প্রচ্ছদ » জেলার খবর » বিস্তারিত

চুরির আপবাদে নির্যাতিত শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠছে

২০১৫ অক্টোবর ১৯ ১৫:৩২:৪২
চুরির আপবাদে নির্যাতিত শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠছে

বিধান সরকার, বরিশাল : জেলার উজিরপুর উপজেলার হারতা বাজারে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতিত শিশু রবিউল মোল্লা (১২) ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে বলে জানালেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. সানজিদা খান।

তিনি জানান, ভর্তির সময় রবিউলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল। দুই পা ও হাত ফুলে ছিল। তবে এখন সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে।

অভাবের সংসারের হাল ধরতে তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠে ইস্তফা দিয়ে শিশু বয়সে কাজে নামতে হয় রবিউলকে। মাস তিনেক আগে নানাবাড়ির কাছে পোল্ট্রি মুরগির খামারে কাজ নিয়েছিল রবিউল।

একটানা কাজ ভাল না লাগায় ৮ অক্টোবর বিকেলে চলে আসে তাদের উজিরপুর উপজেলার হারতা বাজারের ভাড়া বাসায়। কাজ ছেড়ে আসায় বাবা রাগ করবেন ভয়ে রাতে ঘুমাতে যায় হারতা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী চাচা ইউসুফ মোল্লার আড়তে। সেখানেই চুরির অপবাদ দিয়ে তরিক আকন, খোকন বেপারীর নেতৃত্বে ৭-৮ যুবক রাতভর নির্যাতন করে রবিউলকে।

পরদিন ৯ অক্টোবর ভোরে পাশের ব্যবসায়ীরা আহত রবিউলকে উদ্ধার করে বাবা-মায়ের কাছে দিয়ে যান। তবে টাকা-পয়সা না থাকায় চিকিৎসা করাতে নিতে পারিননি তারা। আহত রবিউলকে কাতরাতে দেখে মায়া হলে বিকেল ৪টার দিকে ফিরোজ আলম ও তার দুই সঙ্গী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান।

ওই দিন চাচা ইউসুফ মোল্লা বাদী হয়ে পাঁচজনের নাম উল্লেখ এবং ৩-৪ জনকে অজ্ঞাত করে থানায় মামলা করেন। ঘটনার ১০ দিন পর পুলিশ নির্যাতনের দায়ে আজিজ আকনের ছেলে ইউনুচ আকনকে গ্রেফতার করে।

রবিউলের বাবা মজনু মোল্লা দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘রবিউলকে পিটানোর এক পর্যায়ে পানি খাওয়ার জন্য বিলাপ করলে প্রস্রাব খেতে দেয় নির্যাতনকারীরা। এলাকার মেম্বর, চেয়ারম্যান থেকে গণ্যমান্য সবাইকে বলেছিলাম, গরীব বলে কেউ ভ্রূক্ষেপ করেননি।’

উজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেডে চিকিৎসাধীন রবিউল দ্য রিপোর্টকে বলে, ‘বাবা মারবে ভয়ে চাচার আড়তে ঘুমাতে যাই। চাচার দোকান বন্ধ থাকায় নান্না মেল্লার দোকানে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত টিভি দেখি। পরে ঘরে ফেরার পথে দুই যুবক ওখানে কি করো বলে ডাক দেয় আমাকে। এরপর আরও চার যুবক এসে আমাকে মাছের আড়তে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে চড়-থাপ্পড় মারলেও পরে সোহরাব বেপারীর মাছের গদিতে ঢোকায়ে চলা (কাঠ) দিয়ে পেটাতে থাকে। একটি ভেঙে গেলে অরেকটি নিয়ে আসে। হাত পিঠমোড়া করে ফিতা দিয়ে বেঁধে রড দিয়ে টাইট দেয়। হাত মাটিতে রেখে এবং হাঁটুতে বাটখারা দিয়ে আঘাত করে।’

সে বলে, ‘এক সময় হাতে টাকা দিয়ে বলে তুই ৬০ হাজার টাকা চুরি করেছ এমনটা বলবি। তোর সঙ্গে আরও ২-৩ জন লোক আছে এ কথা স্বীকার করবি। এ সময় সোহবার বেপারীর ছেলে কাউয়ুম, পান্নু মোবাইলে ভিডিও করে। পানি খেতে চাইলে প্রস্রাব নিয়ে আসে। হাত বেঁধে ঝুলিয়ে পেটাতে থাকে। তরিক, খোকনসহ ৭-৮ যুবক রাত সাড়ে ১২টা থেকে থেমে থেমে ভোর ৪টা পর্যন্ত মারে।’

এ সময় মা জুলেখা বেগম নির্যাতকারীদের বিচার দাবি করেন।

শিশু রবিউলের নির্যাতনের অমানবিক ঘটনায় এলাকাবাসীর ক্ষোভ থাকলেও গরিব বলে সাধারণ ঘটনা বলেই তারা মেনে নিয়েছিলেন। তবে শনিবার দুপুরে মাহিলা আইনজীবী সমিতির টিম হারতা বাজারে গেলে, আর ঘটনাটি অমানবিক বলে বোঝালে সোচ্চার হন সবাই।

এখানের সুনীল কুমার বিশ্বাস জানান, রবিউলকে নির্যাতনের ভিডিও তিনি দেখেছেন। ওর চিৎকার সহ্য করার নয়।

এমন বক্তব্য ওই ইউনিটের মেম্বর নিখিল চক্রবর্তীর। তাদের দাবি কোনো সমোঝতা নয়, উপযুক্ত বিচার চাই আমরা।

ঘটনার পরদিন ৯ অক্টোবর রবিউলের চাচা ইউসুফ মোল্লার করা মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- কেশবকাঠি গ্রামের সোহরাব বেপারীর ছেলে খোকন বেপারী (২৫), দক্ষিণ সাতলা গ্রামের আজিজ আকনের ছেলে তরিক আকন (৩৮), জামবাড়ি গ্রামের অমূল্য মালের ছেলে শ্যামল মাল (২৫) ও স্বপন মাল (২০) ও হারতা বাজারের মো. মনির (২৮)। এ ছাড়াও এজাহারে ৩-৪ জনকে অজ্ঞাতনামা বলে উল্লেখ করা হয়। নির্যাতনকারীরা পেশায় সকলেই মাছ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

উজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নূরুল ইসলাম জানান, মামলা হওয়ার খবর শুনে অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। তবে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় শনিবার রাতে হারতা বাজার থেকে আজিজ আকনের ছেলে ইউনুচ আকনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির বরিশাল বিভাগীয় প্রধান এ্যাডভোকেট মুনিরা বেগম জানান, তারা সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবেন শিশুটির পরিবারকে। আর এ ধরনের ঘটনার সমঝোতা হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। শিশু নির্যাতন বন্ধে আইনের আওতায় এনে বিচারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়।

(দ্য রিপোর্ট/এফএস/আসা/আরকে/অক্টোবর ১৯, ২০১৫)