প্রচ্ছদ » অর্থ ও বাণিজ্য » বিস্তারিত

৩২ লাখ কোটি টাকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

২০১৫ অক্টোবর ১৭ ২১:০৪:০৪
৩২ লাখ কোটি টাকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

জোসনা জামান, দ্য রিপোর্ট : অনুমোদন পেতে যাচ্ছে প্রায় ৩২ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। আগামী পাঁচ বছরে (২০১৬-২০) এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে।

এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের রূপকল্প (প্রেক্ষিত পরিকল্পনা) বাস্তবায়ন, কৃষি থেকে শিল্প অর্থনীতিতে উত্তরণ, নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরের পথ প্রশস্তকরণ এবং অর্থনীতিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে এই মহাপরিকল্পনা। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা। এর প্রস্তুতি হিসেবে ইতোমধ্যেই বৈঠক সেরে নিয়েছে এ বিষয়ে গঠিত স্টিয়ারিং কমিটি।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনাটির খসড়া তৈরি করেছি। এখন শুধু অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য অর্জনে সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া বিষয় বা দিক হল— ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং জনগণের আয় বণ্টন ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য হারে উন্নীত করা। এ পরিকল্পনায় অর্জিত প্রবৃদ্ধিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কৌশল ও কর্মপন্থাসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুশাসন নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমেই দেশকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ে এবং পরবর্তী সময়ে উন্নত দেশে পরিণত করা সম্ভব হবে।’

জিডিপি প্রবৃদ্ধি

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাস্তবায়ন শুরুর অর্থবছর ২০১৬-তে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হচ্ছে ৭ শতাংশ। ২০১৭ অর্থবছরে ৭.২ শতাংশ, ২০১৮ অর্থবছরে ৭.৪ শতাংশ, ২০১৯ অর্থবছরে ৭.৬ শতাংশ এবং পরিকল্পনার শেষ বছর ২০২০ অর্থবছরে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের টার্গেট রয়েছে।

প্রবৃদ্ধির এ লক্ষ্য পূরণে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় শিল্প (ম্যানুফেকচারিং) খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১০.৮ শতাংশ। সেবা খাতে গড় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬.৩ শতাংশ এবং পাঁচ বছরে কৃষি খাতে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩.৩ শতাংশ। অন্যদিকে, শিল্প, সেবা ও কৃষি এই তিন খাত মিলে আগামী পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭.২ শতাংশ।

অন্যান্য লক্ষ্য

এই পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরের অন্যান্য লক্ষ্যগুলো হল— মূল্যস্ফীতি বর্তমানের (২০১৫ সাল) ৬.৫ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে ৫.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। মোট বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২৭.৬ শতাংশ থেকে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির ৩৪.৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। জাতীয় সঞ্চয় বর্তমানে জিডিপির ২৯.১ শতাংশ থেকে ২০২০ সালে জিডিপির ৩২.১ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। ভোগ বর্তমানে জিডিপির ৭৭.৭০ শতাংশ থেকে পাঁচ বছরে জিডিপির ৭৩.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। আগামী পাঁচ বছরে দেশী-বিদেশী মিলে নতুন ১ কোটি ৩২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যয়

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার পুরোটা বাস্তবায়নে জন্য (২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত) ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যা এ যাবতকালের সর্বোচ্চ ব্যয়ের লক্ষ্য। মোট ব্যয়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ৩ লাখ ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আগামী ৫ বছরে মোট যে ব্যয়ের (বিনিয়োগ) লক্ষ্য ধরা হয়েছে তার মধ্যে সরকারি ব্যয় ৭ লাখ ২৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি খাত (বৈদেশিকসহ) থেকে ২৪ লাখ ৬৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে শেষ হতে যাওয়া ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় গত পাঁচ বছরে ব্যয়ের যা লক্ষ্য ছিল তার চেয়ে আগামী পাঁচ বছরে ব্যয় হবে দ্বিগুণেরও বেশি।

পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া বিষয়গুলো হচ্ছে— কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ গঠন, বিদ্যুৎ উন্নয়ন, জ্বালানী ও যোগাযোগ খাতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ, আইসিটি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানিতে সুনির্দিষ্ট নীতিকৌশল প্রণয়ন, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে গতিশীলতা আনা এবং রফতানির গতিশীলতা আনতে পণ্যের বৈচিত্র্য আয়ন।

