প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত

কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা-এক

২০১৫ অক্টোবর ১৬ ০০:৫৪:৪০
কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা-এক

সাইয়িদ আবুল হাসান আলী হাসান নাদভী

[মাওলানা মুহাম্মদ আলী জাওহারীর একটি বিখ্যাত পংক্তি ‘ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায়-হার কারাবালাকি বা’দ।’ মহররম এলেই মনে পড়ে সেই কারবালার কথা। কী ঘটেছিল সেদিন কারবালা প্রান্তরে। আর কী পরিণতি হয়েছিল ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়ার। পাঠকের জানবার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা এটি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ধারাবাহিকভাবে পত্রস্থ করছি এই লেখাটি। এটি নেওয়া হয়েছে ‘হযরত আলী রা. জীবন ও খিলাফত’ থেকে। তাহলে পড়ুন সেদিনের এবং পরবর্তী সময়ের ঘটনা পরম্পরা। এই লেখাটি সমাপ্তি টানা হবে ইয়াজিদের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনার মধ্য দিয়ে।বি.স]

কারবালার যে মর্মন্তুদ ঘটনায় প্রতিটি মুসলমানের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত এবং লজ্জাবনত, সম্ভব হলে কলমের কালিতে এ ঘটনা আমরা কিছুতেই লিপিবদ্ধ করতাম না। বরং অপরাধীর ন্যায় এড়িয়ে যেতাম। কিন্তু ইতিহাস তো সব ঘটনার সাক্ষী, যত বিচিত্রই হোক তার গতিপ্রকৃতি এবং মানুষের হৃদয়ে তা যত রক্তক্ষরণই করুক না কেন। সেই ইতিহাসের দাবী রক্ষার জন্যই আমাদেরকে আজ কারবালার কথা বলতে হবে, যাতে আলোচনা সর্বাঙ্গ পূর্ণ হয় এবং ইতিহাসের পাতায় বাস্তব ঘটনা সংরক্ষিত হয়। সর্বোপরি হৃদয় ও বিবেকের নিকট যাতে কিঞ্চিৎ কৈফিয়ত পেশ করা যায় এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ পাঠকবর্গের অন্তরে সামান্য সান্ত্বনার সঞ্চার হয়, যারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহলে বাইতের সম্মান ও মর্যাদা জানেন এবং উম্মতের প্রতি তাঁদের ইহসান ও অবদনা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেন।

হযরত হুসায়িন ইবন্‌ আলী (রা.) ইয়াযীদের হাতে বাই‘আত গ্রহণ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং স্বীয় নীতি ও অবস্থানে অটল থেকে প্রাণপ্রিয় নানাজানের শহর মদীনায় অবস্থান করতে লাগলেন। ইয়াযীদ ও ক্ষমতাসীন মহল বাইয়াত গ্রহণ থেকে হযরত হুসায়িন (রা.)-এর বিরত থাকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলো। অথচ আবদুল্লাহ ইবন ওমর, আবদুর রহমান ইব্‌ন আবু বকর ও আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের (রা.) প্রমুখের বেলায় তারা ততটা গুরুত্ব দেয়নি। এর কারণ একদিকে রাসূল (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর নিকটতম সম্পর্কের কারণে মুসলিম উম্মাহ্‌র অন্তরে তাঁর প্রতি অখণ্ড ভক্তিশ্রদ্ধা ও প্রেম ভালোবাসা। অন্যদিকে মুআবিয়া (রা.)-এর শাসন ক্ষমতার বিরুদ্ধে তাঁর মহান পিতার সংগ্রাম ঐতিহ্যের কারণে মুসলিম সমাজের অপরিসীম প্রভাব প্রতিপত্তি। কিন্তু হযরত হুসায়িন (রা.) বিন্দুমাত্র নমনীয়তা ও বশ্যতা স্বীকার করলেন না এবং পূর্ণ উপলব্ধি ও সচেতনতার সাথে যে নীতি ও অবস্থান তিনি গ্রহণ করেছিলেন তা থেকে বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হলেন না।

