প্রচ্ছদ » বিশেষ সংবাদ » বিস্তারিত

রানা মুহম্মদ মাসুদ

দ্য রিপোর্ট

বাস্তবায়ন নেই কর্মপরিকল্পনার

প্রবীণরা নামেই সিনিয়র সিটিজেন

২০১৫ অক্টোবর ১৮ ২০:৪২:৪৯
প্রবীণরা নামেই সিনিয়র সিটিজেন

প্রায় এক বছর আগে ষাট ও ষাটোর্ধ্ব বয়সের প্রবীণদের ‘সিনিয়র সিটিজেন (জ্যেষ্ঠ নাগরিক)’ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে প্রবীণ নীতিমালার আলোকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে একটি কর্মপরিকল্পনাও করে সরকার। তবে সেটি বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাই প্রবীণরা নামেই সিনিয়র সিটিজেন হয়ে আছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’ অনুযায়ী গত বছরের ২৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ষাট ও ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবীণ রয়েছেন।

জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে প্রবীণদের সব ধরনের পরিবহনে কম ভাড়ায় যাতায়াত, হাসপাতালগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যে আলাদা চিকিৎসাসেবা, আলাদা বাসস্থানের সুবিধা, প্রবীণ স্বাস্থ্য বীমা চালুসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এ সব ‍সুবিধা নিশ্চিত করবে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন থেকে সিনিয়র সিটিজেনদের আলাদা পরিচয়পত্রও দেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এটি বাস্তবায়নে মূলত কোনো তৎপরতা নেই। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়ে গত জুন মাসে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক উল ইসলাম দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে প্রবীণদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। কেউ কেউ উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে বলে আমরা জেনেছি।’

‘কেউ পদক্ষেপ না নিলে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা তাগিদ দিতে পারি। সবাইকে তাগিদ দিয়ে চিঠিও পাঠানো হয়েছে,’ বলেন সচিব।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিনিয়র সিটিজেন হিসেবে প্রবীণদের সুযোগ-সুবিধা দিতে প্রবীণ বিষয়ক জাতীয় কমিটি জাতীয় অধ্যাপক এম আর খানকে প্রধান করে একটি কোর কমিটি গঠন করে। কোর কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী একটি এ্যাকশন প্ল্যান (কর্মপরিকল্পনা) করা হয়।

এ বিষয়ে এম আর খান দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘কিছু যে হচ্ছে না এটা তো সবাই দেখতেই পাচ্ছে। আমরা কর্মপরিকল্পনা করে মন্ত্রণালয়কে জমা দিয়েছি, এরপর আমাদের আর কিছু বলার নেই।’

সরকারি ও বেসরকারি আবাসনে বাথরুমসহ মাতা-পিতার জন্য একটি আলাদা কক্ষ (প্যারেন্টস রুম), প্রবীণবান্ধব যাত্রী ছাউনীর ব্যবস্থা, যাতায়াতের উপযোগী রাস্তা, প্রবীণ স্বাস্থ্য বীমার প্রচলনের কথা বলা হয়েছে কর্মপরিকল্পনায়।

কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, জাতীয় পরিচিত কার্ডে ষাটোর্ধ্ব সকল ব্যক্তিকে জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হবে। কার্ডের রং হবে ভিন্ন। প্রবীণরা এ কার্ডের মাধ্যমেই সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন।

সমাজকল্যাণ সচিব এ বিষয়ে বলেন, ‘এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বাকিটা নির্বাচন কমিশন করবে।’

নির্বাচন কমিশনের সচিব সিরাজুল ইসলাম এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ষাটোর্ধ্বদের আলাদা করে কোনো পরিচয়পত্র দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। এখনকার পরিচয়পত্রে তো তাদের জন্ম তারিখ থাকছেই। তারপরও প্রস্তাবটি একেবারে বাদ দিচ্ছি না, আবার হবে তাও বলছি না। আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।’

কর্মপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালে জেরিয়াটিক (বয়স্ক) বিভাগ খোলা হবে। প্রচলিত মেডিকেল শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বার্ধক্য স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ও মৃতপথযাত্রী প্রবীণদের জন্য পেলিয়াটিভ (উপশমক) কেয়ারের ব্যবস্থা করা হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রবীণদের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে টেলিমেডিসিনের ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নারী ও পুরুষ প্রবীণদের জন্য আলাদা কাউন্টার খোলা ও ১০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, সরকারি হাসপাতালে প্রবীণদের চিকিৎসা খরচ ৫০ শতাংশ ও বেসরকারি হাসপাতালে ওষুধ ছাড়া ১৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া।

প্রবীণদের জন্য ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনার থেরাপি, স্পিস এ্যান্ড ল্যাগুয়েজ থেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন) সেবা, জরুরী সেবা দিতে বিশেষ রেসপন্স টিম তৈরীর কথা বলা হয়েছে কর্মপরিকল্পনায়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ সব পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল) ফয়েজ আহমেদ দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। খুব বেশিদিন হয়নি আমি এখানে এসেছি। এ ছাড়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কোনো চিঠির কথাও আমার মনে পড়ছে না।’

সরকারি গণপরিবহনে ও বেসরকারি বিমানে প্রবীণদের জন্য ১০ শতাংশ আসন বরাদ্দ, সিটিবাসগুলোতে আলাদা তিনটি আসন সংরক্ষণ, দূরপাল্লার যানবাহনের (বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার, মনোরেল, মেট্রোরেল ইত্যাদি) টিকেটে ৩০ শতাংশ ছাড়া দেওয়ার কথা বলা হয়েছে কর্মপরিকল্পনায়।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক এ বিষয়ে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমাদের নীতিমালার মধ্যে যে সুবিধাগুলো আছে তা দেওয়া হচ্ছে।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মৃত্যুহার কমে গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিআইডিএস’র পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ‘১৯৯০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার চার দশমিক ৯৮ শতাংশ ছিল প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং জনসংখ্যা প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৫০ সালে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর এই হার হবে ২০ শতাংশ, অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন হবেন প্রবীণ।’

(দ্য রিপোর্ট/আরএমএম/এএসটি/সা/অক্টোবর ১৮, ২০১৫)