প্রচ্ছদ » লাইফস্টাইল » বিস্তারিত

ডা: তাওহীদা রহমান

ডার্মাটোলজিস্ট, বাংলাদেশ স্কিন সেন্টার

চুল, ত্বক ও শরীরের যত্নে ‘অয়েল’

২০১৫ অক্টোবর ১৯ ১৩:৩৯:১৬
চুল, ত্বক ও শরীরের যত্নে ‘অয়েল’

সব ঋতুতেই ত্বকের সঙ্গী ময়েশ্চারাইজার। ময়েশ্চারাইজারের অভাবে ত্বক হয়ে উঠে রুক্ষ, শুষ্ক ও প্রাণহীন। ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে সহজেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ত্বকের ধরন বুঝে সঠিক ময়েশ্চারাইজার বেছে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে অনেকেই নির্ভর করেন নামী-দামী ব্র্যান্ডের পণ্যের ওপর। এ ছাড়া ভেজাল ও ক্যামিকেলের ভয়তো আছেই। অনেকেই জানেন না কোনো কোনো ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারে ফল হয় উল্টো। সম্ভাবনা থাকে কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস, এলার্জি, র‌্যাশ ও ব্রণের মতো নানা ধরনের চর্মরোগের।

কিছুদিন আগে এ ধরনের সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসেন বিশ বছর বয়সী এক তরুণী। তার ত্বক অতিরিক্ত সেনসিটিভ। অথচ তিনি ত্বকের ধরন না বুঝেই বাজারের বহুল প্রচলিত ক্রিম ব্যবহার করছেন। ক্রিমটি হয়তো অন্য ধরনের ত্বকের জন্য উপকারী। কিন্তু সেনসিটিভ ত্বকের জন্য খুবই ক্ষতিকর।

গাছের হাইড্রেশনের জন্য যেমন পানির প্রয়োজন হয়, তেমনি ত্বকের বাহ্যিক আর্দ্রতা ধরে রাখার জন্য ময়েশ্চারাইজার খুবই জরুরী। যুগ যুগ ধরে রূপচর্যায় প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে ফুল, ফল, পাতা, বীজের নির্জাস থেকে তৈরি নানারকমের সুবাস তেল। ক্যামিকেলমুক্ত এই তেল ত্বক, নখ ও চুলের যত্নে এবং ন্যাচারাল ময়েশ্চারইজার হিসেবে ভাল কার্যকরী। শুধু কি তাই? কিছু কিছু রোগের চিকিৎসায়ও তেল কাজ করে জাদুর কাঠির মত।

চলুন জেনে নেওয়া যাক তেলের প্রয়োজনীয় কিছু উপকারিতা।

নারিকেল তেল

আমাদের মা-খালারা বলতেন দীঘল ঘন কালো চুলের রহস্য হল নারিকেল তেল। ধারণাটি কিন্তু মিথ্যে নয়। এই তেল একদিকে ন্যাচারাল কন্ডিশনার হিসেবে যেমন কাজ, করে তেমনি চুলের গোড়ায় পুষ্টি যোগায়, প্রাণহীন ও রুক্ষ চুলে আনে প্রাণের ছোঁয়া। ড্যানড্রাফ, সোরিয়াসিস এ সব স্কাল্প ডিজিজে নারিকেল তেল ওষুধের মতো কাজ করে। এ ছাড়া রিফাইন্ড নারিকেল তেল চুলের মতো ত্বকের জন্যও একটি নিরাপদ ময়েশ্চারাইজার। এটি এতই নিরাপদ যে চোখের নিচের সংবেদনশীল স্থানেও ব্যবহার করা যায় নিশ্চিন্তে। আন্ডার আই ডার্ক সার্কেল হালকা করার সাথে সাথে ত্বকের আর্দ্রতাও বাড়িয়ে দেয়। আবার মেকআপ রিমুভে নারিকেল তেলের জুড়ি নেই। যানবাহনের কালো ধোঁয়া, হিউমিডিটি, রাস্তার ধুলাবালি, রোদের প্রখরতা এ সব ত্বকের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তাই প্রতিদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরে কটন বল তেলে দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করলে লোমকূপে ময়লা জমবে না, ত্বকও থাকবে পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ।

নারিকেল তেলের সাথে চিনি মিশিয়ে স্ক্রাব বানিয়ে হালকা ঘষলে মুখের বহিঃস্তরের মৃত কোষ দূর হবে। ফলে ত্বক হবে আরও উজ্জ্বল এবং দ্যুতিময়।

