ্চলে মুদ্রার প্রচলন ছিল।

এ ছাড়া এ অঞ্চলের হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈনদের সর্ব প্রাচীন ধর্মগ্রন্থগুলোতেও সোনা, রূপা ও তামার মুদ্রা ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

প্রাচীনকালে স্বর্ণমুদ্রাকে ‘সুবর্ণ’ বা ‘নিষ্ক’ (এক ধরনের অলঙ্কার), রূপার মুদ্রাকে ‘পুরাণ’ বা ‘ধরণ’ ও তামার মুদ্রাকে ‘কার্যাপণ’ বলা হতো। এ ছাড়া ধাতুচূর্ণও বিনিময় মাধ্যম হিসেবে চালু ছিল। সোনা, রূপা ও তামা ওজন করার পৃথক পৃথক রীতি ছিল। তবে সকল ক্ষেত্রেই ওজনের প্রারম্ভিক একক ছিল ‘রতি’ বা ‘রতিকা’।

সাধারণভাবে মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসাবশেষ থেকে সে সময়ের লিপিযুক্ত যেসব চৌকোণ তামার মুদ্রা পাওয়া গেছে, সেগুলোকেই অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন পয়সা বলে মনে করা হয়। পরবর্তীকালে পুণ্ড্রুবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ে সম্রাট অশোকের আমলের একটি শিলালিপি পাওয়া যায়— যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শিলালিপি নয়, মহাস্থানগড়ে খননকার্যের মাধ্যমে পাওয়া গেছে মৌর্যযুগের ‘ছাপযুক্ত ছাঁচে ঢালা মুদ্রা’ এবং উত্তর-ভারতের এনবিপিপি (নর্থ ব্লক পলিশ্ড পটারি) পাতের ভগ্নাংশ ও মূল্যবান পাথরের গুটিকা। এগুলো সাধারণত খ্রীষ্টপূর্ব ৪০০ থেকে ২০০ অব্দ পর্যন্ত চালু ছিল।

এ ছাড়া বাংলাদেশে নরসিংদী জেলার রায়পুরায় উয়ারী বটেশ্বর এলাকায়, কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ী অঞ্চল খননকালে ও শালবন বিহারে বিভিন্ন আমলের চার শতাধিক প্রাচীন মুদ্রা পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে ১৮টি স্বর্ণমুদ্রা, ৩৫০টিরও বেশী রৌপ্যমুদ্রা ও কিছু তাম্রমুদ্রা রয়েছে।

বিভিন্ন আমলে মুদ্রার বৈশিষ্ট্য রকম-ফের : প্রাচীন যুগে চৌকো মুদ্রার প্রচলনই বেশী ছিল। পাতলা রূপা বা তামার পাত কেটে টুকরো করে এগুলোতে নানারকম চিহ্ন দিয়ে মুদ্রা তৈরী করা হতো।

প্রথম-দ্বিতীয় শতকে ইন্দো-ক্যাকট্রিয়ানদের অনুপ্রবেশের আগে এ অঞ্চলের বেশীরভাগ মুদ্রাই ছিল রূপার তৈরী। তখন স্বর্ণমুদ্রা তেমন একটা তৈরী হতো না বললেই চলে। এর কারণ হচ্ছে, প্রাচীন যুগের সভ্যতাগুলোর মধ্যে কেবল এই উপমহাদেশেই সোনার মূল্যমান কম ছিল। সে সময় এখানকার মানুষ সোনা রফতানি করে এর বিনিময়ে আনত রূপা।

মৌর্য আমলে রূপার তৈরী চার ধরনের মুদ্রার কথা জানা যায়। এগুলো হচ্ছে— পান, অর্ধপান, পদপান-এর সিকিভাগ ও অষ্টভাগ বা অর্ধপদিকা। এর মধ্যে ‘পান’ (এটাকে আবার কর্ষপান-ও বলা হতো) নামক মুদ্রাটি সারা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিল। এর ওজন ছিল ৫০ থেকে ৫২ গ্রেন্ড। এ ছাড়া কখনো কখনো গোটা মুদ্রাটিকে অর্ধেক করে কেটে টুকরা দু’টি অর্ধেক মূল্যে চালানো হতো।

স্বর্ণমুদ্রার প্রথম প্রচলন লক্ষ্য করা যায় বৈদিকযুগে। এ যুগের মানুষ প্রথমে অলংকার হিসেবে সোনা ব্যবহার করত। পরবর্তীকালে এটাই তাদের বিনিময় মাধ্যম হয়ে উঠে। প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টপূর্ব ৩৫০ অব্দে এ অঞ্চলের একটি হিন্দু প্রদেশ ‘এ্যাফিমেনিড’ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হলে তাকে ওই সাম্রাজ্যের রাজকোষে প্রতি বছর ৩০০ ট্যালেন্ট সোনাচূর শ্রদ্ধার্ঘ হিসেবে দিতে হতো।

স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন বেড়ে যায় গুপ্তযুগে। এ যুগের সম্রাট ও শাসকরা ব্যাপকহারে স্বর্ণমুদ্রা বাজারে ছেড়েছিলেন। গুপ্তযুগে স্বর্ণমুদ্রাকে ‘দীনার’ নামেও অভিহিত করা হতো। নামটি এসেছিল রোমান মুদ্রা ‘দীনারিয়াস’ থেকে। গুপ্তযুগের মুদ্রাগুলো বাজারে চালু ছিল ৫২৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। অন্যান্য রাজবংশের তুলনায় এ যুগের স্বর্ণমুদ্রার শিল্পোৎকর্ষ ছিল বেশী।

