Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » গণমাধ্যমের খবর » বিস্তারিত

কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না সাংবাদিক আল-আমিন

২০১৫ অক্টোবর ১৯ ১৩:৪১:৩৫
কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না সাংবাদিক আল-আমিন

কাওসার আজম, দ্য রিপোর্ট : মো. আল-আমিন। এক নিভৃতচারী সাংবাদিকের নাম। ভাল ও সৎ সাংবাদিকতা এবং একই সঙ্গে একজন ভাল মানুষ হিসেবে বর্তমান সমাজে তার মতো খুব কমজনকেই পাওয়া যায়। আপাদমস্তক এ সাংবাদিক ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে (বারডেম) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের ইংরেজি বিভাগের নিউজ এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী মঙ্গলবার। এক বছর আগে প্রাণচঞ্চল এ মানুষটি হঠাৎ স্ত্রী-সন্তান, স্বজন এবং অসংখ্য সহকর্মীর মায়াজাল ছিন্ন করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। দিনটি উপলক্ষে তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম রাজধানীর দিলকুশার অফিসে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

কাজপাগল সাংবাদিক আল-আমিন

আল-আমিন ১৯৬৮ সালের ২ জুন গাইবান্ধার ডেভিট কোম্পানিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারে ১৭ বছর কাজ করেছেন। এরপর কাজের ধারাবাহিকতায় আরেক ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানের জয়েন্ট নিউজ এডিটর, প্রাইম খবর ডটকমের প্লানিং এডিটর এবং ২০১৩ সালের শেষের দিকে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের ইংরেজি বিভাগের নিউজ এডিটর হিসেবে যোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদেই নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিক আল-আমিন ছিলেন কাজের মানুষ। চুপচাপ নিজ চেয়ারে বসে নিজ দায়িত্ব পালনেই ব্যতিব্যস্ত থাকতেন। দ্য রিপোর্টের সাপ্তাহিক মিটিংয়ে তার ছিল প্রাণবন্ত উপস্থাপনা। ইউনিক সব নিউজ আইটেম বেরিয়ে আসত তার মাথা থেকে। সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরতেন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের অগ্রযাত্রার স্বার্থে। সহকর্মীদের সঙ্গে তার ছিল বন্ধুসুলভ আচরণ। কখনো তর্কে যেতেন না তিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ অফিসের ছোট বড় সবাইকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। আর তাকেও সবাই ভালবাসতেন আপনজনের মতো করেই।

নিভৃতচারী এ মানুষটি কাজ ছাড়া যেন কিছুই বুঝতেন না। মৃত্যুর চারদিন আগে (১৫ অক্টোবর ২০১৪) সাংবাদিক আল-আমিন অফিসে আসার সময় বুকে ব্যথা অনুভব করেন। ওই দিন এক পর্যায়ে তিনি রাস্তায় বসেও পড়েন। তখন বিষয়টিকে তিনি গুরুত্বই দেননি। মনে করেছিলেন এটি হয়তো গ্যাসজনিত সমস্যা। কিন্তু পরের দিন (১৬ অক্টোবর) আবারও ব্যথা অনুভব করলেন। এরপর দ্রুত তাকে রাজধানীর ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে নেন স্বজনরা। জানা গেল তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালে আনার পর থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই দিন বিকেলেই এনজিওগ্রাম করে রিং পরানো হয় তাকে। এরপর তার অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন হতে থাকে। ফুসফুসে পানি জমার কারণে ১৯ অক্টোবর দুপুর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরদিন ২০ অক্টোবর ভোর ৫টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সাংবাদিক আল-আমিন। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৬ বছর। আল-আমিনের শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন তার স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনরা। দ্য রিপোর্ট পরিবারও তার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। সহকর্মীরা ছুটে যান তার মরদেহের কাছে। শোকে বিহ্বল পরিবারকে সান্ত্বনা যোগান সবাই। ঢাকায় প্রথম দফা জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধায় পাঠানো হয় তার মরদেহ। দ্বিতীয় দফা সেখানে জানাজা শেষে বাবার কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।

সাংবাদিক আল-আমিনের মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ইউনিয়নসহ নানা সংগঠনের পক্ষ থেকে শোক এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।

দ্য রিপোর্টের যুগান্তকারী পদক্ষেপ

সাংবাদিক আল-আমিন মৃত্যুকালে স্ত্রী আফরোজা আহমেদ কাকন, মেয়ে সন্ধী ও ছেলে অলিন্দসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান। তিনি ছিলেন ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়। একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে গৃহিণী আফরোজা আহমেদ কাকন স্কুল পড়ুয়া (ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজের ৯ম শ্রেণী) সন্ধী এবং একটি ইংরেজি স্কুলে পড়ুয়া (কেজি ওয়ান) ছেলে অলিন্দকে নিয়ে হয়ে পড়েন দিশেহারা। এ অবস্থায় আল-আমিনের পরিবারের পাশে দাঁড়ায় দ্য রিপোর্ট পরিবার ও কর্তৃপক্ষ। সহকর্মী আল-আমিনের মৃত্যুর পর পরই দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু এবং নির্বাহী সম্পাদক আমিরুল ইসলাম নয়ন ঘোষণা দেন তার পরিবারের পাশে থাকবে দ্য রিপোর্ট পরিবার। মরহুমের স্ত্রী চাইলে এখানে চাকরিও করতে পারবেন। কথা রেখেছেন তারা।

মৃত্যুর দুই মাসের মাথায় ২৩ ডিসেম্বর দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের দিলকুশার অফিসে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়াত আল-আমিনের স্ত্রী আফরোজা আহমেদ কাকনের হাতে আর্থিক সহায়তা এবং দ্য রিপোর্টে তার যোগ্যতা অনুযায়ী সাব-এডিটর পদে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। এ দিন প্রধান অতিথি হিসেবে আল-আমিনের স্ত্রীর হাতে চার লাখ টাকার আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেন বুদ্ধিজীবী সৈয়দ আবুল মকসুদ এবং নিয়োগপত্র প্রদান করেন ইউনাইটেড মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী ফরিদউদ্দীন আহমেদ। এ দিন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মিন্টু এবং নির্বাহী সম্পাদক আমিরুল ইসলাম নয়ন ছাড়াও জাতীয় প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশাহ, ইউনাইটেড মিডিয়া লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মুশফিকুর রহমানসহ দ্য রিপোর্ট পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আফরোজা আহমেদ কাকন বর্তমানে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমে কর্মরত।

ওই অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড মিডিয়া লিমিটেডের চেয়ারম্যান কাজী ফরিদউদ্দীন আহমেদ ঘোষণা দেন দ্য রিপোর্ট পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হবে। তার এ ঘোষণা বাস্তবায়ন হয়েছে। দ্য রিপোর্ট পরিবারের সবাই এখন স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা পাচ্ছে।

শুধু তাই নয়, মরহুম সাংবাদিক আল-আমিনের স্মরণে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমে ‘সাংবাদিক আল-আমিন স্মৃতি পুরস্কার’ নামে মাসিক পুরস্কারও দিয়ে আসছে দ্য রিপোর্ট কর্তৃপক্ষ। প্রতি মাসে সেরা রিপোর্টের জন্য দুই হাজার টাকা মূল্যমানের এ পুরস্কার পেয়ে আসছেন দ্য রিপোর্টের প্রতিবেদকরা।

(দ্য রিপোর্ট/কেএ/এনডিএস/এইচ/অক্টোবর ১৯, ২০১৫)