মধ্য আয়ের পথ

আগামী পাঁচ বছরে মধ্য আয়ের দেশে যেতে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে যে সব লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলো হল— বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে চিহ্নিত সীমাবদ্ধতা দূর করে মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা; পাবলিক বিনিয়োগ ঘাটতি দূর করতে আধুনিকায়ন পরিকল্পনা তৈরি; বিদ্যুত ও জ্বালানীর সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও ভর্তুকির পরিমাণ যুক্তিযুক্তকরণ; সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন ও গতিশীলতা আনয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ; পোশাক খাত থেকে লব্দ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অ-পোশাক রফতানি খাতের জন্য উদ্দীপক কাঠামোর উন্নতিকরণ; রফতানি সম্ভাবনাসহ কৃষি কৌশল পুনর্বিবেচনা করা; কৃষকদের ভাল প্রণোদনা প্রদানে মূল্য নীতি প্রণয়ন ও গ্রামীণ অবকাঠামোর ওপর বেশি জোর প্রদান করা; পশু ও মৎস্য ক্ষেত্রে মনোযোগ সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প খাতে প্রমাণভিত্তিক নিরূপণ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের সাহায্যে সঠিক কৌশল নির্ধারণ করা এবং আইসিটি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংক্রান্ত সেবা রফতানি বৃদ্ধির লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট বিধিগত এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা ও এর সুনির্দিষ্ট সমাধানের জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালনা করা।

সুশাসনে বিশেষ নজর

আগামী পাঁচ বছরে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিচার ও আইনের শাসন, সরকারি প্রশাসনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুশাসন উন্নীত করার বিভিন্ন কৌশল হাতে নেওয়া হয়েছে এই পরিকল্পনায়। পরিকল্পনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে যে সব কৌশল নেওয়া হচ্ছে সেগুলো হল— বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সুপ্রীম কোর্টে বিচারক নিয়োগে সহজ ও স্বচ্ছ মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জনগণের প্রবেশগামিতা চালু করতে কোর্টের মামলাসমূহের রেকর্ড এবং অনুসরণ পদ্ধতি কম্পিউটারভিত্তিক করা। ভূমি সংক্রান্ত মামলাসমূহ দ্রুত নিস্পত্তির জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নতুন কার্যকর পদক্ষেপ প্রবর্তন করা হবে। সরকার ন্যাশনাল লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস অর্গানাইজেশন (এনএলএএসও)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি সহায়তা করবে। উন্নয়ন অংশীদারিত্বে স্থানীয় সরকার নিজস্ব আয় বৃদ্ধি সাপেক্ষে অধিকতর শক্তিশালীকরণে পদক্ষেপ নেবে।

এ ছাড়া পরিকল্পনায় সরকারি প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত করতে সক্ষমতা বৃদ্ধির কৌশলগুলো হচ্ছে— সরকাররি কর্মচারী আইন-২০১৫ এর চূড়ান্ত অনুমোদন ও তা বাস্তবায়ন। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের বাস্তবায়ন। মন্ত্রণালয়গুলোর বার্ষিক কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা উন্নতকরণ এবং পদের শূন্যতা ও নিয়োগের স্বচ্ছতা আনা এবং সেই সাথে নিয়োগে সমযোগ্যতায় নারীদের প্রাধান্য দেওয়া।

অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করতে যে সব কৌশল নেওয়া হচ্ছে সেগুলো হল— বাংলাদেশ ব্যাংকের পেশাদারিত্বের উৎকর্ষ সাধনে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারি ব্যাংকসমূহে তদারকি বৃদ্ধি। ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সুশাসন উন্নীতকরণ। মূলধন বাজার পরিচালন পদ্ধতি উন্নীতকরণ। কর ফাঁকি হ্রাসে পরিচালন পদ্ধতির উন্নয়ন করা এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ও ন্যায়পরায়ণতা সম্প্রসারণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

(দ্য রিপোর্ট/জেজে/একেএস/সা/অক্টোবর ১৭, ২০১৫)