Airtel & Robi User Only

প্রচ্ছদ » » বিস্তারিত

ইন্টারনেটে মুভি ডেটাবেজের পথপ্রদর্শক ॥ নাজমুল হাসান দারাশিকো

২০১৪ অক্টোবর ০৫ ১৬:১৪:০৬
ইন্টারনেটে মুভি ডেটাবেজের পথপ্রদর্শক ॥ নাজমুল হাসান দারাশিকো

তিনি যখন স্কুলে পড়েন, তখন তার বাসায় প্রথমবারের মতো ভিএইচএস প্লেয়ার আসে। তার বন্ধুদের একটা ভিডিও শপ ছিল। সেখান থেকে ভিডিও টেপ ভাড়া পাওয়া যেত, একটা ভিডিও ২ সপ্তাহ রাখার অনুমতি ছিল। সেই শপ থেকে তিনি প্রথম যে টেপটি নিয়ে এলেন তার নাম 'এলিয়েন'। প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে ফিরে ১৪ দিনে মোট ১৪ বার সিনেমাটি দেখেন।

তার মুভিপ্রেমের আরেকটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ১৯৯০ সালে যখন তিনি এইচপিতে (হিউলেট প্যাকার্ড) ফুলটাইম চাকরিজীবী, তখন ১ বছরে ১১০০টি সিনেমা দেখেছেন। বলতে গেলে যা দাঁড়ায়, সিনেমা দেখার অভ্যাসই তাকে মিলিওনিয়ার বানিয়ে ছাড়ে। তার নাম কোল নিডহ্যাম, তিনি ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজ (আইএমডিবি) সাইটের প্রতিষ্ঠাতা।

এক বছরে ১১০০ মুভি দেখা সম্ভব হয়েছিল তার বন্ধুর সেই ভিডিও শপের কারণে। এমনও দিন গেছে, শনিবারের ছুটির দিনগুলো তিনি ১০টা সিনেমাও দেখেছেন। এত সিনেমা দেখতে গিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হল। কী সিনেমা দেখেছেন আর কী দেখেননি সেটাই ভুলে যেতে লাগলেন। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। বছরে যদি ১১০০ সিনেমা দেখতে হয়, তবে দৈনিক গড়ে ৩টি করে সিনেমা দেখতে হয়, এক মাসে ৯০টা। সুতরাং দেখা সিনেমাগুলো সম্পর্কে তিনি নিজের কম্পিউটারে তথ্য টুকে রাখতে শুরু করলেন। সেই তালিকা প্রিন্ট করে নিয়ে যেতে হত ভিডিও শপে। তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে আনতে হত এমন সিনেমা যা দেখা হয়নি। এভাবে ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজের প্রথম ফাইলটি তৈরি হয়েছিল কোলের নিজের কম্পিউটারে।

১৯৮৯ সালে কোল নিডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) তখন খুব সীমিত পরিসরে কাজ করছিল। কোল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মুভি ডিসকাশন গ্রুপে যোগ দেন। সেখানে অবশ্য মুভি নিয়ে যা কথা হতো, তারচেয়ে বেশি হতো কোন নায়িকা দেখতে কিরকম, কোন নায়ক কি করল— এমন বিষয় নিয়ে। এখানকার বন্ধুরা যখন তার তৈরি ডেটাবেজ সম্পর্কে জানতে পারল, তখন তারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। ডেটাবেজে যুক্ত হতে থাকল পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার ও নায়ক-নায়িকা সংক্রান্ত তথ্যাবলী, এমনকি সিনেমার সারসংক্ষেপও।

তারপর ১৯৯৩ সালে কারডিফ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায় ডেটাবেজটি প্রথম ওয়েবে স্থান পায়। অল্প কদিনেই ওয়েবে ট্রাফিক এত বেড়ে গেল যে কোলকে অন্য আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে হোস্ট করতে হয়। এর মধ্যে ছিল জার্মানি, মিসিসিপি, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, দক্ষিণ আফ্রিকা, কোরিয়া, আইসল্যান্ড ও জাপান। কিন্তু তাতেও সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। ১৯৯৫ সালে দেখা গেল প্রতি সপ্তাহে সাইটের ট্রাফিক দ্বিগুণ হচ্ছে। পাশাপাশি কোলের বন্ধুরা যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছিল তারা কাজের পাহাড়ে চাপা পড়ল। সুতরাং ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হল। কোলের ভাষায়, ‘আমরা একটা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলাম। আমরা কি হাল ছেড়ে দিয়ে বলব— এ ৫ বছর আমরা মজা করেছি। নাকি এখান থেকে ব্যবসা করা যায় কিনা সে সম্পর্কে ভেবে দেখব? বিষয়টা সহজ ছিল না। এমন একটা সময় যখন ইন্টারনেট বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহৃত হবে এমনটা ভাবাই অস্বস্তিকর ছিল।’

