প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

মুহম্মদ আকবর

দ্য রিপোর্ট

লেখক-প্রকাশকের অসচেতনতায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না কপিরাইট আইন

২০১৫ অক্টোবর ১৭ ২০:১৯:৩৮
লেখক-প্রকাশকের অসচেতনতায় বাস্তবায়ন হচ্ছে না কপিরাইট আইন

কপিরাইট আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় বুক-পাইরেসি, অর্থসম্মানী ও বাজারজাতকরণসহ নানা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। অথচ লেখক-প্রকাশক তথা সংশ্লিষ্টদের অসচেতনতা ও অনাগ্রহে আইনটি বাস্তবায়নও সম্ভাব হচ্ছে না।

বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা ও লেখকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আইনের কার্যকারিতা সম্পর্কে তারা অবগত নন। তারা জানেন না কপিরাইট আইন কী বা এর সংকট ও সম্ভাবনার কথা। আর এটি সম্পর্কে যারা স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করেন তারাও যে এর যথাযথ প্রয়োগ করছেন এমনটাও জোর দিয়ে বলার অবকাশ নেই। এই সুযোগে অবৈধ উপায়ে আয়ের পথে নেমেছে একদল অসাধু ব্যবসায়ী। ফলে, কেবল ‘বাক্সবন্দী’ হয়েই থাকছে এ আইনটি।

লেখক প্রকাশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা কখনো সচেতনভাবে কখনো এর কার্যকারণ না জেনেই এটির প্রতি অবহেলা করে যাচ্ছেন।

কপিরাইট আইন ও এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির যুগ্ম-নির্বাহী পরিচালক এবং নালন্দা প্রকাশনীর মালিক রেদওয়ানুর রহমান জুয়েল দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘হাতে গোনা দু’-একজন ছাড়া কারো সঙ্গে কোনো প্রকার চুক্তি সম্পাদন করেনি। এটার আবশ্যকতা আছে কি-না এ বিষয়ে জানা নেই।’

চারুলিপি প্রকাশনীর মালিক হুমায়ুন কবীর দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘চুক্তির বিষয়ে মুক্তধারা ও ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এ ছাড়া আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি দেশের কোনো প্রকাশক চুক্তি করাকে প্রয়োজন মনে করে না। একইভাবে লেখকরাও উৎসাহ বোধ করেন না। নিজের প্রকাশনী সম্পর্কে আমি বলব আমিও খুব একটা চুক্তি করিনি। অবশ্য, সৈয়দ শামসুল হকের মতো লেখকদের ক্ষেত্রে আমি চুক্তির কাজটি করেছি।’

স্বনামধন্য লেখক অধ্যাপক যতীন সরকার এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত কোনো প্রকাশকের সঙ্গে আমার লিখিত চুক্তি হয়নি। তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকার কারণে আমার বই ছাপায় টাকা দেয়। এ নিয়েই আমি খুশী।’

কপিরাইট আইনে চুক্তির বিষয়টি প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি জানি না। কপিরাইট আইনে কী আছে-না আছে— এ বিষয়ে আমার ধারণা নেই। আগ্রহও নেই।’

তরুণ কবি পিয়াস মজিদের কাছে জানতে চাওয়া হলেও অনেকটা একই রকম কথা বললেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘লেখক প্রকাশকদের মধ্যে ভাল সম্পর্কের জন্যই বোধহয় এমনটা হয়। এর জন্য কাউকেই এককভাবে দায়ী করা যাবে না। কারণ, আমাদের দেশে এর প্রয়োগ সেভাবে হয়নি, হচ্ছে না।’

কপিরাইট আইন বাস্তবায়ন হলে প্রকাশনা শিল্পে কোন্‌ ধরনের প্রভাব ফেলবে এ বিষয়ে কপিরাইট বিশেষজ্ঞ মনজুরুর রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি এ আইনের সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। মনজুরুর রহমান বলেন, ‘এ আইনটির বাস্তবায়ন হলে প্রকাশনা শিল্পে এক ধরনের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কেউ কারও দ্বারা প্রতারিত হবে না।’