জলপাই তেল বা অলিভ অয়েল

গ্রীক মহাকবি হোমার অলিভ অয়েলকে তুলনা করেছেন তরল স্বর্ণের সাথে। একসময় ইউরোপে অলিভ অয়েল তৈরি হলেও এখন সারা বিশ্বেই এই তেল বেশ জনপ্রিয়। এ যুগের মেয়েদের রূপচর্চায় অলিভ অয়েল ছাড়া যেন চলেই না। আজকাল ক্রিম, লোশন, শ্যাম্পু অনেক প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে এই তেল। এটা অতি সহজেই ত্বকের গভীরে পৌঁছে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখে। এর ক্লিনজিং ইফেক্টের কারণে ত্বকে ময়লা জমতে পারে না। রাতে শোবার আগে অলিভ অয়েল মুখে ও ঘাড়ে ম্যাসাজ করে একটি টিস্যু পেপার দিয়ে হালকা করে মুছে নিলে অতিরিক্ত তেল শুষে নেবে এবং ভাল নাইটক্রিম হিসেবে কাজ করবে। ডার্মাটোলজিস্টগণ ত্বকের ফাটা দাগ বা স্ট্রেচ মার্ক-এ অলিভ অয়েল ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এ সব ফাটাদাগে নিয়মিত ম্যাসাজ করলে দাগগুলো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে যায়। যারা বাচ্চা নিতে ভয় করেন তারা শুরু থেকেই রাতে শোবার আগে ও গোসলের পর পেট ওথাই-এ অলিভ অয়েল ব্যবহার শুরু করতে পারেন। যা অ্যান্টি স্ট্রেচ মার্ক ক্রিম হিসেবে কাজ করবে। ড্যামেজ চুল ও নখের কিউটিসল রিপেয়ারে এর ভূমিকা অতুলনীয়। মজার বিষয় হল, আজকাল ছেলেরা আফটার শেভ হিসেবেও অলিভ অয়েল ব্যবহার করছে।

কাঠবাদাম তেল বা আমন্ড অয়েল

এই তেলে চিটচিটে ভাব থাকে না। ত্বক, চুল ও নখের যত্নে এটি জাদুর মতো কাজ করে। মেয়েদের কাছে আমন্ড অয়েল বেশ সমাদৃত। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই তেলটি নিয়মিত ব্যবহারে আপনি অতি সহজেই পেতে পারেন কোমল, মসৃন, দাগহীন উজ্জ্বল ত্বক। রোদে পোড়া কালো দাগ, একজিমা, সোরিয়াসিস, এ সকল চর্মরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় কাঠ বাদাম তেল। যারা আন্ডার আই ডার্ক সার্কেল সমস্যায় ভুগছেন প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে চোখের নিচে আমন্ড অয়েল ব্যবহার করতে পারেন। শুধু তাই নয় শুষ্ক ঠোটে আমন্ড অয়েল ব্যবহারে ঠোট ফাটা সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। এটি চুলের গোড়ায় পুষ্টি জোগায়, চুলপড়া ও আগা ফাটা সমস্যার সমাধান করে এবং চুলকে করে ঘন, কালো, সিল্কি ও ছন্দময়।

টি ট্রি অয়েল

অস্ট্রেলিয়ান সেনাদের ফাস্ট এইড বক্সের নিত্যদিনের সঙ্গী এই টি ট্রি অয়েল। কিন্তু আজকাল এই অয়েল প্রসাধনী থেকে শুরু করে ত্বকের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে। পোকামাকড়ের কামড়ে জ্বালাপোড়া, হালকা কাটা ছেঁড়া, কর্নক্যানলকে সফট করতে টি ট্রি অয়েল অসাধারণ ভূমিকা পালন করে। এটি মাথায় দিয়ে ২/৩ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু করলে উঁকুন ও খুশকির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় সহজেই। তৈলাক্ত ত্বকে যে কোনো তেল ব্যবহারের আগে অনেক কিছুই ভেবে নিতে হয়। কারণ তেলের ব্যবহার ব্রণের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তৈলাক্ত ত্বকের এ সকল সমস্যার সমাধান এনে দেবে টি ট্রি অয়েল।

এক গবেষণায় দেখা গেছে ব্রণের চিকিৎসায় টি ট্রি অয়েল, বেনজয়েল পার অক্সাইডের মতো কাজ করে। এ ছাড়া র‌্যাশ, চামড়া উঠা কোনোরকম সাইড ইফেক্ট ছাড়াই অ্যান্টি ভাইরাল, অ্যান্টি ফাঙ্গাল, অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল বৈশিষ্ট্যগুলো থাকায় চিকিৎসকরা এই অয়েলকে ওষুধ হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন।

উৎসব ও পার্বণে ত্বকে চাই বাড়তি যত্ন। এ যত্নে আপনার সঙ্গী হিসেবে রাখতে পারেন তেল। সুতরাং ভেজাল ও ক্যামিকেলযুক্ত ময়েশ্চারাইজারের পিছনে না ছুটে ত্বকের ধরণ অনুযায়ী বেছে নিন আপনার পছন্দসই তেলটি।

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/এএসটি/আরকে/অক্টোবর ১৯, ২০১৫)