প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

নাজমুল সাঈদ

মেহেরপুর থেকে ফিরে

রাজনীতিকদের দখলে গ্রাম্য সালিশ

২০১৫ অক্টোবর ১৪ ২০:৫০:৫৫
রাজনীতিকদের দখলে গ্রাম্য সালিশ

সন্ধ্যা হলেই মাঝে-মধ্যে টিন পেটানোর শব্দ কানে ভেসে আসত। সঙ্গে একটি কণ্ঠও। মূলত টিন পেটানোর আওয়াজ কানে আসা মানেই কারো সঙ্গে কারোর ‘বিরোধ মেটাতে’ সালিশী বৈঠকের আয়োজন। গ্রামবাসীকে উপস্থিত থাকতে টিন পিটিয়ে জানান দেওয়ার এ ব্যবস্থাটি এক সময়ে বেশ জনপ্রিয় ছিল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। এলাকার উৎসুক গ্রামবাসী সালিশী খানায় হাজির হতেন। মধ্যরাত অবধি চলত সালিশী বৈঠক। বৈঠক শেষ না হওয়া পর্যন্ত গ্রামবাসী ঘরে ফিরতেন না। তাদের কাছে বিষয়টি বেশ উপভোগ্যও ছিল।

পঞ্চায়েত প্রধান বাদী-বিবাদী পক্ষের বক্তব্য শুনে অন্য সদস্যদের পরামর্শের ভিত্তিতে রায় দিতেন। অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য একটি ‘লাটিয়াল বাহিনী’ও রাখা হতো। পঞ্চায়েত প্রধান দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে দল-মত নির্বিশেষে সালিশ পরিচালনা করতেন।

বছর কয়েক আগেও গ্রামগঞ্জে এ সালিশী বৈঠকের সংস্কৃতি চালু ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেগুলো এখন শুধুই ইতিহাস। স্মৃতির পাতা উল্টালে অনেকের মনে ভেসে উঠবে এমন বৈঠকের দৃশ্য।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চৌগাছা গ্রামের বজলুল হক বিশ্বাস তার জীবদ্দশায় অধিকাংশ সময় গ্রাম্য সালিশী পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার করতেন বলেও এলাকায় তার ব্যাপক সুনাম রয়েছে।

মরহুম বজলুল হকের ছেলে মো. আহসান হাবিব বাবুর (৪৫) কাছে তৎকালীন সালিশীর খুঁটিনাটি জানতে চাইলে তিনি দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আব্বা ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পঞ্চায়েত প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।’

‘সেই সময় গ্রামের যেকোনো অপরাধ, চুরি-ডাকাতি, ঝগড়া-বিবাদ ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধ সালিশী বৈঠকের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হতো। থানা-পুলিশ, কোর্ট-কাচারীতে না গিয়েই বাদী-বিবাদী ন্যায়বিচার পেতেন। গ্রামবাসীও সেই বিচারকে সমর্থন দিতেন, রায় মেনে নিতেন। কিন্তু বর্তমানে এ সালিশী ব্যবস্থা নেই। এখন সবকিছু রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে। যারাই ক্ষমতায় থাকেন তারাই এ বিচার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। বিচারে দলীয় প্রভাব খাটানো হয়। কিন্তু আমার বাবা যখন বিচার করতেন, তখন তাদের কোনো দলীয় পরিচয় ছিল না,’ বর্ণনা করেন তিনি।

মুরব্বীরাই থাকতেন সালিশী কমিটিতে : গ্রাম সালিশ কমিটি গঠন করা হতো স্থানীয় মুরব্বীদের নিয়ে। এলাকায় তাদেরকে মানুষ মান্য করতেন। বিচার-আচারে তারাও ছিলেন ন্যায়পরায়ণ।

আহসান হাবিব জানান, প্রতিটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই একটি সালিশ কমিটি গঠন করা হতো। যে পাড়ার ঘটনা সেই এলাকার দু’জন এবং গ্রামের পক্ষে থাকতেন দু’জন সদস্য। পঞ্চায়েত প্রধান সালিশ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করে রায় দিতেন। গ্রামবাসীও সেই রায়কে স্বাগত জানাতেন। কারণ সেখানে পক্ষপাতিত্ব ও দলীয় প্রভাবের সুযোগ ছিল না। যতটুকু অপরাধ ঠিক ততটুকুই শাস্তি দেওয়া হতো। ব্যক্তিগত আক্রোশের সুযোগ ছিল না। এ ছাড়া পঞ্চায়েত প্রধান চাইলেও একক সিদ্ধান্তে রায় দিতে পারতেন না। কিন্তু এখন এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একক সিদ্ধান্তে রায় দেন। গ্রামবাসীরও মতামতকে মানতে হয়।

বিচার এখন ‘দলীয় কার্যালয়ে’ : গ্রামবাসীরা জানান, তাদের গ্রামে এখন আর বিচার-আচারে মুরব্বীরা থাকেন না। তাদের রাখা হয় না। বিচার হয় দলীয় কার্যালয়ে। বিচারের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়টি প্রাধান্য পায়। দলীয় কর্মী হলে রায়টি কর্মীর পক্ষেই যাচ্ছে। এ কারণে অনেকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’গাংনী উপজেলার জুগিন্দা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব ভ্যানচালক আব্দুর রশীদ শেখকে পোড়াপাড়া গ্রামের সাব্দুল হোসেনের তিন ছেলে রিপন, লিখন ও শিপন মারধর করেন। আব্দুর রশীদ শেখ এ অভিযোগ করলে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আওয়ামী লীগ নেতা মজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত অফিসে সালিশ বৈঠক ডাকা হয়। সেখানে প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন আওয়ামী লীগ নেতা ও গাংনী পৌরসভার মেয়র আহমদ আলী। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতা মো. মজিরুল ইসলাম, ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা জাফর আলী উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আহমদ আলী অপরাধীদের দু’একটি থাপ্পড় মেরে আব্দুর রশীদ শেখের কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি আব্দুর রশীদ শেখের পরিবার।

