প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

রেজোয়ান আহমেদ

দ্য রিপোর্ট

’৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি

সালমান এফ রহমানের মামলা ট্রাইব্যুনালে

২০১৫ অক্টোবর ১৩ ২১:৫০:০০
সালমান এফ রহমানের মামলা ট্রাইব্যুনালে

১৯৯৬ সালে শেয়ারবাজারে কারসাজি ও জালিয়াতির অভিযোগে বিশিষ্ট শিল্পপতি এবং আওয়ামী লীগ সভাপতির শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুই মামলা পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে মামলা দু’টি ট্রাইব্যুনালে চালুর বিষয়টি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ দু’টি মামলাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

১৯৯৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে কারসাজির মাধ্যমে অস্বাভাবিক হারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারে দর বেড়ে যায়। পরে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামে। কয়েক লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারান। ওই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে শাইনপুকুর হোল্ডিংস ও বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ারের দরবৃদ্ধিতে সালমান এফ রহমানসহ কয়েকজনের যোগসাজশের অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগে সালমান এফ রহমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে দু’টি মামলা দায়ের করে তৎকালীন সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশের কয়েকজন শেয়ার ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আরও ১৫টি মামলা করে এসইসি।

ওই মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে সালমান এফ রহমান দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘মামলা দু’টি উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। এ মামলা দু’টি ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা নয়। যদি এমনটি হয়ে থাকে তাহলে সেটি হবে ভুল।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘স্থগিত মামলাগুলো চালু করার জন্য বিএসইসির আইন বিভাগ কাজ করছে।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সালমান এফ রহমানের মামলা দু’টি চালু করতে অনেক সময় লাগবে। কারণ, তার মামলা দু’টি এখন আপিল বিভাগে রয়েছে। যেখানে এ মামলার চেয়ে শতগুণ গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য মামলা রয়েছে। হাজার হাজার মৃত্যুদণ্ডের মামলাও রয়েছে। সেখানে এ ধরনের মামলার গুরুত্ব অনেক কম।’ তবে আগামী নভেম্বরে মামলাগুলো চালুর বিষয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘স্থগিত মামলা চালু হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারাধীন। তবে মামলা চালু করার জন্য বিএসইসি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।’

১৯৯৭ সালে মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তৎকালীন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক এম এ রশিদ খান বাদী হয়ে সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে এ দু’টি মামলা দায়ের করেন। ওই সময়ে মামলা দু’টির নম্বর ছিল— ১০৭৬/১৯৯৭ ও ১০৮০/১৯৯৭। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালে তা মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ওই সময়ে নতুন করে মামলা নম্বর দেওয়া হয়। মামলা দু’টির নম্বর হয়—

৫৫৯/১৯৯৯ ও ৫৬১/১৯৯৯। এরপর চলতি বছরের জুনে পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চালু হলে দায়রা আদালত থেকে তা ফের স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আবার মামলা দু’টির নতুন নম্বর দেওয়া হয়— ৬/২০১৫ ও ১১/২০১৫।

৬ নম্বর মামলার আসামি হলেন— শাইনপুকুর হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি সিদ্দিকুর রহমান।

আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত কোম্পানি ও আসামিরা ১৯৯৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে শেয়ার জালিয়াতি কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। যা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) তদন্ত কমিটির তদন্তে শনাক্ত হয়।’

বিএসইসির তদন্তে জানা যায়, শাইনপুকুরের ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে কোম্পানির শেয়ার দর ব্যাপকহারে বেড়ে যায়।

