প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

রাশেদুন নবী রানা

ইবি প্রতিনিধি

ইবির ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের কাণ্ড

২০১৫ অক্টোবর ১৭ ১৯:০৯:১৫
ইবির ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের কাণ্ড

সরকারি অর্থ ব্যয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার ‘বিলাসিতার প্রতিযোগিতা’য় নেমেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক আকামুদ্দিন বিশ্বাস স্বাক্ষরিত একটি লিখিত তুলনামূলক ব্যয়ের বিবরণীতে এ অভিযোগ করা হয়। এ অভিযোগ প্রকাশ পেলে ক্যাম্পাসে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

চলতি মাসের ১০ অক্টোবর ইউজিসি তদন্ত কমিটির কাছেও এই বিবরণী জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই তিন কর্তাব্যক্তি নিয়মবহির্ভূতভাবে মোটা অঙ্কের টিএ-ডিএ বিল উত্তোলন, যে যার মতো পরিবহন জ্বালানী ব্যয়, ব্যক্তিগত কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ির ব্যবহার, সরকারি অর্থ দিয়ে নিজ বাড়ি মেরামতসহ কয়েক লক্ষাধিক টাকার অপচয় করেছেন।

ওই নথি থেকে আরও জানা যায়, ভিসির তুলনায় প্রো-ভিসি ১৯ লাখ ৫১ হাজার ১ শ’ ৩২ টাকা বেশী ব্যয় করেছেন।

এ সংক্রান্ত ব্যয় বিবরণীর অনুলিপি দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদকের সংগ্রহে রয়েছে।

অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক আকামুদ্দিন বিশ্বাস স্বাক্ষরিত ওই নথিতে ইবি প্রশাসনের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারারের অর্থ অপচয়ের একটি তুলনামূলক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল হাকিম সরকার ৩১ ডিসেম্বর ২০১২ যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত টিএ-ডিএ আনুষঙ্গিক বিল ৭ লাখ ৩৪ হাজার, ৩ শ’ ৯ টাকা, পরিবহন জ্বালানী বাবদ অগ্রিম ৬ লাখ, ৩৩ হাজার, ৭ শ’ ৯১ টাকা, গাড়ি মেরামত বাবদ ১২ হাজার ৪ শ’ ১৫ টাকা, পরিবহন পুল হইতে জ্বালানী ৯ লাখ, ৪৯ হাজার, ১ শ’ ৯৮ টাকা— অর্থাৎ মোট ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৭ শ’ ১৩ টাকা উত্তোলন করেছেন।

প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে যোগদানের পর থেকে টিএ-ডিএ ও আনুষঙ্গিক বিল বাবদ ১৩ লাখ, ৫০ হাজার, ৩ শ’ ৩৯ টাকা, জ্বালানী বাবদ অগ্রিম ৪ লাখ, ৪৮ হাজার ৫ শ’ ৬২ টাকা, গাড়ি মেরামত বাবদ ১ লাখ ২৩ হাজার, ৪ শ’ ৪৭ টাকা, পরিবহন পুল হতে জ্বালানী ২০ লাখ ২২ হাজার, ৫ শ’ ৯৭ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ছাড়াই নিজ ক্ষমতাবলে অবৈধভাবে নিজ বাড়ি মেরামত বাবদ ২ লাখ ৯৫ হাজার, ৯ শ’ টাকা— অর্থাৎ মোট ৪২ লাখ ৪০ হাজার, ৮ শ’ ৪৫ টাকা উত্তোলন করেছেন।

অপরদিকে ট্রেজারার প্রফেসর ড. আফজাল হোসেন যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত টিএ-ডিএ ও আনুষঙ্গিক বিল বাবদ ৪ লাখ, ৮০ হাজার, ৫ শ’ ৯৩ টাকা, জ্বালানী বাবদ অগ্রিম ২ লাখ, ১৬ হাজার ৭ শ’ ৪৫ টাকা, গাড়ি মেরামত বাবদ ৫০ হাজার, ৯ শ’ ৭৩ টাকা, পরিবহন পুল হতে জ্বালানী তেল বাবদ ৭ লাখ ৪৫ হাজার, ৪ শ’ ৯৬ টাকা— অর্থাৎ মোট ১৪ লাখ ৯৩ হাজার, ৮ শ’ ৭ টাকা উত্তোলন করেছেন।

এই তিন কর্তাব্যক্তির একত্রে প্রায় তিন বছরে মোট ৮০ লাখ, ৬৪ হাজার, ৩ শ’ ৬৫ টাকা ব্যয় করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের প্রায় এক অংশ। এখানে তুলনামূলকভাবে দেখানো হয়, ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল হাকিম সরকারের তুলনায় প্রো-ভিসি প্রফেসর ড. শাহিনুর রহমান ১৯ লাখ ৫১ হাজার ১ শ’ ৩২ টাকা বেশী ব্যয় করেছেন।

এ ছাড়াও পরিবহন শাখার উপ-রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত একটি নথি থেকে জানা গেছে, প্রো-ভিসি শাহিনুর রহমান যোগদানের পর থেকে তার ব্যবহৃত গাড়ি নং (কু-ঘ-১১-০০২৭ পাজেরো জীপ) গত বছরের ফেব্রুয়ারি ১৩ থেকে মার্চ ১৪ পর্যন্ত ৭ হাজার ৩ শ’ ২০ লিটার জ্বালানী ব্যবহার করেছেন, যার মূল্য রয়েছে ৭ লাখ ৮১ হাজার ৮ শ’ ৩২ টাকা। আর ব্যক্তিগত কাজে ১০ হাজার ৯ শ’ ৯৮ টাকা জ্বালানী ওই গাড়িতে ব্যবহার করেছেন।

