প্রচ্ছদ » শিল্প ও সংস্কৃতি » বিস্তারিত

ভাস্কর্যে ‘একাত্তরের বর্বরতা’ নির্মাণ

২০১৫ অক্টোবর ১৩ ২২:৩৬:৪৬
ভাস্কর্যে ‘একাত্তরের বর্বরতা’ নির্মাণ

মুহম্মদ আকবর, দ্য রিপোর্ট : স্বাধীনতা লাভের ৪৪ বছর চলছে। তারপরও বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের কাছে এর কৌতূহল কমেনি। প্রতিনিয়ত নানাভাবে চলছে এর নিরীক্ষা। কেউ জানছে, আবার কেউ জানাচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশ সৃষ্টিতে কী পরিমাণ বেগ পেতে হয়েছে এদেশের মানুষের তা তরুণ প্রজন্মকে জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের চিন্তা লালন আহ্বান জানানোর জন্যই পৃথক পৃথক মানুষের নানামাত্রিক প্রচেষ্টা। বই লিখে, ছবি এঁকে, ভাস্কর্য নির্মাণে মিটিং মিছিল সমাবেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধের বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ।

অঙ্কনশিল্পী মিন্টু দে নিয়েছেন এমনই একটি প্রয়াস। আঙ্গিক এক হলেও ভাবনা ভিন্ন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার এ ভাবনা জানার জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন প্রাঙ্গণে যাওয়া। যেখানে পাকবর্বরতার ভয়ালচিত্র উপস্থাপনে ব্যস্ত শিল্পীরা। মিন্টু দে’র নেতৃত্বে ৭জন শিল্পী অবিরাম কাজ করে চলেছেন সেখানে। মূল পরিকল্পনা ২০০৭ সালে করা হলেও বাস্তবায়নের কাজে নামেন ২০১৪ সালে। এ পর্যন্ত আটশ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এক হাজার একাত্তরটি ভাস্কর্য নির্মাণ করবেন। যা নিয়ে ‘একাত্তরের বর্বরতা’ শীর্ষক দেশের বৃহত্তম ভাস্কর্য প্রদর্শনী হবে তেজগাঁও এলাকার পুরনো বিমানবন্দরে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করতে পারেন বলে জানালেন শিল্পী মিন্টু দে। মাসব্যাপী এ আয়োজনের পর সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহায়তা পেলে প্রদর্শনীটি বিভাগীয় শহরগুলোতেও প্রদর্শন করা হবে।

মঙ্গলবার দুপুরে দ্য রিপোর্টকে একান্ত আলাপচারিতায় মিন্টু দে বললেন, ‘প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিলো একাত্তরের ৭ই মার্চে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণের উপরে কাজ করবো। সেটা নিয়ে কাজ করতে বসেই এ প্রদর্শনীর ভাবনা। যার কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়েছে গত বছরের নভেম্বর থেকে। প্রাথমিক কাজ শেষ হবে ডিসেম্বরে। জানুয়ারি থেকে প্রদর্শনীস্থলে সম্পন্ন করা হবে বাকি কাজটুকু।’

বিভিন্ন কার্যক্রমের পরিচয় করিয়ে তিনি জানালেন, পুরান বিমানবন্দরের একশ একর জায়গা নিয়ে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হবে। সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রাম তৈরি করা হবে। যেখানে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দোসরদের বর্বরতা, নির্যাতন আর সহিংসতা তুলে ধরা হবে। মূল প্রদর্শনীস্থলে ২৫০টি খড়ের তৈরি গ্রামের বাড়ি তৈরি করা হবে। থাকবে কুকুর, শকুন, কাকের মতো প্রাণীও। কারণ এরাই মৃত মানুষগুলোর শরীর খুবলে খেয়েছিলো। থাকবে গরুর গাড়ি আর গ্রাম্য পথ। সেই সঙ্গে আলো আর শব্দের সংমিশ্রণে সেই সময়কার পরিস্থিতিটিও নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হবে।

এই কাজের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে মিন্টু দে বললেন, ‘নিজস্ব উদ্যোগেই এ কাজ করছি। অনেকেই পৃষ্ঠপোষকতা করছেন, যদিও আশাব্যঞ্জক নয়। তারপরও এ প্রদর্শনী করবোই। কারণ, এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের বর্বরতা সম্পর্কে জানতে পারবে। সেই সঙ্গে বুঝতে পারবে, কত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিল আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।’

ককশিটে তৈরি ভাস্কর্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুললে এই শিল্পী বলেন, আসলে প্রদর্শনীস্থলে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার্থেই ককশিট দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করা হবে। পরবর্তীতে এর উপরে কাপড়ের আস্তরণ দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে প্রলেপ থাকবে নানাবিধ রঙের। পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হলে তখন এটিকে আর শোলার তৈরি ভাস্কর্য মনে হবে না।’

ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যস্ত নবীন শিল্পীরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী। তাদেরই একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউডা’র চারুকলা বিভাগের ছাত্র রমিত চাকমা। কাজের ফাঁকে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষার্থী। আমাদের অধ্যক্ষ স্যারের সঙ্গে এখানে ঘুরতে এসে ভালো লাগা তৈরি হয়েছিল। সেজন্যই এ কাজে যুক্ত হওয়া। প্রথম দিকে আমি ভাস্কর্যের পা বানাতাম, পরে হাত আর এখন মুখচ্ছবি বানাচ্ছি।’ তার বলা শেষ হতেই শুরু করলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জগদীশ বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘আমি মূলত শরীর বানাই। সেই সঙ্গে পুরো শরীর জোড়া লাগানোর কাজটিও করি। আমি আসলে মুক্তিযুদ্ধ থেকে পথচলার প্রেরণা পাই। সেই জায়গা থেকেই এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া।’

কাজে ডুবে থাকা জগদীস দাস বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছি। এ কাজ করতে গিয়ে নিজের ভেতর মনের অজান্তেই শক্তি উৎপন্ন হয়। নিরন্তর কাজ করে চলেছি। মিন্টু স্যারের আন্তরিকতায় সে কাজের মাত্রা আরও বেগবান হচ্ছে।’

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এপি/এনআই/অক্টোবর ১৩, ২০১৫)