বৈঠক শেষে আব্দুর রশীদ শেখের ভাইয়ের ছেলে আজিবার হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ বিচারে আমরা খুশী হয়নি। বৃদ্ধ মানুষকে মারধরে শাস্তি আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল। আমরা সেটাই আশা করেছিলাম। কিন্তু সেটি হয়নি।’

নিরপেক্ষ সালিশের অভাবে ‘পুলিশী হয়রানি’ : গ্রামের ছোটখাট ঝগড়া-বিবাদ, পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো সালিশী বৈঠকে সমাধান করা গেলেও এখন থানা পুলিশ ও আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

গাংনীর সাহারবাটি ইউনিয়নের বাসিন্দা আক্তারুজ্জামান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আগে চুরি-ডাকাতি ও জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের মীমাংসা এলাকার মাতব্বরা করতেন। কিন্তু এখন সেটি হয় না। প্রতিপক্ষ আগপাছ না ভেবেই থানায় মামলা করে বসেন। পরে পুলিশ অভিযুক্তকে ধরে নিয়ে বিভিন্ন হয়রানি করে এবং মুক্তি দিতে অনেক সময় মোটা অংকের টাকাও দাবি করে।

তবে এ সব অভিযোগ নাকচ করেন মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহমার উজ্জামান। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ অভিযোগের সত্যতা নেই। পুলিশ আইন অনুযায়ী অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ার কারণে এলাকায় সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য পুলিশের কাছে আসে। পুলিশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে।’

দলীয় পরিচয়ের বাইরে বিচার চাইলে ‘হুমকি’ : ক্ষমতাসীনদের বাইরে কেউ গ্রাম্য বিচারের উদ্যোগ নিলে তাদের বিভিন্ন ভয়ভীতি ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গাংনী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান আসাদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, দলীয় পরিচয়ের বাইরে আমরা বেশ কয়েকবার গ্রাম্য সালিশীর উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। বিচার না করার জন্য বলা হয়।’

রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের রায় দেওয়া উচিত হবে। তারা যেন সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলে। এটা হলেই সবাই ন্যায়বিচার পাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দাবি, গ্রাম্য সালিশীর সংস্কৃতিটা যেন পুনরায় চালু করা হয়। তাহলে সমাজের সবাই লাভবান হবেন।’

‘বিলুপ্ত’ সালিশী ব্যবস্থা : আস্থাহীনতার কারণে গ্রাম্য সালিশী ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও গাংনী পৌরসভা মেয়র আহম্মদ আলী। তিনি বলেন, ‘আগে গ্রামগঞ্জে যে বিচার ব্যবস্থা চালু ছিল সেগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা নেই। মাতব্বরা আগে থেকেই রায় চূড়ান্ত করেই বিচার কাজ শুরু করতেন। কিন্তু এখন মানুষ সচেতন। সচেতনতার কারণে তাদের কাছে বিচারের জন্য যান না।

দলীয় নেতাদের দ্বারা নিরপেক্ষ রায় দেওয়া সম্ভব কিনা— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সালিশ বৈঠকে দলীয় পরিচয়ের দিকে নজর দেওয়া হয় না। যে দোষী তাকেই শাস্তি দেওয়া হয়। আমরা দল-মত নির্বিশেষে সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই রায় দেই।’

মাতব্বরা রায় চূড়ান্ত করেই বিচার কাজ শুরু করতেন এমন অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন তৎকালীন পঞ্চায়েত প্রধান মরহুম বজলুল হকের ছেলে আহসান হাবিব বাবু।

আহসান হাবিব বাবু বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা কখনই ঘটেনি। বরং এখনই এ সব ঘটনা ঘটে। অনেক সময় টাকা-পয়সা নিয়ে রায় পাল্টানো হয়। অনেক সময় টাকা-পয়সা দাবিও করা হয়।’

গ্রাম্য সালিশী ব্যবস্থা বিলু্প্তির কারণ জানতে চাইলে গাংনী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবুল আমীন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও নিরপেক্ষভাবে বিচার করার মানসিকতা লুপ্ত এবং ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা’ চালু হওয়ায় গ্রাম্য সালিশীর সংস্কৃতি বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে। এগুলোই প্রধান কারণ। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির অংশই হল গ্রাম্য আদালত। সরকারের এই উদ্যোগটি বিরোধ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা গ্রাম্য আদালতের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারা ৭৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারেন। গ্রাম্য আদালত শক্তিশালী ও জনগণের আস্থা অর্জনের কারণে স্থানীয়ভাবে বিরোধী মীমাংসের পঞ্চায়েত বা সালিশ প্রথা কমে এসেছে।’

(দ্য রিপোর্ট/এনএস/এএসটি/আইজেকে/সা/অক্টোবর ১২, ২০১৫)