আর চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ৭ শ’ ৩২ লিটার জ্বালানী ব্যবহার করেছেন। যার ব্যবহৃত জ্বালানী ও লুব্রিকেটসের মূল্য ১২ লাখ, ৪০ হাজার ৭ শ’ ৬৫ টাকা। আর ব্যক্তিগত কাজে ২৮ হাজার, ৮ শ’ ২৩ টাকার জ্বালানী ব্যবহার করেছেন।

প্রো-ভিসির মোটা অঙ্কের এই অর্থ বিলাসিতার তথ্য ফাঁস হওয়ায় তিনি পরিবহন প্রশাসকের কাছে পুরাতন নথিপত্রের ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য ঘষামাজা করে নতুন করে একটি ব্যয়ের হিসাব তৈরী করেছেন। এ সংক্রান্ত হিসাব বিবরণীর একটি অনুলিপি এই প্রতিবেদকের সংগ্রহে রয়েছে। এই হিসাব বিবরণীতে পরিবহন প্রশাসক ড. মামুনুর রহমানের স্বাক্ষর রয়েছে। এতে দেখা যায়, কুষ্টিয়া-ক্যাম্পাস-কুষ্টিয়া চলাচলের জন্য জ্বালানী খরচ বাবদ ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৫১২ টাকা আর কুষ্টিয়া-ঢাকা/অন্যত্র-কুষ্টিয়া চলাচলের জন্য ৭ লাখ ৮৯ হাজার ১ শ’ ৪০ টাকা আর ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ভাড়া হিসেবে ৩৬ হাজার ৫৭ টাকা ব্যয় করেছেন প্রো-ভিসি।

অথচ মূল নথিপত্রের হিসাব শাখার পরিচালক আকামুদ্দিন স্বাক্ষরিত বিবরণীতে যেখানে ২০ লাখ ২২ হাজার ৫ শ’ ৯৭ টাকা লেখা, সেখানে ঘষামাজা করে প্রো-ভিসি ১৪ লাখ ৮৭ হাজার ৬ শ’ ৫২ টাকা দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক কর্মকর্তা।

সম্প্রতি ভিসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে ট্রেজারারের ১৬ দফা অভিযোগের ভিত্তিতে ইউজিসি থেকে গত ১০ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত কমিটি ক্যাম্পাসে এলে হিসাব শাখার পরিচালক ইউজিসি তদন্ত কমিটির কাছে এই তিন কর্তাব্যক্তির অর্থ ব্যয়ের ওই তুলনামূলক বিবরণ পেশ করেন।

এ ব্যাপারে পরিবহন প্রশাসক প্রফেসর ড. মামুনুর রহমান দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘পরিবহন জ্বালানী বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন অফিস থেকে কোনো বরাদ্দ নির্ধারণ করা নেই। সুতরাং যে যার মতো এই জ্বালানী ব্যবহার করে থাকেন।’

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক আকামুদ্দিন বিশ্বাস দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমার কাছে হিসাবের নথিপত্রে যা লেখা ছিল, সেই হিসাবটাই উল্লেখ করেছি। এখানে কোনো অস্বচ্ছতা নেই। তারা যে হারে অর্থ ব্যয় করছেন সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দের মোটা অংশ।’

এ বিষয়ে প্রো-ভিসি ড. শাহিনুর রহমানের কাছে তার এই ব্যয়ের বিবরণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জন্য ক্যাম্পাসে কোনো বাসা বরাদ্দ নেই। কুষ্টিয়া থেকে দৈনিক ২২ কিলোমিটার পথ গাড়ি ব্যবহার করে চলাচল করতে হয়। ভিসি মহোদয়ের জন্য তো ক্যাম্পাসে বাসা বরাদ্দ রয়েছে। সুতরাং তার থেকে আমার পরিবহন ব্যয় বেশী হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর বাড়ি মেরামতের জন্য একটি টাকাও আমি নেইনি।’

‘হিসাব শাখার পরিচালক যে তথ্য দিয়েছেন তা অসঙ্গতিপূর্ণ ও অস্বচ্ছ। আমি এর প্রতিবাদ জানাই। আমি পরিবহন প্রশাসকের কাছে থেকে যে হিসাব নিয়েছি সেটাই স্বচ্ছ। আমাকে হেয় করার জন্য এভাবে আমার পিছনে লেগেছে একটি পক্ষ,’ বলেন তিনি।

ভিসি প্রফেসর ড. আব্দুল হাকিম সরকার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এতদিন সারাদেশে প্রায় ১৪ শ’ ফাযিল-কামিল মাদ্রাসা ছিল। সেগুলোতে পরিদর্শন করতেই অতিরিক্ত পরিবহন জ্বালানী ব্যবহার হয়েছে। তবে সবার উচিত ছিল একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যয় করা। যার যেটুকু ব্যয় হয়েছে সে তার ব্যয়ের হিসাব দিতে হবে। আমি আমার ব্যয়ের হিসাব দিতে রাজী।’

(দ্য রিপোর্ট/আইজেকে/এএসটি/সা/অক্টোবর ১৭, ২০১৫)