প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

সবাইকে সম্পৃক্ত না করায় স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা

২০১৫ অক্টোবর ১৪ ২১:৫৭:৪৬
সবাইকে সম্পৃক্ত না করায় স্থানীয় সরকারের উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা না করেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সরকারের বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে সরকারি দলের নেতারা কিছুদিন যাবত কথা বললেও অন্য পক্ষগুলোকে সম্পৃক্ত না করায় উদ্যোগটির প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকারি দল।

সরকারি দল বলছে, দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করলে গণতন্ত্র আরও সুসংহত হবে। বিপরীতে, বিএনপি এই উদ্যোগকে ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে মত দিয়েছে।

এই বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘এটা একটা মেজর ডিসিশন (বড় সিদ্ধান্ত)। এই ডিসিশনটার বিষয়ে সবগুলো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করলে ভাল হতো। বিষয়টি নিয়ে (আমাদের) পার্টি ফোরামে আরও আলোচনা হবে। তখন আমি বিস্তারিত কথা বলব।’

স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মান অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত অপরিপক্ক। এর মাধ্যমে ব্যক্তিতান্ত্রিকতাই প্রাধান্য পাবে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানীয় সরকারের কোনো ফায়দা আসবে না।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলো সংসদ সদস্য পদের জন্য নিজ দলের প্রতীকসহ প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্যও দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমে একই প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরী করে আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘এই ব্যবস্থাটির মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষতি করা হবে।’

এদিকে, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ জানান, ‘ভাল উদ্দেশ্য হলে ভাল প্রভাব পড়বে। কিন্তু রাজনীতি নিয়ন্ত্রক কারা সেটা তো সবাই জানি।’

বিদ্যমান ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। যদিও উল্লিখিত নির্বাচনগুলোতে প্রচ্ছন্নভাবে দলীয় প্রার্থী সাংগঠনিকভাবে ঠিক করে দেওয়া হতো। গণমাধ্যমগুলোও সংশ্লিষ্ট দলের সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে জয়-পরাজয়ের হিসাব প্রকাশ করত। তবে, প্রস্তাবিত সংশোধন আইনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যথারীতি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন বলে জানা গেছে।

সোমবার (৯ অক্টোবর) মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার লক্ষ্যে আইন সংশোধনে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশনের মেয়র দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্র আরও শক্তিশালী হবে। বিপরীতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থানীয় সরকারের কোনো লাভ হবে না। বিষয়টি নিয়ে সরকার কারো সঙ্গে আলোচনা করারও প্রয়োজন মনে করল না। যেনো, দেশে আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। বিষয়টি সংসদে আলোচনা হয়নি, এমনকি স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদেরও মতামত নেয়নি সরকার।’

আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া শাহ মো. ফখরুল ইসলাম ফিরোজ এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন ভাল উদ্যোগ। কিন্তু দলের মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের মধ্যে যারা মনোনয়ন পাবেন না তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়াটা সমর্থন করি না।’

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর পরই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন’ দলীয় প্রতীক ও ব্যানারে করার অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন।

এরপর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়, দলটির মণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন, ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতারা বিভিন্ন সময়ে এই বিষয়টিকে বাস্তবায়নের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্তব্য ছিল, ‘যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় রাখতে চান। দলীয় সমর্থনে নির্বাচন হলে লোকাল গভর্নমেন্ট শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে স্থানীয় সরকার আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।’

তারই ধারাবাহিকতায় দেড় বছরের মাথায় পাঁচটি স্থানীয় সরকার কাঠামোর আইন সংশোধনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। এর মধ্যে পৌরসভা নির্বাচন আগামী ডিসেম্বর মাসে শুরু হতে যাচ্ছে। এ কারণে পৌরসভা সংক্রান্ত (সংশোধন) আইনটি আপাতত অধ্যাদেশ আকারে জারি হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা। পরবর্তীকালে সংসদ অধিবেশনে সবগুলো (সংশোধন) আইন জাতীয় সংসদে তোলার কথা রয়েছে।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/সা/এএসটি/অক্টোবর ১৪, ২০১৫)