কোল ও তার বন্ধুরা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিল। ফলাফল, ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে একটি বাণিজ্যিক সাইট হিসেবে আইএমডিবি ডটকম যাত্রা শুরু করল। প্রথম সার্ভারটা কেনা হয়েছিল ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সাইটে বিজ্ঞাপন নিলেন, সেই টাকায় সার্ভারের দাম শুধু পরিশোধই হল না, আরও নতুন সার্ভার কেনা সম্ভব হল।

মনে রাখতে হবে এতদিন পর্যন্ত সাইট চলেছে স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায়। ১৯৯৬ সালে এ স্বেচ্ছাসেবকরা একে একে চাকরি ছেড়ে দিতে লাগলেন এবং আইএমডিবির ফুলটাইম কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে লাগলেন। কোল নিডহ্যাম নিজেও চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজের কোম্পানিতে যোগ দিলেন। ১৯৯৮ সালের মধ্যেই আইএমডিবি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি সাইটের একটি হয়ে গেল। প্রতিমাসে সাইট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৮ মিলিয়নের বেশি। ব্যবহারকারীরা ৪ লাখেরও বেশি মুভি ও এন্টারটেইনমেন্ট ডেটাবেজ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারে। আর কী নেই সেখানে। সিনেমা সম্পর্কে সকল তথ্যের পাশাপাশি আছে ছবি, ভিডিও, ট্রিভিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

পড়ছেন সেই লোকটির গল্প যে কিনা সিনেমা দেখতে দেখতে মিলিওনিয়ার হয়ে গেলেন। নিজ প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইমার হিসেবে যোগদানের ২ বছর পরে কোল নিডহ্যাম ডাক পেলেন জেফ বেজসের কাছ থেকে। এর ১ বছর আগেই বেজস টাইম ম্যাগাজিনের 'ম্যান অব দ্য ইয়ার' নির্বাচিত হয়েছিলেন। বেজস হলেন আমাজন ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা। লন্ডনের এক হোটেলে বসে এই দুই ব্যবসায়ী আলোচনা করলেন, তারপর ২০০৮ সালের এপ্রিলে আমাজন কিনে নিল আইএমডিবি। এভাবেই কোল নিডহ্যাম হয়ে গেল মিলিওনিয়ার। সুখের বিষয়, আমাজন কিনে নিলেও আইএমডিবি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হল, আইএমডিবি কাজ করে যাচ্ছে সারাবিশ্বের সিনেমা সংক্রান্ত তথ্যাবলী নিয়ে, কিন্তু কোথা থেকে কাজ করছে, কীভাবে কাজ করছে, কতজন কাজ করছে, কারা কাজ করছে এই সকল তথ্য বেশ গোপনীয়। কোল নিডহ্যাম বলেন ‘১০০-২০০ লোক আইএমডিবির জন্য কাজ করছে’। এরা যে এক জায়গায় বসে কাজ করে তা নয়, বরং আইএমডিবির লোকজন সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে আছে বলে ধারণা করা হয়। আইএমডিবিরই এক হাই অফিসিয়াল সিমানটন জানিয়েছেন, হলিউডেই তাদের কিছু ক্রু আছে যারা তাদের পরিচয় গোপন করে সিনেমা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত এবং এরা আইএমডিবির লাইফবোটের ভূমিকা পালন করছে। এই লোকটি হতে পারে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, হতে পারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার অথবা কোনো অভিনেতার আত্মীয়। এরাই গোপন সকল তথ্য সরবরাহ করে চলে আইএমডিবি কর্তৃপক্ষকে।

বর্তমানে আইএমডিবিতে কত তথ্য আছে? সঠিক তথ্য বলতে পারব না তবে সেটা আড়াই মিলিয়নের বেশি এবং টিভি ও সিনেমার ক্রেডিটে নাম আছে সাড়ে ৬ মিলিয়ন। প্রতিদিনই বাড়ছে এই তথ্যের সংখ্যা। প্রতিদিনই আইএমডিবি তার অবস্থান একটু একটু করে শক্ত করছে। এক এক করে প্রায় সবদেশের মুভিই আইএমডিবিতে জায়গা করে নিচ্ছে। জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশের মুভিও। ইন্টারনেট থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের প্রায় ৪০০ মুভির তথ্য আছে ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজ ওয়েবসাইটে, এর মাঝে কলকাতায় নির্মিত কিছু সিনেমাও ঢুকে পড়েছে। অথচ বাংলাদেশে ‘মুখ ও মুখোশ’ থেকে শুরু করে আড়াই হাজারের বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যার কোনো পরিপূর্ণ ডেটাবেজ তৈরি হয়নি।

বাংলাদেশে নির্মিত সকল চলচ্চিত্রের একটি ডেটাবেজ তৈরির উদ্দেশ নিয়ে ২০১৩ সালে সীমিত পরিসরে যাত্রা শুরু করে বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। আশা করা হচ্ছে, সাইটটির কলেবর অচিরেই বাড়বে। আইএমডিবি একদিনে তৈরি হয়নি, বিএমডিবিও ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ হবে। বিএমডিবির এই যাত্রায় পথপ্রদর্শক হিসেবে ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজের জনক কোল নিডহ্যাম থাকবেন সবসময়।

লেখক : সম্বন্বয়ক, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)