শাইনপুকুর হোল্ডিংসের ১০০ টাকা মূল্যের শেয়ার ৩০ জুন ১৯৯৬ সালে ছিল ৭৩ টাকা। এরপরে যথাক্রমে একই বছরের ৩১ জুলাই ৯৪ টাকা, ৩১ আগস্ট ১৬৮ টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বরে ১৩০ টাকা, ৩১ অক্টোবরে ২৮৩ টাকা, ১৪ নভেম্বর ৫৯২ টাকা, ৩০ নভেম্বর ৭৫৪ টাকা ছিল। ওই সময়ে কোম্পানির ৫১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬০টি শেয়ার বিক্রয় হয়। এর মধ্যে এম/এস দোহা সিকিউরিটিজে ৭ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার ক্রয় ও ২৩ লাখ ৭ হাজার শেয়ার বিক্রি করে। এই লেনদেন বিশ্লেষণ করে তদন্ত কমিটি জানতে পারে, শাইনপুকুর হোল্ডিংসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ও সহযোগী বেক্সিমকো ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ, সাতক্ষীরা ফিসারিজ, বাখখালী ফিসারিজ ও মৃত্তিকা লিমিটেড এই শেয়ার লেনদেনের প্রধান অংশীদার ছিল।

এদিকে ১১ নম্বর মামলার আসামিরা হলেন— বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান এ এস এফ রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডি এইচ খান।

আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘অভিযুক্ত কোম্পানি ও আসামিরা ১৯৯৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে জালিয়াতি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যা সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তদন্ত কমিটির তদন্তে শনাক্ত হয়।’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘১০ টাকা মূল্যের বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার দর ১৯৯৬ সালের ৩০ জুনে ছিল ২৭ টাকা। এরপরে যথাক্রমে একই বছরের ৩১ জুলাই ৯১ টাকা, ৩১ আগস্ট ৮৮ টাকা, ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬৭ টাকা, ১৬ নভেম্বরে ৪৬৮ টাকা ছিল। এই সময়ে কোম্পানিটির ১ কোটি ২৪ লাখ শেয়ার বিক্রয় করা হয়। যা কোম্পানির মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশের বেশী। যা ইমতিয়াজ হোসাইন, এসইএস এ্যান্ড হেমায়েত উদ্দিন, প্রিমিয়াম সিকিউরিটিজে বিক্রয় হয়।’

এইচএমএমএস ও তার সহযোগী ১১ লাখ ১ হাজার শেয়ার বিক্রয় করে ফরেন ডিভিপির মাধ্যমে। যা ডিএসইর রেকর্ডে সরাসরি চিহ্নিত করা যায়নি। একইভাবে কনসালটেন্ট লিমিটেড ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৫০টি শেয়ার বিক্রয় করলেও ডিএসইর রেকর্ডে চিহ্নিত করা যায়নি। ফরেন ডিভিপির স্টেটমেন্ট অনুযায়ী, ইমতিয়াজ হোসাইন ৩০ লাখ ১৫ হাজার ৫১০টি শেয়ার বিক্রয় করে। কিন্তু ডিএসইর রেকর্ড অনুযায়ী তিনি ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৭৮৫টি শেয়ার বিক্রয় করেন। এম/এস এসইএস বিক্রয় করে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮০০টি আর ডিএসইর রেকর্ডে ৯ লাখ ৮ হাজার ২০০টি। তদন্তে উল্লেখ করা হয়, কিছু ব্রোকার, বড় শেয়ারহোল্ডারস এবং কিছু কর্মী ডিএসইর বাইরে সক্রিয় ছিল।

২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারিতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় পুঁজিবাজার সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের পরামর্শে বিশেষ ও জেলা জজ হুমায়ুন কবিরকে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আইন ও বিচার বিভাগের বিচার শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আর ওই বছরের ১৬ মার্চ বিচারক হুমায়ুন কবির কাজে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ১ জুন থেকে ২২ নম্বর পুরানা পল্টনের হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনের ১০তলায় পুঁজিবাজার বিশেষ ট্রাইব্যুনালের দাফতরিক কার্যক্রম শুরু হয়। বিচার কার্যক্রম শুরু হয় ২১ জুন থেকে।

এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের কেলেঙ্কারির ঘটনায় চিকটেক্সের এমডিসহ এক পরিচালককে ৪ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও দু’টি মামলার রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে আরও ৭টি মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের রায়ে স্থগিত থাকা ১০টি মামলাও ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়েছে।

(দ্য রিপোর্ট/আরএ/এমকে/আইজেকে/সা/এনআই/অক্টোবর ১৩, ২০১৫)