পরবর্তীকালে হুনদের আমলে ছোট ছোট অঞ্চলের রাজারা নিজেদের নামে স্বর্ণমুদ্রা চালু শুরু করলে বাজারে সোনার ঘাটতি দেখা দেয়। আর অধিক সংখ্যক স্বর্ণমুদ্রা চালু হওয়ার কারণে মুদ্রার নান্দনিক মানও কমতে থাকে।

গুপ্তযুগের মুদ্রা কালচারের ছিটেফোঁটা পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়েছিল গৌড়ীয় বঙ্গেও। রাজা সমাচার দেব থেকে শুরু করে শশাঙ্কের আমল পর্যন্ত বাংলার প্রচলতি মুদ্রাগুলোতে গুপ্তযুগের শৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

প্রাচীন যুগের মুদ্রাগুলোতে যে-সব নক্সা বা ছবি অংকিত রয়েছে এগুলোর বেশীরভাগেই মুদ্রা প্রচারকদের ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। প্রাচীন হিন্দু রাজাদের মুদ্রায় থাকত নানা দেব-দেবী, গরু, ঘোড়া, সিংহ ও ময়ূরের ছবি। বৌদ্ধ রাজাদের মুদ্রায় চৈত্য, বোধিদ্রুম, ত্রিরত্ন ও ধর্মচক্র ইত্যাদি চিহ্ন আঁকা থাকত। আর জৈন ধর্মাবলম্বী রাজাদের মুদ্রায় উল্লেখযোগ্য প্রতীক ছিল স্বস্তিক, হাতী বা বৃষ ইত্যাদি।

শালবন বিহারে গুপ্তযুগের যে দু’টি স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে এর একটি সমুদ্র গুপ্তের (৩৩৫-৩৭৫ খ্রীষ্টাব্দ) এবং অন্যটি সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্তের (৩৭৫-৪১৫ খ্রীষ্টাব্দ) আমলের। প্রথম মুদ্রাটিতে পরাক্রম অশ্বমেধের ছবি এবং দ্বিতীয়টির একপিঠে ধনুক হাতে রাজার প্রতিকৃতি ও অপরপিঠে লক্ষ্মী দেবীর প্রতীক আছে। এ ছাড়া যে-সব রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া গেছে সেগুলোর অধিকাংশেরই একপিঠে ষাঁড় এবং অপরপিঠে ত্রিরত্ন বা ত্রিশূলের ছবি ও ছবির উপরে আছে গোলাকার সূর্য ও প্রায় পঞ্চমী চন্দ্রের প্রতিকৃতি।

পরবর্তীকালে মুদ্রার গায়ের এ-সব ছবি পাল্টে যায় মুসলিম শাসকদের আমলে। এ সময় মুদ্রার গায়ে কারও ছবি ও শিল্পকৃতির পরিবর্তে আরবী বা ফারসী হরফে মুদ্রার দুই পিঠে রাজার নাম ও মুদ্রার মূল্যমান লেখা হতে থাকে।

মুসলিম শাসকদের মধ্যে গিয়াস উদ্দীন তুঘলকের ছেলে মুহম্মদ বিন তুঘলক ছিলেন কিছুটা ভিন্ন চিন্তা-চেতনার। তিনি প্রায় ২৫ ধরনের মুদ্রা চালু করেছিলেন। তার টাকশাল ছিল ৯টি। নির্মিত মুদ্রাগুলোর ক্যালিগ্রাফি ছিল চমৎকার। তবে তাঁর কিছু খেয়ালীপনাও ছিল। সিংহাসন দখল নিয়ে পিতাকে হত্যা করে তিনিই আবার মৃত বাবার নামে মুদ্রা চালু করেছিলেন। তাঁর আমলে মুদ্রার ওজন নিয়ে টুকটাক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়। তামার মুদ্রা চালু করে তিনি বেশ সমস্যায় পড়েছিলেন। তামার মুদ্রা নকল হয়ে যায় পাইকারী হারে। বাধ্য হয়ে গাঁটের পয়সা খরচ করে বাজার থেকে আসল-নকল সকল তামার মুদ্রা কিনে তা তুলে দেন।

পরবর্তীকালে মোগল আমলে বিভিন্ন দেশীয় বংশের শাসনকালে বিভিন্ন রকম মুদ্রার প্রচলন ঘটে। ক্রমে ক্রমে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের বণিক গোষ্ঠী (পর্তুগীজ, হল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফরাসী, ইংরেজ) এ অঞ্চলে আগমন করে স্বীয় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে নতুন নতুন মুদ্রা বাজারে ছাড়তে থাকে। এ সময় দেশীয় মুদ্রার ঘরানাগুলোও ক্রমশঃ বদলে যেতে থাকে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরও ব্রিটিশদের মুদ্রা এ অঞ্চলে অনেকদিন টিকেছিল। পরবর্তীকালে ভারত ও পাকিস্তান নিজ নিজ দেশীয় মুদ্রা চালু করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশী টাকা ও মুদ্রা বাজারে ছাড়া হয়।

(দ্য রিপোর্ট/এসআর/আইজেকে/সা/অক্টোবর ১১, ২০১৫ )