প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

কোরবানীর ৯৫ শতাংশ চাহিদা মিটিয়েছে দেশীয় গরু

২০১৫ অক্টোবর ১৫ ২১:২৭:২২
কোরবানীর ৯৫ শতাংশ চাহিদা মিটিয়েছে দেশীয় গরু

বাহরাম খান, দ্য রিপোর্ট : এবারের কোরবানীর ৯৫ শতাংশ চাহিদা মিটিয়েছে দেশীয় গরু। যা বাংলাদেশে গরু প্রবেশ ‘পুরোপুরি বন্ধের’ বিষয়ে ভারতের স্বরাষ্টমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশের পর যে সংকট দেখা দেয় তা কাটিয়ে উঠে দেশের সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এ নির্দেশ দেন। যার প্রভাব পড়ার বিষয়ে শংকাও দেখা দেয়। তবে কোরবানী ঈদের পর পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভারত গরু রফতানি না করায় লাভই হয়েছে বাংলাদেশের। এদিকে প্রাণী-সম্পদ অধিদফতর বলছে, ৯৫ শতাংশ কোরবানীর চাহিদা মিটিয়েছে দেশীয় গরু। যা কিনা দেশের জন্য সাফল্যের বার্তা বয়ে এনেছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু আসে এমন সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর মধ্যে যশোর, বেনাপোল, চট্টগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও রাজশাহীর দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের কোরবানী ঈদে ভারত থেকে তুলনামূলক কম গরু আসলেও সামগ্রিকভাবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এটা বাংলাদেশের জন্য সুখবরই বয়ে আনছে। অবশ্য লালমনিরহাট সীমান্ত দিয়ে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশী গরু এসেছে বলেও জানা গেছে।

ভারতে ‘ধর্মীয় রাজনীতি’র সঙ্গে অর্থনীতিতেও যে গরু যুক্ত তার তথ্য জানিয়েছে ৭ অক্টোবর বিবিসি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। তাতে মার্কিন কৃষি দফতরের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘বিশ্বে গরুর মাংস রফতানিতে শীর্ষতম একটি দেশ ভারত।’

চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের গরু পাচার বন্ধের জন্য বিএসএফকে নির্দেশ দেন। ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে ইস্যুটি আরও চাঙ্গা হয়।

কোরবানী ঈদের পরিস্থিতি : বাংলাদেশে সারাবছর যত গরু জবাই হয় তার প্রায় সমপরিমাণ গরুর চাহিদা থাকে কোরবানীর জন্য। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী ভারত থেকে প্রতি বছর কম-বেশী ২০ লাখ গরু বাংলাদেশে আসে।

প্রাণী-সম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, বছরব্যাপী খাওয়ার জন্য দেশজুড়ে পঞ্চাশ লাখ গরুর মাংসের চাহিদা আছে। এর মধ্যে কোরবানীর ঈদেই প্রায় ২৫ লাখ পশু জবাই হয়। মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি আসে ভারত থেকে। তবে এবার ভারত থেকে পর্যাপ্ত গরু না এলেও দেশীয় উৎস থেকে বেশীরভাগ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি অধিদফতরের।

প্রাণী-সম্পদঅধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে ৯৫ শতাংশ চাহিদা দেশীয় গরুতে পূরণ হয়েছে। সামান্য কিছু গরু ভারত ও মিয়ানমার থেকে এসেছে। এতে দেশীয় গরুর মাধ্যমে বাংলাদেশ মাংসের চাহিদা পূরণ করতে পারে এমন একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক অজয় কুমার রায়।

দ্য রিপোর্টকে অজয় কুমার রায় বলেন, ‘আমরা যে নিজেরাই নিজেদের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম ঈদুল আযহায় সেটা প্রমাণ হয়েছে। এতে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সামনের দিনগুলোতেও দেখা যাবে।’