মনজুরুর রহমান বললেন, ‘কপিরাইট আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী লেখক প্রকাশক একটি চুক্তি করবে। প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদকাল ও বাজারজাতকরণের স্থান, সম্মানীসহ প্রকাশনার সার্বিক বিষয়াদি উল্লেখ থাকবে। এতে করে একে অপরের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রতারণার আশঙ্কা থাকে না। চুক্তির পর যদি লেখক অন্য প্রকাশনী থেকে বই বের করে তাহলে সেটা পাইরেটেড বই বলে গণ্য হবে। যার সর্বোচ্চ শাস্তি চার বছর কারাদণ্ড অথবা ৪ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয়দণ্ড হতে পারে। একইভাবে লেখকের অনুমতি ব্যতীত প্রকাশক কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা-ও কপিরাইট আইন লঙ্ঘন হবে এবং একই শাস্তি ‍প্রযোজ্য হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কতদিনের জন্য চুক্তি হল, কোথায় বাজারজাত হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে এ চুক্তির মেয়াদ ধরা হবে পাঁচ বছর এবং বাংলাদেশের বাইরে ওই বই বিক্রি করা যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, “কোনো ধরনের চুক্তি না থাকলেও দেশের বাইরে বই আমদানি ও রফতানি করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত, যা আইন বহির্ভূত। অন্যদিকে, বিশ্বের জনপ্রিয় অনেক বই আছে যা অনুবাদ করে এ দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এটাও কপিরাইট আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী মূল লেখক কিংবা প্রকাশকের অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করতে হবে। বইটি যদি লেখক-প্রকাশকের অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশের প্রয়োজন হয়, তাহলে কপিরাইট বোর্ডের নিকট থেকে ‘কম্পোলসারি লাইসেন্স’ করে অনুমোদন নিতে হবে।”

দ্য রিপোর্ট’র অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে এ আইন সৃষ্টির পর ঢালাওভাবে ব্যবসা চললেও আজ অবধি সারা দেশে একজনও সে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেননি।

এদিকে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে এ ধরনের আইনী প্রয়োগ না হওয়ায় এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী বুক পাইরেসির মাধ্যমে অবৈধ আয় করছে। লেখক-প্রকাশকের চুক্তি না থাকায় আইনী ফাঁকফোকরে এটির প্রতিবাদও করতে পারছেন না কেউ। ফলে কেবল সচেতনতার অভাবে প্রতিনিয়ত নেমে আসছে লেখক-প্রকাশক ও সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

কপিরাইট আইনের ৯৩ ধারায় বলা আছে— ‘সাব ইন্সপেক্টরের নিচে নয় এমন ব্যক্তি কোনো প্রকার ওয়ারেন্ট ছাড়াই পাইরেটেড কার্যক্রম জব্দ করতে পারবেন।’ অথচ নীলক্ষেত থানার ভবন ঘেঁষেই রয়েছে পাইরেটেড বইয়ের বৃহৎ বাজার এবং সেখানে এ সব পাইরেটেড বইয়ের অবাধ কেনা-বেচা।

প্রশাসনিক অবহেলার আরেকটি স্পষ্ট উদাহরণ হল— এ বিষয়ে কোনো ধরনের পরিসংখ্যান না থাকা। কপিরাইট অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, কপিরাইট আইন প্রয়োগের অভাবে কী ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বাংলাদেশে সরকারিভাবে কোনো পরিসংখ্যান নেই। বেসরকারিভাবে এ কাজ করতেও নেই কোনো প্রশাসনিক সহযোগিতা।

এ কারণে প্রকাশনা খাতে কী পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে এর একটি বেসরকারি জরিপ করেছে ‘ইন্টিলেকচুয়াল প্রপার্টি এসোসিয়েশান অব বাংলাদেশ’। সে জরিপ তুলে ধরে জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাহী সম্পাদক কামরুল হাসান শায়ক দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘কপিরাইট আইন অমান্য করে বুক পাইরেসির কারণে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ প্রকাশনা ব্যবসায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৬১ কোটি ২০ লাখ ২৫ হাজার টাকা) ক্ষতি হয়েছে।’ একই কারণে বৈশ্বিক ক্ষতির পরিমাণও তুলে ধরা হয় এ জরিপে।

কামরুল হাসান শায়ক আরও বলেন, ‘বুক পাইরেসির কারণে পাকিস্তানের প্রকাশনা ব্যবসায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রাশিয়ার ক্ষতি ৪২ মিলিয়ন, থাইল্যান্ডের ক্ষতি ৩৭ মিলিয়ন, ইতালিতে ২০ মিলিয়ন ও চিলির ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।’

বুক পাইরেসির কারণে এ ক্ষতির তালিকায় বাংলাদেশের স্থান পঞ্চম। যা এড়াতে পারলে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব হতো।

এ বিষয়ে কপিরাইট অধিদফতরের উপ-পরিচালক জহুরা বেগম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের একটা টাস্কফোর্স আছে। এ সব অপরাধীকে ধরতে তারা সার্বক্ষণিক তৎপর। আইনের যে সব ধারা সময়ের সঙ্গে গরমিল রয়েছে সেসবকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আমরা চিঠির মাধ্যমে কপিরাইট আইনের ৯৩ ধারা পুলিশকে অবহিত করতে প্রতিটি জেলায় ডিসি (জেলা প্রশাসক) বরাবর চিঠি দিয়েছি।’

‘কপিরাইট আইনের বাস্তবায়ন হয় পুলিশের মাধ্যমে। তাই আমরা পুলিশের সঙ্গে একাধিক সেমিনার করব। প্রত্যাশা রাখছি অচিরেই একটা ভাল ফল পাব,’ যোগ করেন তিনি।

(দ্য রিপোর্ট/এমএ/এএসটি/আইজেকে/এনআই/অক্টোবর ১৭, ২০১৫)