প্রচ্ছদ » ফিচার » বিস্তারিত

‘শব্দাবলী’র অগ্রযাত্রা

২০১৫ অক্টোবর ১৭ ১৩:৫৪:৩৫
‘শব্দাবলী’র অগ্রযাত্রা

বিধান সরকার, বরিশাল : হাঁটি-হাঁটি পা পা করে ২৫ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে বাংলাদেশের প্রথম স্টুডিও থিয়েটার ‘শব্দাবলী’। অবশ্য এরমধ্যেই তাদের অর্জনটাও সামান্য নয়। দেশ ও দেশের বাইরে তারা একদিকে যেমন সুনাম কুড়িয়েছে, অন্যদিকে ক্রমেই নিজেদেরকে করেছে সমৃদ্ধ। কেবল তা-ই নয়— এ যাবত প্রায় আড়াই হাজার নাট্যকর্মীও গড়ে তুলতে পেরেছে সংগঠনটি।

এক যুগ ধরে জাতীয় পর্যায়ে সেরা দশ নাটকের তালিকায় রয়েছে শব্দাবলীর তিনটি নাটক। বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় সংগঠনটির স্বীকৃতি-স্বরূপ চলতি বছরের এপ্রিলে ১০ লাখ টাকা দিয়ে আর্থিকভাবে সহযোগিতাও করেছে।

বাংলাদেশে প্রথম স্টুডিও থিয়েটার ‘শব্দাবলী’ প্রবর্তন করে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনন্য নাম ‘শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার’ নামের সংগঠনটি। সংগঠনটির জন্ম ১৯৭৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। আর নতুন একটি ধারণা নিয়ে স্টুডিও থিয়েটার শব্দাবলীর যাত্রা শুরু ১৯৯১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বরিশাল নগরীর লুকাস কম্পাউন্ডে। স্টুডিও থিয়েটারের কারণে— নিজস্ব মঞ্চ, দর্শক গ্যালারি, সাউন্ড সিস্টেম, আলোকসজ্জা সব-মিলিয়ে যেখানে রিহের্সাল সেখানেই নাটক মঞ্চায়নের সুব্যবস্থা হয় সেবারই প্রথম বাংলাদেশে।

২৫ বছরে শব্দাবলীর প্রযোজিত ২৪টি নাটকের ১৩ শ’র অধিক প্রদর্শনী হয়েছে। এর-মধ্যে শিলারী, নীল ময়ূরীর যৌবন ও রোমিও-জুলিয়েট এক দশক ধরে জাতীয় পর্যায়ে দশটি নাটকের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

কেবল তা-ই নয়, তারা শিশু থিয়েটারও গড়েছে— যার বয়স পেড়িয়েছে এক দশক। স্টুডিওর সংস্কার কাজের পর ৯ অক্টোবর শিশুনাটক ‘হাট্টি মাটিম টিম’-এর মাধ্যমে ফের নাটক মঞ্চায়ন করে চলছে শব্দাবলীর নাট্যকর্মীরা। শিশুনাটকের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ দেশের বাইরেও বেশ আলোচিত হয়েছে।

শব্দাবলীর নাট্যকর্মী মিথুন সাহা তাদের সংগঠন সম্পর্কে বললেন, ‘আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করি শতভাগ কাজের মধ্যদিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতে। তাই দেশ ও দেশের বাইরে শব্দাবলীর নাটক বেশ আগ্রহ দেখায় দশর্করা। এমন কাজ করতে পারাতে আমরাও তৃপ্ত।’

শব্দাবলীর নাট্যকার ও নির্দেশক অনিমেষ সাহা লিটু বললেন, ‘সময় উপযোগী, শিল্প মানসম্পন্ন নাটক তৈরী করে শব্দাবলী। এ ছাড়াও আমরা নাটক নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করে থাকি। প্রতিটি প্রযোজনা আমাদের কর্মশালানির্ভর। এক্ষেত্রে বিভিন্ন একাডেমীর নাট্য নির্দেশনায় ডিগ্রিধারীদের দিয়ে নির্দেশনা করানো হয়।’

অনিমেষ সাহা লিটু আরও বললেন, ‘কলকাতার প্রবীর গুহ থেকে শুরু করে দেশের খ্যাতিমান নাট্য নির্দেশকরা শব্দাবলীর নাটক প্রযোজনায় কাজ করেছেন। এমনকি বিশ্ব শিশুনাট্য উৎসবের জনক ফ্রান্সের জন মার্চার শব্দাবলীর নাটক দেখে উচ্চাশা পোষণ করেছেন। শব্দাবলীর এই স্টুডিও থিয়েটারে নাটক দেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ, মামুনুর রশীদ, রামেন্দ্র মজুমদার, আলী জাকের, নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, তারেক আনাম, সেলিনা হোসেন, ইমদাদুল হক মিলন, সারা জাকের প্রমুখ তথা দেশের নাট্য জগতের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা।’

‘দেশের বাইরে ভারতের মুম্বাই ছাড়া অন্যসব প্রদেশে ও ক্রোয়েশিয়ায় নাটক নিয়ে গেছেন। দর্শক প্রশংসা ও উপহার পেয়েছেন বেশ।’— যোগ করলেন তিনি।

শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটারের সভাপতি সৈয়দ দুলাল জানালেন, শুরুতে ৫ টাকা দর্শনী নেওয়া হতো, এখন তা ৩০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রতি শুক্রবার তারা স্টুডিও থিয়েটারে নাটক মঞ্চস্থ করে থাকেন। তাদের দেখে ঢাকার ‘পালাকার’ ও চট্টগ্রামের ‘থিয়েটার অব চিটাগং’ স্টুডিও থিয়েটার গড়েছিলেন। তবে শব্দাবলীরটাই আজো টিকে আছে। এ জন্য সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থেকে স্বীকৃতি ও পেয়েছেন ১০ লাখর টাকার অনুদান স্টুডিও সংস্কারের জন্য।

শব্দাবলীর কর্ণধর সৈয়দ দুলাল বললেন, ‘প্রতি বছর শব্দাবলী থেকে ৭০ থেকে ৮০ জন নাট্যকর্মী গড়ে তোলা হয়। যার গড় হিসেবে এ যাবত আড়াই হাজারের বেশী নাট্যকর্মী এখান থেকে তৈরী হয়েছে। যাদের মধ্যে অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। তবে বছর তিনেক হল কিছুটা ভাটা পড়েছে নাট্যকর্মী হওয়ার আগ্রহে। এর নেপথ্যে শিশু-কিশোরদের অতিমাত্রায় ইন্টারনেট নির্ভর হয়ে পড়ার বিষয়টি প্রধান কারণ বলে মনি করি।’

সৈয়দ দুলাল জোর দিয়ে বললেন, ‘আমি মনে করি একজন নাট্যকর্মী বা সংস্কৃতিকর্মী কখনো সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী, মৌলবাদী বা দেশদ্রোহী হতে পারে না। এমনকি ওমন ধ্যান-ধারণা থাকলেও আমাদের সংগঠনে বছর খানেক কাজ করলেই আপনা থেকে বদলে যায় তারা।’

শব্দাবলীর কর্ণধর সৈয়দ দুলালের ইচ্ছা— সমাজ বদলে দেওয়া নাটক নিয়ে তিনি হাজির হতে চান প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

(দ্য রিপোর্ট/আইজেকে/অক্টোবর ১৭, ২০১৫)