ইরাকীদের প্রতি আহ্বান এবং মুসলিম ইবন আকীলকে ইরাকে প্রেরণ

ইয়াযীদের ও তার প্রশাসকদের পক্ষ থেকে যখন বাইআ‘তে চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে লাগলো তখন হুসায়িন (রা.) মক্কায় আশ্রয় গ্রহণ করলেন। ইতিমধ্যে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক ‘পত্র’ আসতে লাগলো। এমনকি ইরাকীরা এক প্রতিনিধি দলের হাতে হুসায়িন (রা.)-এর নামে একশত পঞ্চাশটি পত্র প্রেরণ করলো। এবং এই বার্তা প্রদান করলো যে, আপনার পিছনে একলাখ যোদ্ধা রয়েছে। এক পত্রে তারা তাকে অবিলম্বে ইরাক আগমনের আহ্‌বান জানালো। যাতে তারা ইয়াযীদ ইব্‌ন মুআবিয়ার পরিবর্তে তার হাতে বাই‘আত হতে পারে। তখন হুসায়িন (রা.) প্রকৃত অবস্থা অবগত হওয়ার জন্য আপন পিতৃব্য পুত্র মুসলিম ইব্‌ন আকীলকে ইরাকে পাঠালেন। এবং তার হাতে এই মর্মে ইরাকীদের নামে একটি পত্র দিলেন।

মুসলিম ইব্‌ন আকীল কুফায় প্রবেশ করলেন এবং কুফাবাসীদের মুখে মুখে তাঁর আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো। ফলে তারা তাঁর খিদমতে হাজির হয়ে তাঁর হাতে হুসায়িন (রা.)-এর আনুগত্যের বাই‘আত গ্রহণ করলো। এবং তাঁর সমর্থনে জানমাল কোরবান করার শপথ গ্রহণ করলো। এভাবে কুফায় বার হাজার মানুষ তাঁর বাই‘আতে ঐক্যবদ্ধ হলো। অতঃপর সে সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে আঠারো হাজারে উন্নীত হলো। তখন মুসলিম ইব্‌ন আকীল হযরত হুসায়িন (রা.)-কে কুফায় আগমনের কথা লিখে জানালেন যে, বাই‘আত গ্রহণসহ যাবতীয় পরিস্থিতি তাঁর অনুকূল হয়েছে। তখন হযরত হুসায়িন (রা.) মক্কা হতে কুফার উদ্দেশে যাত্রা করলেন। এদিকে ইয়াযীদ কুফার প্রশাসক নোমান ইব্‌ন বশীরকে হুসায়িনের প্রতি তাঁর দুর্বল নীতি ও অবস্থানের কারণে বরখাস্ত করলো এবং বসরার সাথে কুফাকেও ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদের শাসনাধীনে যুক্ত করে দিলো।(আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৮ম খ.পৃ.১৫২)

কুফাবাসীদের মুসলিম ইব্‌ন আকীলের সঙ্গ বর্জন

মুসলিম ইব্‌ন আকীল ঘোড়ায় চড়ে বের হলেন এবং স্লোগান দিলেন সঙ্গে সঙ্গে কুফার চার হাজার যোদ্ধা তার পাশে জড়ো হয়ে গেল। ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদ অবস্থা টের পেয়ে সঙ্গী সহচরদের নিয়ে প্রাসাদের ভিতরে আশ্রয় নিলেন এবং ফটক বন্ধ করে দিলেন। মুসলিম ইব্‌ন আকীল তার বাহিনীসহ প্রাসাদের ফটকে অবস্থান গ্রহণ করলেন। প্রাসাদে ওবায়দুল্লাহ ইব্‌ন যিয়াদের নিকট যে সকল গোত্র প্রধান উপস্থিত ছিল তারা মুসলিম ইব্‌ন আকীলের ডাকে সমবেত নিজ নিজ গোত্রের লোকদের বুঝালো এবং সরে যেতে বললে ওবায়দুল্লাহ কতিপয় সরদারকে এই নির্দেশসহ শহরে পাঠিয়ে দিলেন যেন তারা শহরে ঘুরে ঘুরে সকলকে মুসলিম ইব্‌ন আকীল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফলে তারা সারা শহরে জোরে শোরে প্রচারণা চালালো। মা তার পুত্রকে এবং বোন তার ভাইকে এসে চোখের পানি ফেলে বলতো, নিরাপদে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চলো। তদ্রুপ বাপ তার পুত্রকে এবং ভাই তার ভাইকে এসে বোঝাতে লাগলো এই তো সিরীয় বাহিনী এসে পড়লো বলে। তখন কি দিয়ে তাদের মুকাবেলা করবে শুনি!

