প্রচ্ছদ » জাতীয় » বিস্তারিত

সবুজ-নীলে হবিগঞ্জের বন-পাহাড়ে

২০১৫ অক্টোবর ১৫ ২১:৪৬:৪৬
সবুজ-নীলে হবিগঞ্জের বন-পাহাড়ে

লুৎফর রহমান সোহাগ

অসংখ্য চা ও রাবার বাগান, ছোট-বড় পাহাড়, লেক; সবমিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি হবিগঞ্জ। মাধবপুর, চুনারুঘাট, বানিয়াচংসহ পুরো হবিগঞ্জই অপরূপ দর্শনীয় স্থান।

হবিগঞ্জের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চুনারুঘাটের রঘুনন্দন পাহাড়ের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। ২৪৩ হেক্টর এলাকার এ উদ্যানে ছড়িয়ে আছে সাতটি পাহাড়ি ছড়া (ছোট খাল)। বর্ষাকালে পানি থাকলেও সারাবছর সাদা বালু ছড়িয়ে থাকে এ ছড়াগুলোয়। ছড়ার বালু দিয়ে হেঁটে হেঁটে পুরো সাতছড়ি উদ্যান ঘুরে দেখা যাবে, আর চারপাশে লালমাটির পাহাড় সহজেই মুগ্ধ করবে। উদ্যানের চারপাশেই রয়েছে ৯টি চা বাগান। এ সব চা বাগানের ভিতরেই আছে প্রাকৃতিক পাহাড়ি হ্রদ।

দৃষ্টিনন্দন মিশ্র চির সুবুজ পাতাঝরা এ বনে অসংখ্য বানর, উল্লুক, হনুমান, হরিণ, সাপ, বনমোরগসহ বিভিন্ন প্রজাতির জীব-জন্তু, পাখির দেখা মিলবে। আর সাতছড়ির পাহাড়েই দেখা যাবে ত্রিপুরা, খাসিয়াসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। নৈসর্গিক দৃশ্যের কারণে চুনারুঘাটের আরেক নয়নাভিরাম স্থান রেমা-কালেঙ্গা। ১৪ হাজার ৬৩২ একরের এ বনাঞ্চল এক শ’ বছর আগে গড়ে উঠেছে। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বনাঞ্চল বিভিন্ন প্রজাতির জীবজন্তু, পাখি, উদ্ভিদে ভরা সবুজ বনানীর মনোরম দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি চোখে পড়বে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকার এ সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ অভয়ারণ্যের আশপাশে রয়েছে ৩টি চা-বাগান।

ছোট-বড় পাহাড়, লেক, ২ শ’ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার পর্যটকদের মুগ্ধ করবে।

এ এলাকার প্রাকৃতিক নিসর্গ ছাড়াও ব্যক্তি মালিকানাধীন গ্রীনল্যান্ড পার্কের লেক, শিশু পার্ক, বন, ফল বাগান দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে। লেকে সাঁতার কাটাসহ নৌকায় ঘুরার সুযোগ রয়েছে।

পার্শ্ববর্তী মাধবপুরের তেলিয়াপাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত। এখানকার চা বাগানের বাংলোয় ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এখানেই ১১ সেক্টর বিভাজন, যুদ্ধের নকশা প্রণয়ন, এস, কে ও জেড ফোর্স গঠন করাসহ মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মুক্তিবাহিনীর আনুষ্ঠানিক প্রথম সদর দফতর, প্রথম রণ পরিকল্পনার এ স্থান থেকে জুনে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের কারণে ৩নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে এখানে ২, ৩ ও ৪নং সেক্টরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে বুলেট আকৃতির একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়েছে, স্মৃতিসৌধের মূল প্রবেশপথের দুই পাশে ফলকে লেখা কবি শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার পঙক্তি। এর চারপাশে চা বাগান, মাঝে অনিন্দ্য সুন্দর লাল শাপলার পাহাড়ি হ্রদ, হ্রদর মাঝখানে রয়েছে একটি দ্বীপাকৃতির টিলা।

এশিয়ার বৃহত্তম চা বাগান সুরমাসহ হবিগঞ্জে ২১টি চা-বাগান, দুইটি রাবার বাগান, বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড, বাঘাসুরা রাজবাড়ীসহ অসংখ্য সুন্দর স্থান রয়েছে এ এলাকায়। তবে এ এলাকার মূল সৌন্দর্য সবুজ চা বাগান, রাবার বাগান ও উঁচু-নিচু পাহাড়ের মাঝে ছড়িয়ে থাকা ছোট খাল।

এ ছাড়া এশিয়ার সর্ববৃহৎ গ্রাম বানিয়াচংয়ের দৃষ্টিনন্দন লক্ষ্মী বাওর জলাবন ঘুরে আসতে পারেন। আকর্ষণীয় এ পর্যটন স্পটটি প্রকৃতির বিচিত্র রূপে বিস্ময়কর। বর্ষাকালে চারদিকে হাওরের পানি আর সবুজ অরণ্য পরিবেশকে এক নান্দনিক রূপ দিয়েছে। অসংখ্য গাছ ও গুল্মে পরিপূর্ণ এ জলাবন সিলেটের রাতারগুল এর মতোই সুন্দর।

এ এলাকায় বৈষ্ণব ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান বিতঙ্গল আখড়া। ষোড়শ শতাব্দীতে মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত আখড়াটিতে ২৫ মণ ওজনের শ্বেত পাথরের চৌকি, পিতলের তৈরি সিংহাসন, সুসজ্জিত রথ, রৌপ্য পাত্র ও সোনার মুকুট দিয়ে সাজানো।

৬৫ একরের ঐতিহাসিক সাগর দিঘী বা কমলারাণীর দিঘীটি বিখ্যাত হয়ে আছে প্রজাদের জলতেষ্টা নিবারণের জন্য রাণী কমলাবটির আত্নত্যাগের কারণে।

হবিগঞ্জ গ্যাস ফিল্ডের পাহাড়ের টিলায় প্রায় ৩ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে দেশী-বিদেশী বহু দূর্লভ এবং বিলুপ্তপ্রায় ২০০ জাতের বিভিন্ন ফলের মনোরম বাগান- ফ্রুটস ভ্যালি।

(দ্য রিপোর্ট/এমডি/অক্টোবর ১৫, ২০১৫)