প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

বিধান সরকার

বরিশাল

বরিশালে বরফ-কল বন্ধে ইলিশ নিয়ে দুশ্চিন্তা

২০১৫ অক্টোবর ১৩ ২২:২৮:২৪
বরিশালে বরফ-কল বন্ধে ইলিশ নিয়ে দুশ্চিন্তা

খুলনা থেকে বরফ আনার প্রতিবাদে সোমবার রাত ৮টা থেকে বরিশালে বরফ-কলগুলো বন্ধ রেখেছে বরফ-কল মালিক সমিতি। এতে করে ইলিশ মাছকে পচন থেকে বাঁচাতে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এদিকে দাম বৃদ্ধি আর চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বরফ সরবরাহ করায় বরফ ক্রাশকল মালিকরা প্রয়োজনের তাগিদেই বরিশালের বাইরে থেকে বরফ আনছেন বলে দাবী করেছেন।

এই সংকটের কারণে ইলিশ মাছের পাইকার ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি দামে বরফ কিনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের বলেন, দ্রুত সমাধান না হলে ইলিশ মাছে পচন ধরলে লোকসান গুনতে হবে তাদের।

পাইকার ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রতি বছর ইলিশের ভরা মৌসুমের সময় সিন্ডিকেট করে বরফ-কল মালিকরা এমন সংকট তৈরী করেন। অবশ্য এ বছর এই বলয় থেকে বের হবার জন্য খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে ট্রাকযোগে বরফ আনছেন বলে জানান বরফ ক্রাশকল মালিক সমিতির সভাপতি মো. হারুন সিকদার।

দ্য রিপোর্টকে তিনি বলেন, ‘ইলিশের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা শেষে ১০ অক্টোবর থেকে বরিশাল পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে প্রচুর মাছ আসছে। প্রতিদিন আড়াই হাজার ক্যান বরফের চাহিদা থাকলেও বরফ-কল মালিকরা সরবরাহ করে থাকেন ৬ থেকে ৭ শ’ ক্যান। বাড়তি লাভের আশায় চালু থাকা ছয়টি কলের বিপরীতে সিন্ডিকেট করে একটি বা দু’টি কল চালু রাখায় চাহিদার বরফ সরবরাহ করতে পারছে না। অপরদিকে চাহিদা দেখে ১৫০ টাকা বরফ ক্যান ২০০ টাকা করে বিক্রি করছেন। এ ছাড়াও বরফ পাতলা করায় ওজনে কম হচ্ছে। ফলে বরফ বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে ক্রাশকল মালিকদের। এ সব বিবেচনা করে চাহিদার বরফ যোগান দিতে সোমবার থেকে খুলনা ও সাতক্ষীরা থেকে বরফ আনা হচ্ছে।’ মূলত এর প্রতিবাদেই সোমবার রাত ৮টা থেকে বরফকল বন্ধ রেখেছে বরিশালের বরফ-কল মালিক সমিতি।

এ নিয়ে কথা হয় বরফ-কল মালিক সমিতির ম্যানেজার মো. সিদ্দিক মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার আগ পর্যন্ত ৬ মাস তাদের বরফ-কলগুলো অনেকটা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এখন মাছ পড়ায় কল চালু করলেও বরফ ক্রাশকল মালিকরা তাদের স্বার্থে বরিশালের বাইরে থেকে বরফ আনছেন। এতে করে তাদের লোকসান গুনতে হয় বলে বরফ-কল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক সমিতি।’

ম্যানেজার সিদ্দিক মিয়া আরো বলেন, ‘আমাদের মালিক সমিতির ৮টি বরফ-কল চলমান। গ্যাস ও লবণের বাজার দর আর বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বরফ ক্যানের দাম বাড়ানো হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘৯ থেকে ১২ অক্টোবর এই ৩ দিনে তাদের সব মিলিয়ে ১১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের বরফের সাইজ খুলনা থেকে আনা বরফের চেয়ে বড়। চাঁদমারী বরফ-কলগুলোতে গেলে এখনো সাড়ে তিন হাজার বরফ মওজুদ আছে বলে দেখতে পাওয়া যাবে। তারপরও লোকসান গুনে তো কল চালানো যাবে না। তাই মালিকরা বরফ-কল বন্ধ করে দিয়েছেন।’

বরফের সংকট নিয়ে মৎস্য আড়ৎদার ইয়ার হোসেন বলেন, ‘বরফ-কল মালিকরা সিন্ডিকেট তৈরী করেছেন বলে তাদের কাছে অনেকটা জিম্মি আমরা। প্রশাসনের উচিত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। নতুবা বরিশালের এই অবতরণ কেন্দ্রে বরফের সংকটের কথা চাউর হলে পাইকাররা মাছ নিয়ে এখানে আসবেন না। ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা।’

আরেক আড়ৎদার শেখ আব্দুর জব্বার বলেন, ‘তিন দিনে এই অবতরণ কেন্দ্রে ৭ হাজার মণ ইলিশ এসেছে। গড়ে ১৫ হাজার টাকা মণ ধরলে সাড়ে ১০ কোটি টাকার মাছ বিকিকিনি হয়েছে। আর এই ব্যবসার সাথে জেলে থেকে শুরু করে লাখের উপরে মানুষের রুটি-রুজি জড়িত। আশা করছি কার্তিকের শেষ পর্যন্ত ইলিশের দেখা মিলবে। তাই বরফ সংকটের আশু সমাধান হওয়া উচিত।’

মঙ্গলবার দুপুরে পোর্ট রোডের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে কথা হয় মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া থেকে বরফ নিতে আসা ছালাম মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘বরিশালের বরফকল বন্ধ থাকায় খুলনা থেকে আনা বরফের ক্যান এখন ৩ শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বরিশালের বরফ আমরা ২ শ’ টাকায় কিনতে পারতাম। এই বরফ খুলনা থেকে ১৬০ টাকা করে আনলেও তাদের কাছে ৩ শ’ টাকা বিক্রি করলেও সংকট ও প্রয়োজন বলে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইলিশ মাছ ধরার পর সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা বরফ ছাড়া থাকতে পারে। এরপরই পচন ধরে।’

ক্ষুদ্র বরফ ব্যবসায়ী মো. আল আমীন বলেন, ‘বরফ সংকট থাকায় পাইকারদের চাহিদা মতো বরফ দিতে পারছেন না। ২০ ক্যান চাইলে ১০ ক্যান দিচ্ছেন। এমন অবস্থা চললে তাদের সমস্যা বাড়বে। এ জন্য বরফ-কল মালিকদের সিন্ডিকেট বন্ধ করার দাবী করছি।’

বরফ-কল বন্ধ থাকার বিষয়ে মৎস্য বিভাগের উপ-পরিচালক মো. বজলুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি তাকে কেউ জানায়নি।’

এদিকে, জেলা প্রশাসক গাজী মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই। খোঁজ নিয়ে দেখব।’

অবশ্য, জেলা মৎস্য অধিদফতরের কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল দাস এ বিষয়ে বলেন, ‘আমি বরফ-কল বন্ধ থাকার বিষয় জেনে মালিক সমিতির সাথে কথা বলেছি। বরফ-কলগুলো চালু করার চেষ্টা চলছে। নইলে বরফের অভাবে ইলিশ পচে কোটি কোটি আর্থিক ক্ষতি হবে। বিরূপ প্রভাব পড়বে জেলে, পাইকার ও ব্যবসায়ীদের ওপর।’

(দ্য রিপোর্ট/আইজেকে/সা/এএসটি/অক্টোবর ১৩, ২০১৫)