ঈদ উপলক্ষ্যে দেশব্যাপী গরুর হাটের তথ্যের বরাত দিয়ে অজয় কুমার আরও বলেন, ‘সব জায়গায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের মুখে হাসি ছিল। গ্রহণযোগ্য দামে কোরবানীর মানসম্পন্ন পশু পেয়েছেন সবাই।’

চট্টগ্রাম জেলা প্রাণী-সম্পদ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গেল ঈদে জেলাতে প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ কোরবানী হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় এক লাখ বেশী। এতে সহনশীল দামেই গরু ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে।

ঈদের সময় গরুর সরবরাহ স্বাভাবিক থাকাকে সমর্থন করে বাংলাদেশ ট্যানার্স এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন বুধবার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশিত ৫৫ লাখ চামড়ার মধ্যে ৫২ থেকে ৫৩ লাখ সংগ্রহ হবে বলে আশা করছি। তাই বলা যায়, ভারতীয় গরু কম আসলেও কোরবানীর ঈদে দেশের বাজারে তার তেমন প্রভাব পড়েনি।’

তবে দীর্ঘ মেয়াদে গরুর সরবরাহ কম থাকায় দৈনন্দিন গরুর মাংস ভোক্তাদের কেজিপ্রতি বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। সরকার অবশ্য এই অবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পশুপালনে বিশেষ ঋণ দেওয়ার জন্য তফসিলী ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইস্যু তুলে বিপদে ভারত : গরুর মাংস নিয়ে ইস্যু সৃষ্টি করা বিজেপি সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই বিব্রত হচ্ছেন বিভিন্নভাবে। এনডিটিভি, বিবিসি ও ইন্ডিয়ান টাইমসে গো-ইস্যুতে গত কয়েক মাসে প্রকাশ হওয়া কিছু প্রতিবেদনে এমন তথ্য মিলেছে।

উত্তর প্রদেশে গো-মাংস খাওয়ার মিথ্যা অভিযোগে ২৮ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ আখলাক নামে একজন মুসলিমকে হত্যার পর সেটি আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের দেশের সচেতন হিন্দু নাগরিকদের নিন্দার মুখেও পড়তে হয়েছে গো-ভক্ষণ বিরোধীদের। বিজেপি ক্ষমতায় থাকা মুম্বাইয়ের সুপরিচিত লেখিকা শোভা দে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে লিখেছেন, ‘এখনই গরুর মাংস খেলাম। আসুন আমাকে খুন করুন।’

ভারতের বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের মন্তব্য এই ইস্যুতে নতুন মশলা যোগ করেছে। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘বিদেশে গিয়ে হিন্দুরাও গরুর মাংস খায়।’

গরুর ইস্যুর রেশ পড়েছে জম্মু ও কাশ্মীর বিধান সভার সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদের উপরেও। গরুর মাংসের পার্টি দেওয়ার কারণে বিধান সভার মধ্যেই তাকে মারধর করেন হিন্দু কয়েকজন সহকর্মী।

এদিকে উত্তর প্রদেশের বিধান সভার সদস্য ও বিজেপি নেতা গো-হত্যার বিরুদ্ধে উত্তেজক বিবৃতিদানকারী সঙ্গীত সোমের প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যে গরুর মাংস রফতানির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে।

গরু ইস্যুটি এখন শুধু ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে না। গুজরাটের ধনাঢ্য প্যাটেল সম্প্রদায়ের কোটাকেন্দ্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি সরকার গরু ইস্যু হাজির করে মুখ রক্ষা করতে চেয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

‘গো-মাতা’ হিসেবে হিন্দুপ্রধান ভারতে গরু পূজনীয় প্রাণী। অন্যদিকে সুস্বাদু মাংস হিসেবে মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশের বাজারে গরুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম বৃদ্ধিতে ‘খুশী’ হয়েছেন বলে সে দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রাণী-সম্পদ বিভাগের সাথে কথা বলে জানা গেছে ‘গরু রাজনীতি’তে বাংলাদেশেরই লাভ হয়েছে।

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এএসটি/এইচ/আইজেকে/সা/অক্টোবর ১৫, ২০১৫)