প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

প্রয়োজনে সংশোধন হবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র

২০১৫ অক্টোবর ১২ ২১:০০:২৯
প্রয়োজনে সংশোধন হবে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র

বাহরাম খান,দ্য রিপোর্ট : দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকারের সকল স্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হবে বলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে দুই মন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে কথা বলে এই তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রিসভার নিয়মিত এই বৈঠকে স্থানীয় সরকার সংশ্লিষ্ট পাচঁটি আইন (সংশোধন) এক সঙ্গে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী দেশে ৪৫৫০টি ইউনিয়ন, ৪৮৮টি উপজেলা, ৬৪টি জেলা, ১০টি সিটি করপোরেশন রয়েছে।

প্রস্তাবিত এই সংশোধন আইনগুলো জাতীয় সংসদে পাস হলে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বার, উপজেলার চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান-মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র-কমিশনার, সিটি করপোরেশনের মেয়র-কমিশনার ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি নিজেদের দলীয় প্রার্থী দিতে পারবে। অবশ্য স্বতন্ত্র হিসেবেও যে কেউ নির্বাচনী আইন মেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্তরা রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সেই প্রতীক নিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়— স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়নপ্রাপ্তরা নৌকা প্রতীক ব্যবহার করবেন। বিএনপি সমর্থিতরা ব্যবহার করবেন ধানের শীষ প্রতীক।

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যেকোনো বিষয়েরই ভাল-মন্দ দিক থাকে। এর ব্যবহারটা কীভাবে করবেন সেটাই মূল কথা। তবে, এতে সাধারণ মানুষের উপকারের চেয়ে দলের উপকারই বেশি হবে।’

বাংলাদেশে পাঁচ স্তরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়। এগুলো হল— ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে জেলা পরিষদ নির্বাচন ছাড়াই সরকারের পছন্দের প্রশাসকদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের দাবি উঠেছে বিভিন্ন পর্যায় থেকে। দলটির গঠনতন্ত্রের ‘অঙ্গীকার’ শীর্ষক অংশে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

এর ছয় নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘তৃণমূল পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার সকল স্তরে জনগণের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়িয়া তোলা।’

আওয়ামী লীগের গত নির্বাচনের ইশতেহারে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তনের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। ইশতেহারের ‘আমাদের লক্ষ্য ও ঘোষণা’ অংশের ১.৭ এ জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পরিষদের কাছে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন-শৃঙ্খলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচী স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা হবে।’- বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।

উল্লিখিত প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ইশতেহারে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। এখন নির্বাচন প্রক্রিয়া সংশোধন করে দলীয় ভিত্তিকেই শক্তিশালী করতে চাচ্ছেন তারা। এতে জনগণের কোনো উপকার হবে না। দলের উপকার হবে।

দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ভিত মজবুত হবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন।

নূহ-উল-আলম লেনিন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ এই বিষয়টি বাস্তবায়নে কাজ করছিলাম। এতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় ভণ্ডামি দূর হবে বলে মনে করি। তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্র আরও সুসংহত হবে।’

নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের পদ্ধতির বিষয়ে দলটির সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সভার এই সদস্য জানান, আইনটি সংসদে পাস হলে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলবিধি সংশোধন করবে। এরপর দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি নির্ধারণ করা যাবে।

মন্ত্রিসভায় উপস্থিত থাকা একজন মন্ত্রী জানান, বৈঠকে এই বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়ে নির্বাচনের পদ্ধতির প্রসঙ্গটি তোলেন। এতে দলীয়ভাবে প্রার্থী নির্ধারণে দলগুলো আলাদাভাবে নিজেদের পদ্ধতি বের করে নিবে বলে প্রধানমন্ত্রী মত দেন। এতে করে প্রার্থী বাছাইয়ে কী ধরনের পদ্ধতি নেওয়া হতে পারে এমন প্রসঙ্গ তোলেন মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। এই বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ইউনিয়ন-পৌরসভা-উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের আদলে বোর্ড গঠন করা হবে। প্রয়োজনে দলের গঠনতন্ত্রও সংশোধন হতে পারে।

দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলম হানিফ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এটা দীর্ঘদিনের জনদাবি ছিল। মন্ত্রিসভা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের দাবিকে বাস্তবে রূপান্তর করেছে। এখন আগামী নির্বাচনগুলোতে এর প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখা যাবে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কীভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিবে এই বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে হানিফ বলেন, ‘এটা দলীয় ফোরামে আলোচনা হবে। কীভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দিলে ভাল হয় তার সিদ্ধান্ত পরে আমরা জানাব।’

মন্ত্রিসভা বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সিদ্ধান্তকে প্রশংসা করে বক্তব্য রাখেন বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। একে ‘যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে মেনন বলেন, ‘বহু প্রতীক্ষিত এই সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করবে। আগে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হলেও সব দলই তাদের পছন্দের প্রার্থী দিত। এখন আইনগত ভিত্তি তৈরী হওয়ায় আর কোনো ছল-ছাতুরির প্রয়োজন হবে না।’

সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলী খান টেলিফোনে মন্তব্য দিতে রাজী হননি।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মোবারক বলেন, ‘সরকার যে আইন করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমার তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। সাধারণত কোনো দেশেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর থাকে না। কিন্তু আমাদের দেশে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়।’ তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধন বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে নির্বাচন কমিশনকে কোনো কিছু জানানো হয়নি। এবং নির্বাচন কমিশনও কোনো মতামত দেয়নি বলেও জানান তিনি।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/আইজেকে/সা/অক্টোবর ১২, ২০১৫)