ফলে মানুষ হতোদ্যম হয়ে ধীরে ধীরে মুসলিম ইব্‌ন আকীলের সঙ্গ ছেড়ে সরে পড়তে লাগল, ফলে পাঁচশ’র বেশি মানুষ তাঁর সাথে থাকলো না। সে সংখ্যাও কমে গিয়ে তিনশ-তে এসে দাঁড়ালো। মাগরিবের পূর্বে তিনি তার পাশে দেখতে পেলেন মাত্র ত্রিশজনকে। তাদেরকে নিয়ে তিনি মাগরিবের নামাজ পড়লেন। অতঃপর ‘কিন্দা’ মহল্লায় গেলেন এবং সেখান থেকে দশজন সঙ্গীসহ বের হলেন। পরে তারাও চলে গেলো, ফলে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়লেন। পথ দেখাবার কেউ ছিল না, কথা দিয়ে, সঙ্গ দিয়ে সান্ত্বনা দেয়ার কেউ ছিল না। ঘরে এনে আশ্রয় দেবে এমনও কেউ ছিল না। তখন তিনি অন্ধকার পথে একাকী লক্ষ্যহীনভাবে চলতে লাগলেন। কি করবেন, কোথায় যাবেন কিছুই তার জানা নেই। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮ম খ.,পৃ. ১৫৪-১৫৫)

মুসলিম ইব্‌ন আকীলের প্রতি কুফাবাসীদের আচরণ ও সঙ্গ বর্জনের কাহিনী বড় দীর্ঘ ও করুণ। এ কাহিনী বারবার প্রমাণ করে যে, উদ্দেশ্য ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে এবং নীতি ও মূল্যবোধের গলায় ছুরি সে বসিয়েও শক্তি ও ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়াতে এবং প্রদত্ত সম্পদের লোভলালসার কাছে নতি স্বীকার করতে মানুষ স্বভাবতই কোন দ্বিধাবোধ করে না।

যাহোক, এ মর্মান্তিক কাহিনীর পরিসমাপ্তি হলো এভাবে যে, মুসলিম ইব্‌ন আকীল একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। কিন্তু সে ঘর ঘেরাও করে ফেলা হলো। শত্রুপক্ষ বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে তার উপর চড়াও হলো। তিনি তরবারি হাতে তাদের তাড়া করলেন এবং তিন তিনবার বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। তখন তারা তাকে পাথর মেরে ঘায়েল করতে লাগলো এবং বাশের মাথায় আগুন (প্রজ্বলিত করে)নিক্ষেপ করতে লাগলো। ফলে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়লেন এবং তরাবারি হাতে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং লড়াই শুরু করলে-তখন আশ্রয়-গৃহের মালিক আবদুর রহমান তাঁকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিলো। ফলে তিনি নিজেকে তার হাতে তুলে দিলেন। কিন্তু তারা তার তলোয়ার ছিনিয়ে নিলো এবং একটি খচ্চরের পিঠে তাকে তুলে দিলো। তখন তার আর কিছুই করার ছিল না। এ সময় অজ্ঞাতসারেই তিনি কেঁদে ফেললে এবং নিশ্চিত হলেন যে, তিনি শহীদ হতে চলেছেন।

হুসায়িনের নামে মুসলিম ইব্‌ন আকীলের বার্তা এবং হিতাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শ

ঠিক সেই দিন কিংবা তার আগের দিন হুসায়িন (রা.) মক্কা হতে যাত্রা শুরু করেছিলেন। এমতাবস্থায় মুসলিম ইব্‌ন আকীল (রা.) মুহাম্মদ বিন আসআদকে বললেন, যদি পার তাহলে আমার যবানিতে হুসায়িনের নিকট বার্তা পাঠিয়ে দাও; যাতে তিনি ফিরে যান। মুহম্মদ ইব্‌ন আশ‘আদ হুসায়িনের নিকট দূত মারফত বার্তা পৌঁছে দিলেন। কিন্তু দূতের কথায় তাঁর আস্থা হলো না। তাই তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র ইচ্ছা অনিবার্য।(চলবে)

(দ্য রিপোর্ট/একেএমএম/আসা/অক্টোবর ১৬, ২০১৫)